• রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮, ৭ শ্রাবণ ১৪২৫
  • ||

কি অপেক্ষা করছে আসামের ৪০ লাখ বাঙালির কপালে!

প্রকাশ:  ০২ জানুয়ারি ২০১৮, ১১:৩১ | আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০১৮, ১১:৩৭
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট
ফাইল ছবি

আসাম থেকে বের করে দেয়া হতে পারে কয়েক লাখ ‘অবৈধ বাংলাদেশিকে’। এরা মূলত বাংলাভাষী মুসলিম। তাদের সংখ্যা হতে পারে ৩০ থেকে ৪০ লাখ। এসব মুসলিমকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। এ কথা জোরেশোরে বলেছেন আসাম সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ত্রিপুরায় বাড়ানো হয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা।

এর ফলে আসামে বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলিমদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন আসামের সাংবাদিক অমল গুপ্ত। রোববার দিবাগত মধ্যরাতে আসাম রাজ্য সরকার নাগরিকত্ব বিষয়ক ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস’-এর প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশ করে।

এর আগে অমল গুপ্ত বলেন, বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে ধারণা করা হচ্ছে, নাগরিকদের জাতীয় রেজিস্ট্রার এনআরসি এই খসড়ায় শুরুতেই তালিকা থেকে ৩০-৪০ লাখ মুসলমান বাদ পড়বেন। এতে আসামে আড়াই কোটির মতো জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে মুসলিম অধ্যুষিত বারপেটা, ধুবরি, করিমগঞ্জ, কাচার সহ বিভিন্ন এলাকায়।

রোববার রাতে এমন ‘অবৈধ নাগরিকদের’ প্রাথমিক খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে আসাম সরকার। এটা অবৈধ অভিবাসী বিতাড়নের প্রাথমিক প্রক্রিয়া। যদি এমনটা হয় তাহলে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ আরেকটি বড় আন্তর্জাতিক ধকলের মুখে পড়তে পারে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, আসামের রাজ্য সরকার রোববার মধ্যরাতে নাগরিকত্ব বিষয়ক প্রথম খসড়া ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস’ (এনআরসি) তালিকা প্রকাশ করেছে। এটি ভেরিফাই করা ভারতীয় নাগরিকদের প্রাথমিক তালিকা। এ তালিকা প্রকাশ করেন ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল শৈলেশ।

মধ্যরাতের ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নাগরিকত্বের জন্য ৩ কোটি ২৯ লাখ মানুষ আবেদন করেছিলেন। তার মধ্যে এক কোটি ৯০ লাখের ডকুমেন্ট যাচাই করে তাদেরকে ভারতের বৈধ নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকিদের নাম যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এই ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ামাত্র আমরা আরেকটি খসড়া প্রকাশ করবো।

উল্লেখ্য, আসামে গত রাজ্যসভা নির্বাচনের আগে অবৈধ অভিবাসীদের বিতারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। সেই প্রতিশ্রুতির পালে হাওয়া লাগে। তাতে রাজ্যসভা নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিজেপি। তারপর তারা তাদের কথা রাখার উদ্যোগ নেয়। ১৯৫১ সালের পর প্রথম নাগরিকত্ব বিষয়ক রেজিস্ট্রার হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেয়া হয়।

মিডিয়ার খবরে বলা হচ্ছে, এর লক্ষ্য হলো আসাম থেকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ বের করে দেয়া। অনলাইন দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতে, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে পুরো আসামের সেবা কেন্দ্রগুলোতে প্রথম খসড়া তালিকাটি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে নাগরিকরা তাদের নামটি চেক করে দেখতে পারেন। এ ছাড়া তারা অনলাইনে, এসএমএস মারফত নিজেদের নাম যাচাই করে দেখতে পারেন। রাজ্যের ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন বিষয়ক সমন্বয়কারী প্রতীক হাজেলা জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেনো প্রথম প্রকাশিত তালিকায় তাদের নাম দেখতে না পেয়ে আতঙ্কিত না হন। এমনও হতে পারে কোনো পরিবারের কোনো সদস্য এতে বাদ পড়ে থাকতে পারেন।

