• সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮, ৫ ভাদ্র ১৪২৫
  • ||

রবীন্দ্রনাথের রসবোধ

প্রকাশ:  ০৮ মে ২০১৮, ০২:৩৫
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলা সাহিত্যে এক বিরল প্রতিভা। গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্বের অধিকারী রবীন্দ্রনাথের রসবোধের অভাব ছিল না কোনকালেই। তার রচিত সাহিত্যের এক বিশাল জায়গাজুড়েই রয়েছে হাস্য-কৌতুক। তবে শুধু সাহিত্যেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন হাস্যরসের নিপুণ কারিগর।

পাঠকদের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ কয়েকটি হাস্য-কৌতুক তুলে ধরা হলো:

১. গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় সে আমলে একজন বিখ্যাত নামকরা সঙ্গীত শিল্পী। প্রচুর ভক্ত-শ্রোতা, খুব নামডাক তার। কলকাতার জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়িতেই একবার বসেছে তাঁর বিখ্যাত গানের জলসা। রবীন্দ্রনাথও উপস্থিত ছিলেন সেই আসরে তার একজন ভক্ত শ্রোতা হিসেবে। গোপেশ্বর বাবু গান শুরু করলেন। এবার শ্রোতারা ধরলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একখানা গান গাইতে হবে। তা না হলে তার নিস্তার নেই। কবি অগত্যা রাজি হলেন, হাসি মুখে বলতে লাগলেন গোপেশ্বরের পর কি এবার দাড়িশ্বরের পালা?

২. রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তি নিকেতনে অবস্থান করছিলেন। কি ব্যাপারে যেন একটা সভা বসেছে শান্তি নিকেতনে। সভার শুরুতে যে ঘরটিতে সভা বসেছে তার সম্বন্ধে কেউ কেউ আলাপ করছিলেন ঘরটি বেশ জাঁকজমক ও সুন্দর। রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ বলে উঠলেন-এ ঘরটিতে একটা বাঁ-দোর আছে। কবির কথা শুনে ঘরসুদ্ধ লোক একেবারে হতবাক। ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। রবীন্দ্রনাথ তাদের অবস্থা দেখে মুচকি হেসে ফেললেন। বললেন বাঁদর নয়, আমি বাঁ-দোরের কথা বলছি। দেখছ না ঘরটির ডান দিকে একটি দরজা এবং বাঁ-দিকেও একটি দরজা।

৩. রবীন্দ্রনাথ এক গ্রামে গেছেন বেড়াতে। আপ্যায়নের মহা আয়োজন। খাওয়ার দাওয়াত পড়ল এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বহু আইটেম দিয়ে গৃহস্বামী খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। কবি বসলেন খেতে। সঙ্গে আছেন ক্ষিতি মোহন সেন শাস্ত্রী। গৃহস্বামী নিজে পরিবেশন করছেন। শাস্ত্রী মশাই ডিম খেতে গিয়েই বুঝলেন ডিমটা পচা। কী করবেন আড় চোখে দেখছিলেন কবি কী করেন। কবিও ডিম পচা বলে বুঝলেন। বুঝেও তিনি ডিমটা ভাতের সঙ্গে মুখে দিয়ে দিলেন। শাস্ত্রী মহাশয় পড়লেন মহাবিপদে। পচা ডিম তিনি খাবেন কী করে? গুরুর দেখাদেখি অগত্যা ওই পচা ডিমটিই তাকে গিলতে হলো। কিন্তু তার পেটটা তৎক্ষণাৎ প্রমাদ গুনল। সেই পচা ডিমটি এক মুহূর্তও সহ্য করল না, শাস্ত্রী মশাই সঙ্গে সঙ্গেই করলেন বমি। পরবর্তীতে সুযোগ পেয়ে কবিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এই পচা ডিমটি হজম করলেন কী করে? আমি তো খেয়েই বমি। রবীন্দ্রনাথ হেসে বললেন। ‘আমি তো পচা ডিম খাইনি তাই বমিও করিনি।’ শাস্ত্রী মশাই অবাক হয়ে বললেন, সে কী কথা। আমি স্বচক্ষে দেখলুম ডিমটি আপনি মুখে দিলেন। কবি উত্তরে বললেন, আমিও কি সেই ডিম খেয়েছি নাকি? আমি সাদা দাড়ির ভেতর দিয়ে সেই ডিম চাপকানের মধ্যে চালান করে দিয়েছি। এখন মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই বাঁচি।

৪. এক সাহিত্য সভায় রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন। সেই সভায় সাহিত্যিক বনফুল অর্থাৎ বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। সেই সাহিত্য আসরে বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায় একটি অসম্ভব ভাল বক্তৃতা দিলেন। সভায় উপস্থিত সবাই তার বক্তৃতার খুব প্রশংসা করতে লাগল। রবীন্দ্রানাথ তখন বললেন, বলাই তো ভাল বক্তৃতা দেবেই কারণ বলাই তো ওর কাজ।

