• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
  • ||

আমার একটি প্রেম ছিল

প্রকাশ:  ০৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০২:৪০ | আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০৩:০০
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট

একবার আমি প্রেমে পরেছিলাম সেই কোন শৈশবে বাঙালি জাতির হ্যামিলনের বংশীবাদক বা জাতির মহত্বম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের জীবন-যৌবন উৎসর্গ করে কখনো কারাদহন, কখনো ফাঁসির কাষ্ঠে আরোহণ; তবুও জাতির সঙ্গে দেয়া অঙ্গিকার থেকে বিচ্যুত না হয়ে বিসুভিয়াসের মতো জ্বালিয়েছিলেন এই জাতিকে মহান স্বাধীনতার মন্ত্রে। তার ডাকেই সুমহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে বিজয়ী জাতি হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় ঘটেছিল- সেটি ছিল আমার শৈশবকাল।

৭৫ এর ১৫ আগস্ট কালোরাতে বাঙালি জাতির ইতিহাসের ঠিকানা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে পরিবার পরিজনসহ জাতির ঐক্যের প্রতীক বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল খুনিচক্র। গোটা দেশ যেন সেদিন শোকে স্তব্ধই হয়নি, মাতৃভূমির মাটি ভেসেছিল জনকের রক্তে। তারপর খুনিদের উল্লাসই ছিল না, ইতিহাসের চাকা পরাজিত শক্তির পক্ষেই ঘুরিয়ে দেয়া হয়নি; গণতন্ত্রের কবর রচনা করে এক কঠিন রাজনৈতিক দমন পীড়নই নেমে আসেননি, জাতির জীবনে ঘোর অন্ধকার নেমেছিল।

সেই অন্ধকার সময়ে স্কুল জীবনের শেষলগ্নে সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের ৭৫ উত্তর আহ্বায়ক ও দুবারের নির্বাচিত সভাপতি অগ্রজ মতিউর রহমান পীরের হাত ধরে নেমেছিলাম পিতৃহত্যার প্রতিবাদে, গণতন্ত্র মুক্তির আকুতি নিয়ে রাজপথে। সে কি আবেগ! সে কি গভীর মমত্ববোধ! নেতা ও আদর্শের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা। সে কি হৃদয় নিঃসৃত আবেগ, প্রেম ও বিশ্বাসই নয়; বুকটা জুড়ে তুমুল উত্তেজনা! আমাদের নেতারা শিখিয়েছিলেন আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে আদর্শভিত্তিক ত্যাগের মহিমায় রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথ ধরে আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মানব কল্যাণের রাজনীতির পাঠ।

সেই ছাত্রলীগ খেয়ে না খেয়ে, ভাইয়ে ভাইয়ে হাত ধরাধরি করে কবিতায় মিছিলে স্লোগানে স্লোগানে একটি পরিবারের ছায়ায় গভীর মমতায় বেড়ে উঠা। সেই ছাত্রলীগ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আদর্শবান নেতৃত্ব আমাদের শিখিয়েছিল পড়াশুনার যেমন বিকল্প নেই, তেমনি সৃজনশীলতা, মেধা ও মননশীলতার আলোর পথ। ছাত্রলীগ মানেই ইতিহাসের এক বিশাল ক্যানভাস। এর প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিষ্কার বলে গেছেন, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস; ছাত্রলীগের ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস।’ স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতার পথ ধরে মহান বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে গণ জাগরণ, যে গণ-অভ্যুথান, যে গণরায় আদায় ও স্বাধীনতার ডাক দেয়ার মধ্য দিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয়ের সন্ধান লাভ-তার শক্তির উৎসই হচ্ছে ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগ মানেই নিয়মিত ছাত্রদের প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ মানেই নেতৃত্বের গাইড লাইন অনুসরণ। কারো অন্ধ লেজুরবৃত্তি নয়। ছাত্রলীগ মানেই ত্যাগের মহিমায় মানুষের কল্যাণের রাজনীতির আদর্শিক কর্মী হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলার প্রয়াস। সেই পথ ত্যাগের পথ। সেই পথ আত্ম দানের পথ। সেই পথ কখনোই ভোগ বিলাস, অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতা ব্যবহারের পথ নয়।

আহ! সেই ছাত্রলীগ জীবনের লড়াইয়ের শিক্ষা গ্রহণের বড় পাঠশালা। আত্ন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের দ্যুতিতে জ্বলে উঠার দ্রোহে, বিপ্লবে, বিনয়ে আচরণে, প্রতিবাদে-প্রতিরোধে জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার অদম্য শক্তি। ছাত্রলীগ মানেই অন্যায়ের প্রতিবাদ, ন্যায়ের পক্ষে স্বোচ্ছার। ছাত্রলীগ মানেই ছাত্র সমাজের নায্য দাবির সঙ্গে অধিকার হারা মানুষের জন্য দৃঢ়তার সঙ্গে লড়বার অদম্য প্রেরণা। ছাত্রলীগ মানেই মাইকিং, ছাত্রলীগ মানেই হাতে লেখা পোস্টার। শিক্ষাঙ্গনে সময় বেঁধে মিছিল, ছাত্র ছাত্রীদের আদর্শের মর্মবাণী ছড়িয়ে সংগঠনে টানা। ছাত্রলীগ মানেই তুমুল বিতর্ক, বাহাস, অনলবর্শী বক্তৃতা, বাগ্মীতা রপ্ত করার পাঠ। ছাত্রলীগ মানেই অজানাকে জানা, জ্ঞানের গভীরে তুমুল সাঁতার কাটা। ছাত্রলীগ মানেই নীতিবান মানুষ হিসাবে আদর্শকে লালন করে বেড়ে উঠা।

সে কালের ছাত্রলীগ মানেই গৌরব ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করা এক মহান আদর্শের পথ। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, কমিটি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য বলে কোনো শব্দের সঙ্গে কোনো কালেই পরিচিত না হওয়া। ছাত্রলীগ মানেই বঙ্গবন্ধু। ছাত্রলীগ মানেই মুক্তিযুদ্ধ। ছাত্রলীগ মানেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, গণতান্ত্রিক চেতনা, মূল্যবোধ, মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন পর্যন্ত এই গভীর প্রেম আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল। এখনো কৈশোরের সেই প্রেম মনে পড়লে আবেগ আপ্লুত হই। এক অজানা শিহরনে শিহরিত হই।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, পূর্বপশ্চিম

apps