ওদিকে শুক্রবার আসামের অর্থমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, আসামে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের শনাক্ত করতে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছেন। এনআরসি’তে যাদের নাম না থাকবে আসাম থেকে তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। ওদিকে সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আসাম সরকার। এর আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল ‘খাঁটি’ ভারতীয়দের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তালিকায় যাদের নাম থাকবে সেইসব খাঁটি ভারতীয় আরো অনেক বেশি সুবিধা পাবেন। তবে প্রথম তালিকায় যদি কেউ তার নাম না দেখতে পান তাহলে তারা যেন উদ্বিগ্ন না হন- এমন আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

অনলাইন আল জাজিরা লিখেছে, ১৯৫১ সালের পর প্রথম একটি শুমারির পর ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেনস তালিকা প্রকাশ করেছে আসাম। এর লক্ষ্য হলো অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করে তাদেরকে আসাম থেকে বের করে দেয়া। তবে মানবাধিকারকর্মীরা এতে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এ প্রক্রিয়ায় আসামের কয়েক লাখ মুসলিম রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বেন। ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার বলে, প্রায় ২ কোটি বাংলাদেশি অভিবাসী বসবাস করছেন ভারতে। তবে এ সংখ্যা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। আসামে নতুন করে নাগরিকত্ব নির্ধারণ থেকে বাদ পড়েছেন লোয়ার আসামের প্রত্যন্ত গ্রাম বলদমারি চরে বসবাসকারী ২৫ বছর বয়সী যুবক হোসেন আহমেদ।

তিনি বলেছেন, এনআরসি প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমাদের গ্রামে অনেক বাড়িতে গিয়েছেন। কিন্তু তারা আমার বাড়ি আসেন নি। আমার পরিবারকে এ তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়েছে বলে আমি আতঙ্কিত। আমি ভারতীয় নাগরিক। আমার পিতা এখানকার একটি স্কুলের শিক্ষক। দাদার রয়েছে জাতীয় ভোটার পরিচয়পত্রও। কিন্তু এখনো আমাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমাদের গ্রামে, আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে এখন এক আতঙ্কজনক পরিবেশ বিরাজ করছে। কে জানে কাকে বাংলাদেশের দিকে ছুড়ে দেয়া হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হয়। তখন থেকেই আসামে অবৈধ অভিবাসী ইস্যুতে প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজ্যের মূল জনগোষ্ঠী ও বাংলাভাষী মুসলিম অভিবাসীদের তখন থেকেই রয়েছে উত্তেজনা। আসামের কেন্দ্রীয় অঞ্চল নিলীতে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবৈধ অভিবাসী অভিযোগে হত্যা করা হয় কমপক্ষে দু’হাজার বাংলাভাষী মুসলিমকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘সন্দেহজনক ভোটার’ ও ‘অভিবাসী’ হিসেবে হাজার হাজার বাংলাভাষী মুসলিমকে আসামের বন্দিশিবিরগুলোতে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। এই রাজ্যে মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা প্রায় ৪০ ভাগই মুসলিম। তাদেরকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এর বিরুদ্ধে তারা প্রতিনিয়ত লড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় তাদেরকে নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আসামের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী আমান ওয়াদুদ বলেছেন, যদি সরকারের এই তালিকাটি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়ে থাকে তাহলে কোনো খাঁটি নাগরিকের নাম বাদ দেয়া উচিত হবে না। তবে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি সরকার মুসলিমদের প্রতি শত্রুতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। এটা সেই সরকার যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তারা অভিযোগ করে, ৩৫ ভাগ সংসদীয় আসনে প্রাধান্য বিস্তার করছে ‘বাংলাদেশি মুসলিমরা’। তাই জনগণ মনে করে, এই সরকার এই তালিকা করতে গিয়ে জালিয়াতি করবে এবং বৈধ নাগরিকদেরকে এ তালিকা থেকে বাদ দেবে।

উল্লেখ্য, এবার তালিকা করার ক্ষেত্রে কতগুলো শর্ত দিয়েছে সরকার। তার মধ্যে অন্যতম হলো- বসবাসকারী ও তাদের পরিবারকে প্রমাণ দিতে হবে যে, তারা ও তাদের পরিবার ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চের আগে থেকে আসামে বসবাস করছে। কিন্তু এতে বাদ রাখা হয় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে ও তার পরে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশিদের। ওদিকে অভিবাসন বিরোধী গ্রুপ প্রবাজন বিরোধী মঞ্চ-এর প্রতিষ্ঠাতা উপামান্যু হাজারিকা বলেছেন, বহিরাগতরা আসামের সংস্কৃতির জন্য হুমকি হয়ে পড়েছেন। তারা ভূমি ও চাকরির ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করছেন।