• রবিবার, ২৭ মে ২০১৮, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

বাংলাদেশের গণতন্ত্রে কী প্রভাব রাখলো ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন?

প্রকাশ:  ০৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০৩:২৩ | আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০৩:৪৬
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট
বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি ভোটার ভোট দিতে পারেননি। বিএনপি বয়কট এবং নির্বাচন প্রতিহত করার আন্দোলনে ভোটারদের উপস্থিতিও ছিল তুলনামূলক অনেক কম। ঢাকার একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমিনুর রহমানের এলাকার সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। স্বভাবতই তার ২০১৪ সালে ভোট দেয়ার সুযোগ হয়নি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চার বছরে এসে পঞ্চাশোর্ধ্ব আমিনুর রহমান বলেন, “সরকারে যিনিই থাকেন কোনো বিষয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ রাখেন। এবার চাপের বিষয়টি ক্ষমতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে, আঁকড়ে রাখার ক্ষেত্রে একেবারে স্পষ্ট এবং নগ্ন।”

সংসদ নিয়ে টিআইবির এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এ সংসদে আইন পাস হতে গড়ে মাত্র ৩০ মিনিট সময় নিয়েছে। কোরাম সংকটে বিপুল অর্থের অপচয় ধরা পড়েছে। এমনকি বিধান থাকলেও অনেক আন্তর্জাতিক চুক্তি এ সংসদে বিতর্ক বা আলোচনার জন্য উপস্থাপনই করা হয়নি। অথচ সংসদের সরকারি ও বিরোধী দল একসুরে সংসদের বাইরের দল বিএনপির সমালোচনা করেছে।

টিআইবির ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্য এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দীন খান বলেন, “লিগ্যালি, থিওরিটিক্যালি প্রাকটিক্যালি কোনোভাবেই এটাকে বিরোধী দল বলা যায় না। সুতরাং ২০১৪ সালে যে সংসদ হয়েছিল সেটা বিনা অপজিশনেই ফাংশন করলো। দুনিয়ায় এত সহজে কোনো আইন পাস হয় এটা দেখা যায় না। তারপরে ওয়াচডক ফাংশনতো করেই নাই। গত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের কোনো জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। এবং তারা জবাবদিহি করেও না”।

বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের পর একদিকে সংসদের এই অবস্থা অপরদিকে রাজনীতির মাঠে বিএনপিও সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারেনি। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২২টি মামলা হয়েছে এবং ৮৪টি মামলা মহাসচিবের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া দলটির দাবি তাদের অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ২৫ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। আর সর্বশেষ ১৬টি সভা সমাবেশের আবেদনে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি মিলেছে মাত্র তিনটি।

৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের পেছনে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার যুক্তি তুলে ধরেছিল সরকার। নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ১৯শে ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে,  “উনি [খালেদা জিয়া] যদি হরতাল বন্ধ করেন, অবরোধ বন্ধ করেন, মানুষের ওপর জুলুম অত্যাচার বন্ধ করেন তাহলে ওই নির্বাচনের পর আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা যদি একটি সমঝোতায় আসতে পারি। প্রয়োজনে আমরা আবার পুনরায় নির্বাচন দেব। পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিয়ে নতুন নির্বাচন দেব।”

কিন্তু নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর সরকারের দিক থেকে আলোচনার আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। অন্যদিকে নির্বাচনের প্রথম বার্ষিকীতে বিএনপির হরতাল অবরোধে ব্যাপক সহিংসতাও হয়েছে। আন্দোলনে সহিংসতার বিষয়টিকে সামনে তুলে ধরে বিএনপির বিরুদ্ধে আরো কঠোর হয়েছে সরকার। এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল দেখা গেলেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান মনে করছেন ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য একটা আঘাত।
“দুই দলের যে একটা এগ্রিমেন্ট দরকার নির্বাচনে সেটাতো একদম বিহীত হয়ে গেল। এবং তারপরে যেটা হলো যেহেতু বিরোধী দল পার্লামেন্টে আসলো  না এবং রাস্তায় রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক মার খেলো তাতে করে যারা সরকারে আছেন শেষ পর্যন্ত একটা দল অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে গেছে। অতএব সেটাও আমি বলবো একটা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ভাল নয়।”

বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের পর সরকার বিরোধী মত এবং সমালোচনা দমনে তৎপর হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিকদের ওপর ৫৭ ধারা প্রয়োগ, সম্পাদকের বিরুদ্ধ মামলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ধরে নেয়ার পর গুমের ঘটনা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

হাফিজউদ্দীন খান বলছিলেন, “এক কথায় বলা যায়   বর্তমান সরকার সমালোচনা মোটেও শুনতে রাজি নয়, সহ্য করতে রাজি নয়। গণতন্ত্র হতে গেলে পরমত সহিষ্ণুতা থাকতে হবে এটাতো একেবারেই অনুপস্থিত, নাই। বাংলাদেশে রাজনীতি ও গণতন্ত্রের এ অবস্থায়  আগামী নির্বাচন নিয়ে জনমনে শঙ্কাও দেখা যাচ্ছে।

ঢাকার আমিনুর রহমান বলছিলেন, “দেশে একশ চুয়ান্নটি সিট বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পরেও সংসদ কন্টিনিউ করে এবং ওই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সরকারের মনোভাবের কোনো পরিবর্তন যেখানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সেই কারণে নিঃসন্দেহে জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছেই, যে আগামী নির্বাচনটি যথাযথ এবং সুষ্ঠু হবে কিনা?”