• রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫
  • ||

যে কারণে মশা মরে না

প্রকাশ:  ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ২০:৩৭
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট

মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনায় গত তিন অর্থ বছরে (চলতি বছরসহ) সাড়ে ৮ কোটি টাকার ওষুধ ও মালামাল ক্রয় করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এর মধ্যে শুধু চলতি অর্থ বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যয় করা হয়েছে সাড়ে চার কোটি টাকা। এদিকে নগরবাসীর অভিযোগ আছে, বিপুল অংকের ব্যয়ের কথা বলা হলেও মশক নিধন কার্যক্রমের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। ফলে নগরীতে বৃদ্ধি পেয়েছে মশার উৎপাত। মশার কামড়ে নগরবাসী আক্রান্ত হচ্ছেন বিভিন্ন রোগে। এমন পরিস্থিতিতে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী বাজারে পাওয়া বিভিন্ন কয়েল–স্প্রের দিকেই ঝুঁকছেন। কয়েল–স্প্রের রাসায়নিক উপাদানে স্বাস্থ্য ঝুঁকির পাশাপাশি বাড়ছে আর্থিক ব্যয়ও।

অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। চসিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থ বছরে (২০১৭–২০১৮) মশকনিধন কার্যক্রমের জন্য ওষুধ ও মালামাল ক্রয় খাতে সাড়ে ৯ কোটি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে গত জুন মাসে সাড়ে ৪ কোটি টাকায় ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে। এর আগে গত অর্থ বছরে (২০১৬–২০১৭) মশকনিধন ওষুধ ও মালামাল ক্রয়ে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা খরচ করেছে চসিক। এর মধ্যে এডালটিসাইড/লার্ভিসাইড/ কালো তেল ক্রয়ের জন্য ২ কোটি টাকা, ফগার/ পাওয়ার/ স্প্রে/ হ্যান্ড মেশিন ক্রয়ের জন্য ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এর আগে ২০১৫–২০১৬ অর্থ বছরে খাতগুলোর বিপরীতে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। বর্তমানে চসিকে আছে ১২০ জন স্প্রেম্যান, উন্নতমানের ১১০টি ফগার মেশিন ও ৩০০টি সাধারণ স্প্রে মেশিন।

চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মশক নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছর নগরীর বিভিন্ন বাসা–বাড়িতে ‘এডাল্ট ডি সাইট’ নামে পূর্ণাঙ্গ মশা ধ্বংসকারী ওষুধ ছিটানোর ক্রাশ প্রোগ্রাম থাকে। এছাড়া বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের অন্যান্য দিনগুলোতে নালা–নর্দমায় ‘লাইট ডিজেল এবং লিমব্যাক’ (লাল তেল নামে পরিচিত) নামক মশার ডিম ধ্বংসকারী একটি তেল ছিটানোর ক্রাশ প্রোগ্রাম থাকে। এ ক্রাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিভিন্ন নালা–নর্দমায় ব্যবহার করার কথা লাইট ডিজেল এবং স্কটল্যান্ডের তৈরি লিমব্যাক (লাল তেল নামে পরিচিত) নামক মশার ডিম ধ্বংসকারী একটি তেল। এবার ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় ৪১টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে ৬শ লিটার করে এডালটিসাইড (পূর্ণাঙ্গ মশা ধ্বংসকারী ওষুধ) সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে উন্নতমানে ফগার মেশিনও সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় কাউন্সিলদের তদারকিতে এসব ওষুধ ছিটানোর কথা রয়েছে। তবে স্থানীয় লোকজনের সাথে আলাপকালে তারা বলছেন, ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম তারা দেখছেন না।

টিপু নামে এক নগরবাসী বলেছেন, সকাল–সন্ধ্যা কানের কাছে ‘গুনগুন’ ধ্বনিতে নিজের আগমনী সংকেত জানান দিয়েই শুধু ক্লান্ত হচ্ছে না মশারা। বিষাক্ত কামড়ের সাথে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুসহ নানা অসুখের জীবাণুও উপহার দিচ্ছে নগরবাসীকে। মশার বিরক্তিকর এ গুনগুনাতি নগরবাসী যখন অতিষ্ঠ তখন সেই ছন্দেই যেন ‘কুম্ভকর্ণের’ ঘুম দিচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মীরা। নয়তো মশার প্রজননের ভরা এ মৌসুমেও মশক নিধন কার্যক্রম নেই কেন?

