• সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮, ৮ শ্রাবণ ১৪২৫
  • ||

আহ্ হা রে জীবন – পরিসংখ্যান সম্ভাবনামাত্র

প্রকাশ:  ১১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:৩২
ড. জীবেন রায়
প্রিন্ট

সত্যিই তো . ‘জীবন যেমন জলে ভাসা পদ্ম পাতা’য় এক বিন্দু জলের ফোঁটা। এই বুঝি ঢেউ লেগে আবার জলে মিশে যাবে! আবার নতুন বিন্দু বিন্দু জল জায়গা করে নিবে। মানব জীবন প্রকৃতির মতোই। অর্থাৎ মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। প্রকৃতিতে অন্যান্য প্রান – বৃক্ষরাজি থেকে শুরু করে প্রানীকুল, জীবানু থেকে তিমি – সবকিছুর মূলে রয়েছে জন্ম, জীবন, ও মৃত্যূ।

রাজনীতিতে ভালো মানুষ পাওয়া হাতের আঙ্গুলে গোনা। অরাজনৈতিক ভালো মানুষ অনেকটাই মেলে। আবার সেই অরাজনৈতিক ভালো মানুষগন রাজনীতির বলয়ে আসতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না। আমার সমসাময়িক সম্প্রতি প্রয়াত আনিসুল হক ঢাকার মেয়র হওয়ার পেছনের কাহিনী জনকন্ঠ সম্পাদক, স্বদেশ রায় ও পীর হাবিবের লেখা পড়ে অনেক অজানা কথা জেনেছি। পদ্মপাতার জীবনে ভালো মানুষ ছিলেন আনিসুল হক; আর মৃত আনিসুল হক আরো ভালো মানুষ হয়ে উঠলেন। এমন মানুষইতো প্রয়োজন বাংলাদেশে। সেই আমাদের সময়ে অর্থাৎ নব্বই দশকে টেলিভিশনে উপস্থাপনায় বিপ্লব এনে দিয়েছিল আনিসুল হক। যে বিপ্লব এনেছিল সাহিত্য ক্ষেত্রে আমার সিনিয়র বন্ধু, সহকর্মী, হূমায়ূন ভাই। প্রেম-ভালোভাসার ঘটনা দিয়ে একজন ক্রিয়েটিভ মানুষ, ভালো কিনা কখনোই যাঁচাই করা হয় না এবং করা উচিতও নয়। কেননা ক্রিয়েটিভির জন্যই কারো কারোর ক্ষেত্রে এসব অলংকার প্রয়োজন। আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের কথাই ধরুন। তিনি একজন নামি উপন্যাসিক না হলে, তাকে মদ্যপ, নারীবাজ, দুশ্চরিত্র হিসেবে দেখা হতো। অথচ সেইসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট দিয়ে হেমিংওয়েকে বিচার করা হয় না। আমরা তাঁকে চিনি কালজয়ী উপন্যাসিক হিসেবেই। হূমায়ূন আহমেদ তেমনি একজন কালজয়ী উপন্যাসিক।

সে যাই হোক, মৃত্যূ সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ভালো মানুষগনও যেকোনো সময় মরে যেতে পারে অতি অল্প বয়সে, আবার অনেককাল বেঁচেও থাকতে পারে। ভালো মানুষ অনেকদিন বেঁচে থাকলে সাধারন মানুষ খুশী হয়। আমেরিকার একজন ধনী এবং পরোপকারী ব্যাক্তিত্ত্ব ওয়ারেন বাফে ক্যানসার জয়ী, এখনো বেঁচে আছেন – ভাবতেই ভালো লাগে। আবার স্বামী বিবেকানন্দ মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে মারা যান। একজন জিনিয়াস, এপেলের ষ্টীভ জব্স মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে মারা যান। অন্যদিকে, চার্লস ম্যানসন, আমেরিকান কূখ্যাত সাজাপ্রাপ্ত খুনী প্রায় পঞ্চাশ বছর জেলে থেকে তিরাশী বছর বয়সে জেলেই সম্প্রতি মারা যায়।

মোদ্দাকথা, এসব জন্ম- মৃত্যূ শুধুই পরিসংখ্যানগত সম্ভাবনামাত্র (প্রোবাবিলিটি)। ভালো কাজ করে, মনে প্রানে ভালো মানু্‌ষ, ধুক করে মরে যেতে পারে, আবার মন্দ লোক অনেকটা কাল বেঁচেও থাকতে পারে।

