• শনিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৭, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
  • ||
  • আর্কাইভ

রাজনীতির মাঠে আত্মবিশ্বাসী বিএনপি

প্রকাশ:  ১৪ নভেম্বর ২০১৭, ২৩:০৩ | আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৭, ০০:২৪
শেখ হারুন অর রশিদ
প্রিন্ট

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার দিন বিমানবন্দর এলাকায় জনতার ঢল পরে কক্সবাজার সফরে ব্যাপক জনসমাগম তারপর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা জনসমুদ্রে রূপ নেওয়ায় দলটির নেতাকর্মীরা এখন বেশ চাঙ্গা ও আত্মবিশ্বাসী। স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দেখে কঠোর কর্মসূচিতে না গিয়ে জনগণকে সাথে নিয়েই নির্বাচনকেন্দ্রীক দাবি আদায় করতে চায় দলটি। এ কারণে শিগগিরিই ঢাকার বাইরে খালেদা জিয়ার আরো কয়েকটি সমাবেশের কর্মসূচি গ্রহণের চিন্তাভাবনা রয়েছে।

২০১৪ ও ১৫ সালে দুই দফা আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে বিএনপি রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের তেমন কোনো সুযোগ পায়নি। প্রতিটি সভা-সমাবেশ ছিল বিধি-নিষেধে মোড়া। এমনকি ঘরোয়া কর্মসূচিতেও বাঁধা এসেছে। সর্বশেষ গত মাসে খালেদা জিয়ার কক্সবাজার সফরে ব্যাপক জনসমাগম হওয়ায় দলের নেতাকর্মীরা ব্যাপক উৎসাহ পেয়েছেন। এরপর রোববার রাজধানীর সমাবেশে লাখো জনতার ঢল নামায় কর্মীরা আরো চাঙ্গা হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে হামলা-মামলায় জর্জরিত বিএনপি জেগে উঠেছে।

নেতারা বলছেন, গত রোববার ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা, তার আগে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ত্রাণ দিতে খালেদা জিয়ার কক্সবাজার সফর রাজনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ হয়েছে। পরপর বড় দু’টি কর্মসূচি নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করেছে। বিশেষ করে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি মানবিক কর্মসূচিকে ঘিরে অনেক দিন পর নিরুত্তাপ রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হতে পেরেছে বিএনপি। ঢাকা থেকে কক্সবাজারের উখিয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দীর্ঘ যাত্রাপথে নেতাকর্মীদের জাগিয়ে তোলা গেছে। বিএনপির নেতারা মনে করছেন, এই দু’টি কর্মসূচিতে সরকারের ভেতরেও নাড়া পড়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু পূর্বপশ্চিমকে বলেন, ১২ নভেম্বরের সমাবেশ একটি ঐতিহাসিক সমাবেশ।এই সমাবেশ যাতে সফল না হয় তার জন্য সরকার নানা ভাবে চেষ্টা করেছে। ঢাকা শহরে অঘোষিত হরতাল পালন করেছে।পরিবহন মালিকদের দিয়ে পরিবহন বন্ধ রেখেছিল।আশেপাশের শহর থেকেও যারা আসতে চেয়েছিল তাদেরকে আটকিয়ে দিয়েছিল।তারপরও যে সমাবেশ হয়েছে তাকে ঐতিহাসিক সমাবেশ বলা যায়।

তিনি বলেন, প্রায় পৌঁনে দুই বছর পর বিএনপি সমাবেশের আহ্বান করেছিল তা শতভাগ সফল হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো দেশে দুর্নীতির মহাৎসব চলছে। এমন কোনো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নেই, সরকারি ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক, শেয়ার বাজার সেখান থেকে টাকা লুট পাট করা হয়নি। দেশে গুম খুন নির্যাতন সব কিছুর বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিবাদ জানানোর জন্য সমাবেশে যোগ দিয়েছে।শুধু বিএনপি না সাধারণ মানুষও এই সমাবেশে যোগ দিয়েছিল, এটা ছিল সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের নিরব প্রতিবাদ। 