৫. একবার এক বৈজ্ঞানিকের পুত্র কবির সাথে দেখা করতে আসেন। ছেলেটির ছিল মস্তিষ্ক বিকৃতি। কবির কাছে সে বায়না ধরলো কবিকে হাপু গান শোনাবে। কবি ধৈর্য ধরেই ছেলেটির গান শুনলেন। গান গেয়ে ছেলেটি বিদায় নিলে কবি বললেন, গানই বটে! একেবারে মেশিনগান।

৬. রবীন্দ্রনাথ তখন অস্তাচলে, প্রায় শেষ শয্যায়। একদিন রবীন্দ্রনাথের ভক্ত সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে বললেন, ‘আমরা আপনার শত বার্ষিকী করব।’ রবীন্দ্রনাথ উত্তরে বললেন, শত বার্ষিকী মানে তা মাত্র পঁচিশ টাকা। ওতে আমার কোনও মোহ নেই। কিন্তু শত বার্ষিকী মানে পঁচিশ টাকা কেন? হাসির রাজা শিবরাম চক্রবর্তীর স্টাইলে রবীন্দ্রনাথ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। শত বার্ষিকী মানে শত বার সিকি মানে পঁচিশ টাকা, তাইতো?

৭. রবীন্দ্রনাথ তখন মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কবি নিরামিষ খেতে পছন্দ করতেন। রোজই বিভিন্ন রকমের নিরামিষ রান্না হয়। একদিন হঠাৎ মগজ আনা হয়েছে। কবি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ পদার্থটি কী? মৈত্রেয়ী দেবী উত্তর দিলেন মগজ। কবির চোখে-মুখে কপট গাম্ভীর্যের রেখা ফুটে উঠল। বললেন, বিশ্ব কবির ‘ব্রেনে’ ঘাটতি পড়েছে এ কথাটি সোজাসুজি জানালেই হতো। এত কৌশল করা কেন? থাকগে, এ তর্কের চাইতে জরুরী ব্যাপার যখন সামনে তখন আর হাত গুটিয়ে বসে থাকা কেন।

৮. চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বিখ্যাত ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। তিনি শিলাইদহ গেছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা আনতে। রবীন্দ্রনাথ তখন রয়েছেন পদ্মার ওপরে বজরায়। নদীর ঘাট অবধি একটি তক্তার সাঁকো বজরা অবধি পেতে দেয়া আছে। পা টিপে টিপে সেই তক্তা ধরে চারুচন্দ্র নৌকায় উঠে আসছেন। বজরার ছাদ থেকে রবীন্দ্রনাথ সাবধান করলেন চারু, সাবধানে পা ফেলো। এ জোড়াসাঁকো নয়।

৯. সাহিত্যিক বনফুলের ছোট ভাই একবার কবির সঙ্গে দেখা করার জন্য শান্তিনিকেতন আসেন। কবি তখন কানে ভাল শুনতে পান না। কবির সেক্রেটারি অনিল কুমার তাই তাকে বলে দিলেন কবির সাথে একটু জোরে কথা বলতে। কবি এখন কানে ভাল শুনতে পান না। কবিকে বলা হলো, ইনি সাহিত্যিক বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ছোট ভাই। কবি তৎক্ষণাৎ ঠাট্টা করে বললেন তুমি বলাইয়ের ভাই কানাই নাকি? ভদ্রলোক কবির সেক্রেটারির পূর্ব নির্দেশ মোতাবেক চেঁচিয়ে বললেন, না আমি অরবিন্দ। কবি একগাল হেসে বললেন, ‘কানাই নয়, এ দেখছি একেবারে সানাই।’

১০. একদিন রবীন্দ্রনাথ তার ভক্ত ও ছাত্রছাত্রীদের সামনে গান গাইছেন- ‘হে মাধবী, দ্বিধা কেন?’

এমন সময় ভৃত্য বনমালী আইসক্রিমের প্লেট নিয়ে ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বনমালী ভাবছে ঘরে ঢুকবে কি ঢুকবে না রবীন্দ্রনাথ গান গাইছেন, এ সময় ঘরে ঢুকলে বিরক্ত হবেন কিনা কে জানে? রবি ঠাকুর বনমালীর দিকে তাকিয়ে গাইলেন, ‘হে মাধবী, দ্বিধা কেন?’

বনমালী আইসক্রিমের প্লেট রবীন্দ্রনাথের সামনে রেখে লজ্জায় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

রবীন্দ্রনাথ বলেন- ‘বনমালীকে যদিও মাধবী বলা চলে না। তবে তার দ্বিধা মাধবীর মতই ছিল। আর আইসক্রীমের প্লেট নিয়ে দ্বিধা করা মোটেই ভাল নয়।’

১১. চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় গেছেন শিলাইদহে জমিদার রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা আনতে। চারুচন্দ্র তখন ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। রবীন্দ্রনাথ তখন অবস্থান করছিলেন পদ্মার ওপারে বজরায়। নদীর ঘাট থেকে বজরা পর্যন্ত একটা তক্তার (কাঠের) সাঁকো পেতে দেয়া হয়েছে। চারুচন্দ্র পা টিপে টিপে নৌকায় উঠে আসছেন। বজরার ছাদ থেকে এ দৃশ্য দেখে রবীন্দ্রনাথ সাবধান করলেন চারুকে, ‘সাবধানে পা ফেলো। এ জোড়াসাঁকো নয়!’