ইহূদী ধর্মাবলম্বী আইষ্টাইন রিলেটিভিটি থিওরী দিয়ে বিজ্ঞান জগতের অগ্রগতির পথ উন্মোচন করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাককাল পর্যন্ত জামানীই ছিল বিজ্ঞানীদের কেন্দ্র বিন্দু। আর সেই আইষ্টাইন রিফিউজি হয়েই আমেরিকায় এসেছিল। আইন্ষ্টাইনের বিখ্যাত রিলেটিভিটি থিওরীও সত্য-মিথ্যে অনেক চড়াই উৎড়াই পাড় হয়ে প্রমানিত হয়েছিল এবং বিজ্ঞান জগতে বিপ্লব এনে দিয়েছিল। ধর্মীয় দৃষ্টিতে আইষ্টাইন ছিলেন একজন এগনষ্টিক, অর্থাৎ নাস্তিক নন, আবার তেমন ধার্মিকও নন। তবে তিনি একটি জীবনেই বিশ্বাসী ছিলেন, পুণর্জন্মে নয়। একজন ভালো বিজ্ঞানী এবং একজন ভালো মানুষের নিন্মোক্ত উক্তিটি সব মানুষের জন্যই প্রযোজ্য।

“শান্ত এবং সহজ সরল জীবন যাপনের মাধ্যমেই সুখ খুঁজে পাওয়া যায়। সুখের পেছনে অক্লান্ত বিশ্রামহীন ছূটাছূটির মাধ্যমে নয়।“ জাপানে একটি হোটেল বয়কে টিপস দিতে গিয়ে টাকা না দিয়ে শুধুমাত্র এই নোটটি লিখে দিয়েছিলেন। পরবর্তিকালে এই লেখাটি অকশানে মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। আইষ্টাইন ৮৪ বছরে পরলোকগমন করেন।

বিজ্ঞানের ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে আমি এখনও অবাক হই, বিজ্ঞান কিভাবে কাজ করে এবং কিভাবে নানা রহস্যের কূল কিনারা করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিজ্ঞান কিভাবে রোগ শোক ভাল করে ফেলে? আমি ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞেস করি, লবন পানিতে মিশালে কি হয়? ওরা বলে লবন পানিতে মিশে যায়। আমি বলি এটাতো রাস্তার অশিক্ষিত লোকটার উত্তর হলো। কেমিষ্টের চোখে এর উত্তর কি হবে? লবন হলো সোডিয়াম ক্লোরাইড। পানিতে তা সহজেই পজেটিভ এবং নেগেটিভ আয়নে পরিনত হয় এবং পানির অনুগুলো তখন চার্জ অনুযায়ী ঘিরে রাখে। বিজ্ঞানতো তাই বলে। কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে বিজ্ঞান কি বলে? আমি জানি, তা আলোচনা করার বিষয় নয়। আমার কথা, ঈশ্বর আছেন – তা বিশ্বাস করে আপামর জনতা যদি ভালো থাকেন, তাহলে আমরা সবাই খুশি। জনগন খুশী, তো সরকারও খুশী। সরকার তো জনগনেরই।

সুতরাং ধর্ম নিয়ে কোন মাতামাতি নয়। তাতে কারো ভালো হয় না। আপনার ধর্ম আপনার। আপনি ধর্ম পালন করে সুখী হোন – কেউ তাতে বাঁধা হয়ে দাড়াবে না। তাহলে অহেতুক কেন মারামারি? কাটাকাটি করবেন? কোনো ধর্মই বলেনা ভিন্ন মতালম্বীদের খুন কর। একই গন্তব্যে বিভিন্ন পথে যাওয়া যায়।

চীন দেশটির কথাই ধরুন। প্রায় একশত পঁচিশ কোটি লোকের দেশ। রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো ধর্মই নেই। বেশীর ভাগই এগনষ্টিক নয়ত নাস্তিক টাইপের অথবা ধর্ম নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। অথচ দেশটি কেমন এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের দিকে। অনেক চিন্তাবিদ বলছে খুব শীঘ্রই যুক্তরাষ্ট্রকে ডিঙ্গিয়ে যাবে। ঈশ্বর যদি থেকেই থাকে তবে এই “ঈশ্বর না মানা”কমিউনিষ্ট দেশটিকেও সমান চোখেই দেখছে বৈকি! চীনারাও দীর্ঘায়ূ হয়। কাজে কাজেই বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু যায় আসে না।

প্রকৃতির নিয়মে তিনশত পঁয়ষট্টি দিন পর ইংরেজী নতুন বছর ২০১৮ সালের সূর্যোদয় হলো ক’দিন আগে। সবার বয়সই এক বছর বেড়ে গেলো। গেলো বছরটায় কিংবা তার আগের বছরটায় কত অঘটন ঘটে গেলো বিশ্বজুড়ে। ঢাকায় একটি রেষ্ট্রুরেন্টে কি অপ্রত্যাশিত হত্যাকান্ডই না ঘটে গিয়েছিলো। অপ্রত্যাশিত দুইডজন দেশী বিদেশী মানুষ হঠাৎ করেই মৃত্যূ বরন করলো সন্ত্রাসীদের হাতে।