বিএনপির এ নেতা বলেন, নির্দলীয় সরকারের ব্যাপারে আলোচনাই প্রথম পদক্ষেপ আমরা মনে করি।আর যদি আমাদের দাবি মানা না হয় তাহলে আন্দোলন ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।কারণ বর্তমান সরকারের অধীনে কি ধরণের নির্বাচন হয় বা হয়েছে তা আমরা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দেখছি।এই সরকারের অধিনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আত্মবিশ্বাস  বিএনপির আগেও ছিল বর্তমানেও আছে।কিন্তু অসংগঠিত ছিল। গুম খুন নির্যাতন জেল-জুলুম এসব কারণে  আমাদের নেতাকর্মীরা যে পর্যায়ে ছিল সেখান একটা ফরমেটের মধ্যে আনতে সাংগঠনিক ভাবে কাজে লাগানোর জন্য এ কর্মসূচিগুলো কাজে লেগেছে। নতুন করে একে অপরের সাথে দেখা হয়েছে, নতুন করে সবাই দেখেছে বিএনপিকে বাঁধা দিয়ে আটকানো যায় না।
তিনি বলেন, বিএনপির ব্যাপারে সরকারি মহলে একটা অপোপ্রচার থাকে যে বিএনপির সমাবেশ হলে গোলযোগ হবে, সংঘর্ষ হবে যেভাবে আওয়ামী লীগের মধ্যে হচ্ছে সেইটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে এবং পুলিশের পক্ষ থেকে যে আশংকা ছিল সেটাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে।অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বিএনপি বিশ্বাস করে এই মেসেজটা নেতাকর্মীদের কাছেও পৌঁছেছে, দেশবাসি এবং সরকারের কাছেও পৌঁছেছে।এই রেশ থাকতে থাকতে আমরা আরো বিস্তৃত কর্মসূচিতে যেতে চাই যেখানে আমরা আমাদের বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করবো যার মধ্যে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে যা যা করণীয় সেই কাজে এই কর্মসূচিগুলা আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি প্রাণশক্তি যোগাবে বলে ধারণা আমাদের।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীদের দমন পিড়নের কাজে। তার মধ্য দিয়েও আমরা লড়ায় করে যাচ্ছি সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে। পরপর তিনটা সফল কর্মসূচি চলমান আন্দোলন সফল করতে আমাদের আরো শক্তি যোগাবে মনবল বৃদ্ধি করবে এবং আগামীতে যে দাবি নিয়ে আমরা রাজপথে আছি অর্থাৎ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আমাদেরকে অনেক দুর নিয়ে যাবে। চলমান আন্দোলনকে সফল করতে প্রয়োজনীয় ফুয়েল বা মানসিক শক্তি আমরা পেয়েছি এই কর্মসূচির মাধ্যমে।

এদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া  সোমবার টুইটারে এক বার্তায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা সফল করার জন্য নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, অনির্বাচিত সরকারের চক্রান্ত, বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে সোহরাওয়ার্দীর জনসভায় যোগ দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে বেগবান রাখার জন্য দেশের লাখো মানুষ এবং বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থককে আন্তরিক ধন্যবাদ।

সড়কপথে কক্সবাজার সফর ও ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভার পর আরো মাঠের কর্মসূচি নিচ্ছে বিএনপি। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, এবার ঢাকার বাইরে কর্মসূচি দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। পরবর্তী কর্মসূচিতে খালেদা জিয়া সড়কপথে সিলেট অথবা রাজশাহী যেতে পারেন।

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন পর মাঠের রাজনীতির সুযোগ পেয়ে নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বসিত। এখন নীতিনির্ধারকেরা চাইছেন আপাতত কোনো উত্তেজনাকর কর্মসূচিতে না গিয়ে একটি অহিংস আন্দোলন গড়তে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মাঠপর্যায়ে এই বার্তা পৌঁছাতে চান যে বিএনপি রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন আনতে চায়। এ কারণে খালেদা জিয়া বারবার ক্ষমার কথা বলে উদারতার রাজনৈতিক মনোভাব প্রদর্শন করছেন।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। বুধবার রাত ৮টায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দেশের চলমান রাজনৈতিক অবস্থা করণীয় ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে এই বৈঠকে আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে। বিএনপির নেতারা বলছেন, শিগগিরিই দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকা হবে। সেখানে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করা হবে। তবে নেতারা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং নির্বাচনী কার্যক্রম দু’টোই অব্যাহত থাকবে।

সর্বশেষ ২০১৫ সালের এপ্রিলে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নেমে হামলা ও বাধার মুখে পড়েছিলেন খালেদা জিয়া। এরপর আর তিনি মাঠের কর্মসূচিতে যাননি। গত অক্টোবর মাসে যুক্তরাজ্য থেকে তিনমাস পর খালেদা জিয়া দেশে ফেরেন। ওই দিন বিমানবন্দর সড়কে ব্যাপক জনসমাগম করেছিল বিএনপি। এরপর কক্সবাজারের পথে পথে বিপুল জনসমাগম ও ঢাকায় বড় জনসভা করে নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি সরকারকে একটা বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করছেন দলের নেতারা। 

নির্দলীয় সরকারের দাবি পূরণ না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। এর আগে ২০১৩ সালে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার।

close