১২. রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের ছেলেদের বকাঝকার পক্ষপাতি ছিলেন না। আঘাত করতেও চাইতেন না। তো একবার প্রমথনাথ বিশী সম্পর্কে একটা নালিশ এলো। নালিশ গুরুতর প্রমথকে না বকলেই নয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গুরুদেব অনেকক্ষণ ধরে বকলেন। তিনি থামলে প্রমথ বললেন, ‘কিন্তু ঘটনা হলো আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’ রবীন্দ্রনাথ হাঁক ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন, ‘বাঁচলি। তোকে বকাও হলো আবার তুই কষ্টও পেলি না।’

১৩. শান্তিনিকেতনের ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলছে অন্য এক প্রতিষ্ঠানের ছেলেরা। খেলা শেষে দেখা গেল শান্তিনিকেতনের ছেলেরা আট গোলে জিতেছে। তারাতো মহাখুশি। জানাতে গেল গুরুদেবকে। গুরুদেবও খুশি। তবে কপট ঠাট্টায় বললেন, ‘জিতেছো ভাল। তাই বলে আট গেল দিতে হবে? ভদ্রতা বলেও তো একটা কথা আছে।’

১৪. একবার এক ভদ্রলোককে বললেন রবীন্দ্রনাথ, ‘আপনাকে আমি দণ্ড দেব।’

ভীষণ বিব্রত হয়ে ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, ‘কেন, আমি কি অপরাধ করেছি?’

রবীন্দ্রনাথ লোকটির বিব্রতভাব বুঝতে পেরে হাসি হাসি মুডে বললেন, ‘গতকাল আপনার লাঠি মানে দ-টা আমার এখানে ফেলে গিয়েছিলেন। এই নিন আপনার দণ্ড!’ বলে তার দিকে লাঠিটা বাড়িয়ে দিলেন।

১৫. একবার রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজী একসঙ্গে বসে সকালের নাশতা করছিলেন। গান্ধীজীকে দেওয়া হয়েছিল ওটসের পরিজ। কারণ গান্ধীজী লুচি পছন্দ করতেন না। তবে রবীন্দ্রনাথ খাচ্ছিলেন গরম গরম লুচি। গান্ধীজী তাই দেখে বলে উঠলেন, ‘গুরুদেব, তুমি জানো না যে তুমি বিষ খাচ্ছো।’ উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘বিষই হবে; তবে এর অ্যাকশন খুব ধীরে। কারণ, আমি বিগত ষাট বছর যাবৎ এই বিষ খাচ্ছি।’

১৬. এক দোল পূর্ণিমার দিনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের। তো পরস্পর নমস্কার বিনিময়ের পর দ্বিজেন্দ্রলাল পকেট থেকে আবির বের করে রবীন্দ্রনাথকে রঞ্জিত করে দিলেন। রবীন্দ্রনাথ অসন্তুষ্ট না হয়ে সহাস্যে বললেন, ‘এতদিন জানতাম দ্বিজেন বাবু হাসির গান ও নাটক লিখে সকলের মনোরঞ্জন করে থাকেন। আজ দেখছি শুধু মনোরঞ্জন নয়, দেহরঞ্জনেও তিনি একজন ওস্তাদ।’

১৭. ঘরের জানালা খেলো। ঘুমাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে ঘর। আলোতে ঘুমাতে কষ্ট হচ্ছে কবির। তিনি ভৃত্য মহাদেবকে ডেকে বললেন, ‘ওরে মহাদেব, চাঁদটা একটু ঢাকা দে বাবা।’ আদেশ শুনে মহাদেব হতভম্ব। কিভাবে চাঁদকে ঢাকা দেবে সে? বুঝতে পেরে গুরুদেব হেসে বললেন, ‘জানালাটা বন্ধ কর, তাহলেই চাঁদ ঢাকা পড়বে।’

১৮. বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তখন খুবই অসুস্থ। শান্তি নিকেতন থেকে কবিকে কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। ঠিক সে সময় একটি ফুটফুটে ছোট্ট মেয়ে বায়না ধরে বসল কবিকে তার অটোগ্রাফ দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথ তার খাতায় কাঁপা হাতে অটোগ্রাফ লিখে দিল। তবু মেয়েটির মন ভরল না। মেয়েটি কেঁদে কেটে বায়না ধরল-কবির অটোগ্রাফের পাশে কবিতা লিখে দিতে হবে। ছোট্ট মেয়েটিকে নিরাশ করলেন না কবি। তিনি তাৎক্ষণিক লিখলেন-

মোর কাছে চাহ তুমি পদ্য

চাহিলেই মিলে কি’তা সদ্য।

তাই আজ শুধু লিখিলাম

নিজের নাম,

এর বেশি কিছু নহে অদ্য।

[বিভিন্ন গ্রন্থ ও পত্রিকা থেকে সংগৃহীত] -একে

রবীন্দ্রনাথের,রসবোধ