• রবিবার, ২৭ মে ২০১৮, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

বাংলাদেশ-ভারত নৌ চুক্তি বিষয়ে স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ

প্রকাশ:  ০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:১৭ | আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:২৫
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নৌ-পরিবহন ও বন্দর ব্যবহারের বিষয়ে চুক্তি হয়। কিন্তু এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত না হওয়ায় দু’দেশের পক্ষ থেকে এক্ষেত্রে ঐক্যমত বাস্তবায়ন হয়নি। সুফল ও প্রাপ্তি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে দু’দেশ।

ঢাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে পুনরায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নৌ-পরিবহন ও বন্দর ব্যবহারে বিদ্যমান বাঁধাগুলো দূর করার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন এবং উপকূলীয় নৌ-পরিবহন বিষয়ে প্রটোকল বা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু স্মারক স্বাক্ষরিত না হওয়ার কারণে ৮ বছর পরও এই ঐক্যমত বাস্তবায়ন হয়নি। এই অবস্থায় এখন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে বাঁধাগুলো দূর করার জন্য দ্রুত একটি আন্ত:মন্ত্রণালয় সভা ডাকার জন্য তিনি নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানকে অনুরোধ করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মসিউর রহমান গত ২৮ ডিসেম্বর শাজাহান খানের কাছে একটি ডিও (আধা সরকারি) পত্র পাঠান। এতে তিনি উল্লেখ করেন, অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন প্রটোকল দীর্ঘদিন হতে চলে আসছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি হয়। আমার জানা মতে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষে এবং উপমহাদেশ বিভক্তির পর তদানিন্তন পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে এ সম্পর্কে চুক্তি হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ট্রেড অ্যান্ড ট্রানজিট অ্যাগ্রিমেন্ট-এর ভিত্তিতে ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রেড স্বাক্ষরিত হয়। ট্রানজিট ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে গ্যাট/ডব্লিউটিও’র মৌলিক নীতিমালা আছে। উক্ত নীতিমালা অনুসরণ করে নৌ-রুট ব্যবহারের নিয়মাবলী নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

গ্যাট/ডব্লিউটিও’র নীতিমালা উল্লেখ করে ট্রানজিট পণ্যের ওপর শুল্ক বা কর আরোপ করা যায় না উল্লেখ করে মসিউর রহমান আরো বলেন, ‘গ্যাট/ডব্লিউটিও’র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মূল নীতি রয়েছে। এই সব নীতিতে ট্রানজিট পণ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনিক যে ব্যয় হয় তা আদায় করা যায়। ট্রানজিটের জন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করলে বিনিয়োগের অর্থ যুক্তিসঙ্গত মুনাফাসহ তুলে আনা যায়। লঘু অপরাধ বা অনিয়মের জন্য গুরুদণ্ড পরিহার্য্য। ট্রানজিট কার্গোর ওপর শুল্ক আরোপযোগ্য নয়। ট্রানজিট পণ্যের ওপর ইতোপূর্বে কখনও শুল্ক-কর আরোপ করা হয়নি। এখন আরোপের উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত সহযোগিতা নীতির পরিপন্থী হবে।’

একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে মসিউর রহমান তার ডিও পত্রে আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতা বাস্তবায়ন অগ্রগতি বিবেচনার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০১৭ সালের ২২-২৩ অক্টোবর কমিশনের সভার বাংলাদেশে আসেন। ঔ সভায় মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত ঐক্যমত স্মারক/সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু অপর্যাপ্ত সময় ও খসড়া স্মারক অনুমোদিত না হওয়ার কারণে তা স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি।’ এই অবস্থায় নৌ-পরিবহন প্রটোকল, উপকূলীয় নৌ-পরিবহন ও উল্লেখিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে বাধাগুলো দূর করার জন্য একটি আন্ত:মন্ত্রণালয় সভা করার অনুরোধ করছেন মসিউর রহমান।

এদিকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বন্দর ব্যবহারের সমীক্ষা চালানো হয়নি এখনো। বাড়তি পণ্য পরিবহনের প্রস্তুতিও নেওয়া যায়নি এখনো। ফলে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টি কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে অসম্পাদিত বিভিন্ন ইস্যু শিগগিরই সমাধান করা যাবে। এরই মধ্যে খসড়া চুক্তি নিয়ে দু’দেশের মধ্যে সচিব পর্যায়ে কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে।

জানা গেছে, খসড়া চুক্তির ‘পোর্ট ও অন্যান্য সুবিধা’- ধারায় বলা হয়েছে, এ চুক্তির আওতায় ভারতীয় পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করবে। তবে নির্ধারিত চার্জ ও ফি আদায় করবে কর্তৃপক্ষ। পণ্য পরিবহনের রুট সম্পর্কে চারটি পয়েন্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে চুক্তিতে। এগুলো হলো- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা, সিলেটের তামাবিল ও ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডাউকি। বাকি দুটি পয়েন্ট- শ্যাওলা ও সুতারকান্দি এবং শ্রীমান্তপুর ও বিবিরবাজার। এ ছাড়া দুই দেশ আন্তঃকমিটি অনুমোদন করলে স্থলবন্দর ও রুটের সংখ্যা বাড়াতে পারবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তি কার্যকরের পর উপরোক্ত পয়েন্ট দিয়ে সড়কপথে ভারতীয় পণ্য চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে ঢুকবে এবং পরে সেখান থেকে জাহাজের মাধ্যমে বিভিন্ন গন্তব্যে চলে যাবে। একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের দুই বন্দর হয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পৌঁছবে। বিদ্যমান উপকূলীয় জাহাজ চুক্তির আওতায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে নৌপথে মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সরাসরি পণ্য আনা নেয়া করতে পারবে ভারত।

খসড়া চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে, ভারতীয় পণ্যবাহী যানকে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও বিধি মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশের বন্দরে প্রবেশের সময় এনবিআর কর্মকর্তারা পণ্যবাহী গাড়ির সব তথ্য চেক করবেন। তবে সন্দেহ হলে বা বিশেষ প্রয়োজনে গাড়িতে তল্লাশি চালাতে পারবেন। এ ছাড়া গাড়ির গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য লক ও সিল এবং গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ব্যবহার করতে পারবেন।

এতে বলা হয়েছে, কোনো কারণে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে, হারালে এবং কাস্টমস সিল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাৎক্ষণিক এনবিআরকে জানাতে হবে। খসড়া চুক্তির অপর এক উপধারায় প্রস্তাবিত বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও নেপালের মধ্যকার মোটর ভেহিকেল চুক্তির আওতায় চলাচলকারী গাড়িতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও এটি এখন কার্যকর হয়নি।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারে ভারতকে সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ওই এমওইউর আলোকে এবার নৌ-পরিবহন ও বন্দর ব্যবহারের বিষয়ে চুক্তি বাস্তবায়নে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে দু’দেশ।

সূত্র: রাইজিংবিডি