• রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, -১ পৌষ ১৪২৪
  • ||
  • আর্কাইভ

অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি চান সরকারি চাকুরেরা

প্রকাশ:  ১২ অক্টোবর ২০১৭, ২১:১৭ | আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৭, ২৩:১৫
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি চান সরকারি চাকরিজীবীরা। তারা বলছেন, আগের তুলনায় দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। সরকারের অর্থে কর্মকর্তারা দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে, লেখাপড়া করে পেশাগতভাবে সমৃদ্ধ হয়ে যখন অবসরে যাচ্ছেন, অনেকেই কর্মক্ষম থাকছেন।

শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যের দিকে তাকিয়ে অনেকেই ৫৯ বছরকে চাকরি থেকে চলে যাওয়ার বয়স মনে করছেন না। প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির দাবিটি জোরালো হচ্ছে। সচিবালয় ও সচিবালয়ের বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির বয়স ৫৯ বছর। মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়স ৬০ বছর। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ৬৫ ও বিচারপতিরা ৬৭ বছর বয়সে অবসরের সুবিধা পাচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭১ বছর ৬ মাস।

কর্মকর্তারা জানান, স্বাধীনতার পরের বছরগুলোর বাজেট আর এখনকার বাজেটে অনেক পার্থক্য। এখনকার বড় বাজেট বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মকর্তা সেভাবে তৈরি হয়নি। তবে অনেকেই দক্ষ হয়ে উঠছেন। পেশাগতভাবে দক্ষ হয়ে উঠলেও ৫৯ বছরেই তাদের অবসরে চলে যেতে হচ্ছে। অবসরের পর তারা বিপুল বেতনে বেসরকারিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগ দিচ্ছেন। সরকার তৈরি করে দিলেও এসব কর্মকর্তার কাছ থেকে সেভাবে সেবা নিতে পারছে না।

তবে কেউ কেউ বলছেন, দেশে সরকারি চাকরির সুযোগ এমনিতেই সীমিত। বেকারত্বের হারও দিন দিন বাড়ছে। চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হলে সে সুযোগ আরও সীমিত হবে। কেউ কেউ বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ৬৫ বছর ও বিচারপতিরা ৬৭ বছর পর্যন্ত কাজ করতে পারলে সরকারি চাকরিজীবীরা কেন পারবেন না।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সিরাজুল হক খান এ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বয়স ৬৫ বছর না হলে তো কিছু কন্ট্রিবিউটই করে যাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের ৫৯ বছরে চলে যেতে হয়। কিন্তু এ লোকগুলো ঠিকই বাইরে বিভিন্ন জায়গা আরও ১০-১২ বছর কাজ করেন।’

বিচারকরা ৬৭ বছরে ঠান্ডা মাথায় রায় দিতে পারলে আমরা চাকরি করতে পারব না কেন- প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারপ্রধানকে বলেছি, দেশের স্বার্থেই চাকরির মেয়াদ বাড়ানো উচিত।’ সিরাজুল হক বলেন, ‘পৃথিবীর কোথাও সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স ৫৯ বছর নেই। নিদেনপক্ষে ৬০ বছর রয়েছে। ৬২, ৬৫ বছর, এমনকি ৬৭ বছরেরও উদাহরণ আছে।’

এ সচিব আরও বলেন, ‘একটি দক্ষ লোক তৈরি হলো, অবসরের পর তিনি অন্য জায়গায় বিপুল বেতনে চাকরি করছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বডিতে কাজ করার কারণে সম্মানও পান তারা। কিন্তু এটা তো সরকারের সরাসরি লোকসান।’

‘আমরা এ কথাটা বলেছি, দেশে-বিদেশে এত প্রশিক্ষণ, লেখাপড়ার মাধ্যমে তৈরি হওয়া মানুষ আমরা ছেড়ে দিচ্ছি। বেকারত্বের কথাই যদি বলা হয় তবে বলব ১০-১২ শতাংশ হচ্ছে সরকারি চাকরি। আর সবই তো হচ্ছে বেসরকারি চাকরি। তবে সরকারি চাকরির বয়স বাড়ালে বেকারত্ব কতটুকু কমবে?’ বলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব।

সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স বৃদ্ধির কোনো প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘সার্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের বয়স ৬০ বছর করা উচিত বলে আমি মনে করি।’

বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ে বিসিএস (প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র ছাড়া) ২৬ ক্যাডারের সমন্বয়ে গঠন করা বিসিএস সমন্বয় কমিটির মহাসচিব মো. ফিরোজ খান কে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে অনেক টেকনিক্যাল কাজের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রয়েছেন। আমরা দেখেছি এই কর্মকর্তারা চাকরির শেষ দিকে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন। প্রথম ৫ থেকে ১০ বছর হচ্ছে শেখার সময়। তারপর সে ধীরে ধীরে কাজের গভীরে গিয়ে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে। শেষের তিন-চার বছরের কন্ট্রিবিউশনটা ২৭ বছরের সময় হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘এজন্য অবসরের বয়স বাড়ানোর বিষয়টি আমরা সমর্থন করি। তবে নতুনদের জন্য চাকরির সুযোগও সৃষ্টি করতে হবে। কারণ চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হলেও তো নতুনদের পথটা বাধাগ্রস্ত হয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, এখন গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর। এছাড়া স্বাস্থ্যের উন্নতি হওয়ার কারণে ৬৫ বছরেও অনেকে কর্মক্ষম থাকছেন। এখন যারা পিআরএলে (অবসরোত্তর ছুটি) যাচ্ছেন তাদের দেখে মনে হয় আরও কিছুদিন তারা কাজ করে যেতে পারলে ভালো হত। যারা চাকরি থেকে চলে যাচ্ছেন তাদেরও মনে হয় আমার যাওয়ার সময় হয়নি। আরেকটু থাকতে চাই। প্রায়ই দেখা যায় পিআরএলে যাওয়ার পর অনেকে একটা কাগজ নিয়ে ঘোরে আর বলে আমাকে যদি কোনো জায়গায় একটু কাজে লাগাতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘আগে অবসরে যাওয়ার আগেই মানুষ অসুস্থ হয়ে যেত, বলত কবে আমার এলপিআরের ডেট আসবে। এখন এ রকম নেই। উল্টো হয়ে গেছে।’ সিনিয়র সচিব আরও বলেন, কিছু হয়তো সমস্যাও আছে যে, বয়স বাড়ানো হলে লোক বিদায় হবে না, লোক বিদায় না হলে নতুনদের সুযোগ হবে না।

অস্ট্রেলিয়ায় অবসরের কোনো নির্ধারিত বয়স নেই জানিয়ে মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘সেখানে সক্ষমতা কমে গেলে কাজও কমিয়ে দেয়া হয়। বেতনও দেয়া হয় সে অনুযায়ী। আমাদের দেশে অবসরের বয়স বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের অনেক বিষয় ভাবার আছে।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে সরকার চাইলে অবসরের বয়সটা বাড়াতে পারে। তবে দু-এক বছর বাড়লে তেমন কোনো ক্ষতি নেই, এমনটাই বলা হচ্ছে। আমাদের দেশে শিক্ষক ও বিচারকরা তো এর চেয়ে বেশি বয়সে চাকরি করছেন।’

close