• রবিবার, ২৭ মে ২০১৮, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

নির্বাচনী বছরে অর্থনীতিতে অস্থিরতা থাকবে

প্রকাশ:  ০২ জানুয়ারি ২০১৮, ০২:০৫
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট
নির্বাচনী বছর ২০১৮ সালে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা থাকবে বলে মনে করেন দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও জাতিসংঘ উন্নয়ন নীতিমালা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। 
 
অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, বিদায়ী বছরে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যদি একটি মাত্র নেতিবাচক দিক উল্লেখ করতে হয় তা হলো ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা। ফলে ব্যাংকিং খাতের জন্য আপাতত কোনো সুখবর নেই। নির্বাচনী বছরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুব নেই। অর্থনীতির চলতি গতিধারা ধরে রাখাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। 
 
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, ইতিপূর্বে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমতি পাওয়া নতুন ব্যাংকগুলোর দু-একটি খুবই নাজুক অবস্থায়, আবার একই প্রক্রিয়ায় আরও নতুন ব্যাংকের অনুমোদনের তোড়জোড় চলছে। আবার কিছু ব্যাংকের মালিকানা বদলেছে। এ ধরনের বিশৃঙ্খল অস্থির অবস্থায় বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম-কানুন আরও শক্ত করার বদলে বরং শিথিল করা হচ্ছে। এটা ভবিষ্যতের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভালো ইঙ্গিত বহন করে না। 
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের সাবেক এই শিক্ষক বলেন, ১৯৮০-এর দশকের শেষে বিধিবিধান ঠিক না করেই বেসরকারি খাতে ব্যাংক খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে দেখা গেল, ওই ব্যাংকগুলোর আমানতের এক-তৃতীয়াংশই উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ঋণ হিসেবে নিয়ে গেছেন, যার একটা বড় অংশই খেলাপি হয়েছিল। এরপর অনেক বিধিবিধান তৈরি করে এবং আইন-আদালতের মাধ্যমে ৬০ থেকে ৭০ জন উদ্যোক্তা-পরিচালককে অপসারণ করার পরই বেসরকারি ব্যাংক খাতের নিয়মশৃঙ্খলা ফিরে আসে। এখন নতুন করে আমরা একই ভুল করতে যাচ্ছি, আর রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকগুলোর অবস্থার অবনতি তো অব্যাহত আছেই এবং নতুন করে এগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটানোর জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। কাজেই ব্যাংকিং খাতের জন্য আপাতত কোনো সুখবর নেই।
 
প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদ বলেন, গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপর রেকর্ড হারে অর্জিত হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে ফসলহানির কারণে এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতের মন্দার বিলম্বিত প্রভাবের কারণে সেই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাবে বলে মনে হয় না। এর সঙ্গে নির্বাচন সামনে রেখে অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা তো আছেই। কাজেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুব নেই। অর্থনীতির চলতি গতিধারা ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে। অর্থনীতির এই অধ্যাপকের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আগের তুলনায় বাড়ছে। তবে তা উত্পাদনমুখী বিনিয়োগে কতটা যাচ্ছে, স্পষ্ট নয়। এ অবস্থায় সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে প্রবৃদ্ধির গতি যেমন ধরে রাখা যেতে পারে, তেমনি সরকারের রাজনীতির জন্যও তা সহায়ক হতো। তিনি বলেন, একমাত্র পদ্মা সেতু ছাড়া অন্য বড় প্রকল্পগুলো দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত বাস্তবায়নে সমস্যা দেখা যাচ্ছে। ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) চেয়ারম্যান ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বিদায়ী বছরের আর্থিক গতি-প্রকৃতির পর্যালোচনা করে বলেন, ২০১৭ সালের শেষে এসে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ধারাবাহিকতা মোটামুটি বজায় আছে। তবে বন্যায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চালের দাম অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে গেছে। এর ফলে সাময়িকভাবে হলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন নির্বাহের ওপর প্রভাব পড়ে থাকবে। উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা যেমন একধরনের মৌসুমি দারিদ্র্য, এও অনেকটা তেমন। বার্ষিক দারিদ্র্যের হারের হিসাবে হয়তো এটা ধরা নাও পড়তে পারে, কিন্তু এও একধরনের দারিদ্র্য। খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা দরকার। খাদ্যমূল্য বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী, তবে নিয়ন্ত্রণেই আছে। বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা বাড়ছে। আগের বছরগুলোয় যা উদ্বৃত্ত থাকত। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে এবং সরকারের অবকঠামো নির্মাণের উপকরণ ও খাদ্য আমদানির ফলে আমদানি খরচ বেড়েছে। এতে ডলারের দামে চাপ পড়েছে। শেষ পর্যন্ত ডলারের দাম হয়তো ৮৩ থেকে ৮৪ টাকায় দাঁড়াতে পারে। তবে যথেষ্ট রিজার্ভ থাকায় প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। তিনি বলেন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও বিদেশ থেকে শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলেই বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ পড়েছে। তবে বছরের শেষার্ধে রপ্তানি আয়ের কিছুটা প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। যেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি। গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমে গিয়েছিল ১৫ শতাংশের মতো। তবে এ বছরের শেষার্ধে রেমিট্যান্সের পরিমাণও কিছুটা বাড়ছে। এর কারণ এ বছর বিদেশে শ্রমিক অনেক বেশি সংখ্যায় গেছে বলে মনে করেন ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের (আইজিসি) এই কান্ট্রি অ্যাডভাইজার।