আমেরিকার মতো দেশেও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড লেগেই আছে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ছাড়াও প্রাকৃতিক দূর্যোগও অহরহই হচ্ছে। টর্নেডো, হ্যারিকেন, ব্রাশ ফায়ার, সড়ক দূর্ঘটনা, প্লেন, ট্রেন, জাহাজ ইত্যাদি দূর্ঘটনাও বেশ বড় আকারেই ঘটে থাকে। হিউষ্টনের মতো একটি শহর হঠাৎ করেই হারিকেনে প্লাবিত হলো কয়েক ডজন লোক মারা গেলো, আবার কেউ কেউ অস্বাভাবিক ভাবেই বেঁচে গেলো। ফ্লোরিডা এবং পোর্টারিকোতেও আরো ভয়াবহ প্লাবন এবং হারিকেন হলো। আবার কালিফোর্নিয়ায় দাবানলে বাড়ীঘর পুড়ে ছাই এবং সেই সাথে কয়েকডজন মানুষের মৃত্যূ। বিশেষ করে কালিফোর্নিয়ায় সেই দাবানল একবার লেগে গেলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলতে থাকে। বন উজার হয়ে যায়। বাড়ীর পর বাড়ী পুড়ে ছাই হয়ে পড়ে। মানুষেরও মৃত্যূ হয়।

আর্জেন্টিনা থেকে চল্লিশোর্ধ ছয়বন্ধু ত্রিশ বছরপর রিইউনয়ন করার জন্য গতবছর নিউইয়র্ক এসেছিলো। এবং এক টেরোরিষ্ট দূর্ঘটনায় নিউইয়র্কেই লাশ হয়ে গেলো। তাছাড়া সারা বিশ্বজুড়েই প্রতিনিয়ত গাড়ী-বাস-ট্রেন-প্লেন দূর্ঘটনা হচ্ছে। অপ্রত্যাশিতভাবে মানুষ মারা পড়ছে। আবার স্বাস্থ্যগত কারনে, বয়স হওয়ার কারনেও প্রতিদিন মানুষ মৃ্ত্যূবরন করছে।

এইসব সকল ধরনের মৃত্যূকেই আমি বলতে চাচ্ছি পরিসংখ্যান সম্ভাবনামাত্র। বড়বড় শহরে বসবাস করলে টেরোরিষ্ট এটাকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশী; তেমনি দূর্ঘটনায় পড়ার সম্ভাবনাও বেশী। আবার সাগরপাড়ে বসবাসের আনন্দ উল্লাস যেমন, তেমনি জলোচ্ছাসে প্রাণনাশের সম্ভাবনাও থাকে বৈকি। পাহাড়, উপত্যকায় বিশুদ্ধ পরিবেশে বসবাস যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি মাটি ধ্বসে প্রাণ হারানোর সম্ভাবনাও থাকে। তবে প্রকৃত সত্যি হলো, প্রাকৃতিক দূর্যোগে মৃত্যূতে কোনোরূপ পক্ষপাতিত্ব নেই। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, আইনানুগ, বেআইনি, সিটিজেন, কিংবা ইমিগ্র্যান্ট, প্রাপ্ত বয়স্ক, নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ - সবাই প্রাকৃতিক দূর্যোগের কাছে সমতূল্য। প্রকৃতিই যখন বাছ-বিচার করে না, তখন মানুষ করবে কেন? এইতো জীবন!

পরিসংখ্যান সম্ভাবনার ভিত্তিতে একজন ব্রিটিশ পদার্থবিদ, ড. ষ্টিফেন আনউইন একদশক আগে “প্রোভাবিলিটি অব গড” নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। প্রায় আড়াইশ বছরের আগেকার বেইস থিওরেমকে ভিত্তি করে শুধুমাত্র “ডিভাইন ইন্ডিকেটর” ব্যবহার করে ড. আনউইন ঈশ্বরের অস্থিত্ব প্রমান করার চেষ্টা করেছেন। সুখের কথা, তার ফর্মূলা অনুযায়ী শতকরা ৬৭ ভাগ সম্ভাবনা যে ঈশ্বর আছেন। ডিভাইন ইন্ডিকেটর হিসেবে যে ৬টি বৈশিষ্ট ব্যবহার করেছেন তা বেশ চমকপ্রদ।যেমন, মহৎ গুণাবলী (মান ১০ ), অশুভ নৈতিকতা ( মান ০.০১), প্রাকৃতিক দূর্যোগ (মান ০.০০০১), ছোটখাট অলৌকিক ঘটনা (মান ০.০০১), বড় বড় অলৌকিক ঘটনা (মান ০.০০০১), ধর্মীয় অভিজ্ঞতা (মান ১)।

যতদিন যাবে বিজ্ঞানের অন্বেষাও চলতে থাকবে। একদিন হয়ত অন্য গ্রহের মানুষদের সাথে পৃথিবীর মানুষদের পরিচয় ঘটবে। সিলিকন টেকনোলজি থেকে কার্বন টেকনোলজি চালু হয়ে যাবে। আর্টিফিসিয়েল ইন্টিলিজেন্স মানুষের বুদ্ধিমত্বাকেও ছাড়িয়ে যাবে। কত অজানারে জানার প্রত্যাশায় আরো অন্তত এক দশক বেঁচে থাকতে চাই।

লেখক: আমেরিকান প্রবাসী অধ্যাপক