করিম নামে পাঁচলাইশ মির্জাপুল এলাকার এলুমিনিয়াম গলির এক বাসিন্দা বলেন, গত ৬ মাসে একবারও মশার ওষুধ ছিটাতে দেখিনি। চসিক কোটি কোটি টাকা খরচ করার কথা বলে। কিন্তুু বাস্তবে তো কোন কার্যক্রম দেখতে পাই না।

বহাদ্দারহাট তালতলা (ফরিদার পাড়া) এলাকার বাসিন্দা সানি বলেন, আমি এই এলাকায় বাস করে আসছি গত আট বছর ধরে। কিন্তু ৮ বছরের মধ্যে একদিনও চসিকের পক্ষে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখিনি।

এদিকে চসিকের পরিচ্ছন্নকর্মীরা জানিয়েছেন, সারাবছরই মশার উপদ্রব থাকে নগরীতে। তবে প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এই পাঁচ মাসে মশার উপদ্রব বেশি লক্ষ্য করা যায়। মূলত এই সময়ে মশার ওষুধ ছিটানোর উপর জোর দেয়া হয়। তবে চলতি বছরের পুরোটা সময়ই মশার ওষুধ ছিটানোর টার্গেট করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১০ জুলাই চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে পরবর্তী দুই মাস একটি কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল চসিক। এই কর্মসূচির আওতায় নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে ২শ লিটার লার্ভিসাইড (মশার ডিম ধ্বংসকারী ওষুধ) এবং ৬শ লিটার এডালটিসাইড (পূর্ণাঙ্গ মশা ধ্বংসকারী ওষুধ) ছিটানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছিল চসিকের পক্ষে। তবে কিছুদিন পর ওই কার্যক্রম বন্ধও হয়ে যায়। এছাড়া সাবেক মেয়রদের মেয়াদকালে নভেম্বর মাসে মশক নিধনে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে দেখা যেত। এবার এখন পর্যন্ত তা শুরু হয়নি।

জানতে চাইলে চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান ছিদ্দিকী বলেন, ওয়ার্ডগুলোতে কাউন্সিলদের তত্ত্বাবধানে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডে ৬শ লিটার পূর্ণাঙ্গ মশা ধ্বংসকারী ওষুধ সরবরাহ করেছি। এছাড়া আমাদের কাছে ১০ হাজার লিটার ডিম ধ্বংসকারী ওষুধ মজুদ আছে। ১০ মিলিমিটার ডিম ধ্বংসকারী ওষুধের সাথে ২০ লিটার পানি মেশানো যায় বলেও জানান এ কর্মকর্তা। এ কর্মকর্তা বলেন, চসিকের একার পক্ষে মশা নিমূল করা সম্ভব না। উৎপাত কমানো যাবে হয়তা। এছাড়া প্রত্যেককে নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রতিটি নগরবাসীর উচিত সেফটি টাংকি পরিষ্কার রাখা। এজন্য প্রতি সপ্তাহে সেফটি টাংকি ১ পোয়া কেরোসিন তেল দেয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি ও ২১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন বলেন, মশার ওষুধ ছিটাচ্ছে। ওয়ার্ড অফিসে গেলে কোন এলাকায় ছিটানো হয়েছে তার তথ্য পাবেন। স্প্রে ম্যানরা যাতে কাজে ফাঁকি দিতে না পারেন সেজন্য যে এলাকায় ওষুধ ছিটানো হচ্ছে ওই এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে আসতে হয় তাদের।

কয়েল–প্রেতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি :

স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মশক নিধনে বাসা–বাড়িতে যে কয়েল বা প্রে ব্যবহার করা হয় তাতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশষজ্ঞরা বলছেন, একটা মশার কয়েল থেকে যে পরিমাণ ধোঁয়া বের হয় তা একশটা সিগারেটের সমান। বিভিন্ন মশার কয়েলে থাকে অ্যালোট্রিন নামে এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান। এর সাথে ফেনল ও ক্রেসল নামে দুই ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়। এ দুটিও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যদিও বিভিন্ন কয়েল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি মানব দেহের জন্য সহনীয় পর্যায়ে এ উপাদান ব্যবহার করা হয়। কয়েল তৈরিতে ব্যহহৃত উপাদান এতই সুক্ষ যা সহজেই শ্বাসনালী ও ফুসফুসের বায়ু থলির মধ্যে পৌঁছে সেখানে জমা হয়। এর ফলে ফুসফুসের বায়ুথলির কনায় রক্ত জমে যাওয়া থেকে নানা ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া কয়লে ও মশক নিধনে প্রে কয়েলের জন্যও অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে সাধারণ মানুষের।

/সাজিদ