• সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮, ১১ আষাঢ় ১৪২৫
  • ||

গরিবের ঘোড়া রোগ

প্রকাশ:  ২৭ মে ২০১৮, ০০:৫৯
মেজর মো. আখতারুজ্জামান (অব.)
প্রিন্ট
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট হলো চাঁদ। চাঁদের কারণে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা হয়, রাতের অন্ধকার ফিকা হয় এবং আরও বিবিধ সুযোগ-সুবিধা পৃথিবীতে পাওয়া যায়। চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরছে বা বলা হয় পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। এ ছাড়াও আজকে আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে মানুষের তৈরি হাজারখানেক কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট মানুষের প্রয়োজনে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে।  এগুলোর বেশিরভাগ বিষুবরেখা বা ইকুইটরের ৩৬ হাজার কিলোমিটার উপরে স্থাপন করা হয়েছে।  সাধারণত একটি কৃত্রিম স্যাটেলাইট পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ কাভার করতে পারে অর্থাৎ তিনটি স্যাটেলাইট মিলে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর শেষ প্রান্ত ছাড়া সমগ্র পৃথিবী কাভার করতে পারে।  কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট হলো একটি ধাতব কাঠামো যা বিষুবরেখার উপরে প্রতিস্থাপন করে পৃথিবীর আহ্নিক গতির সমগতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। যেহেতু পৃথিবীর আহ্নিক গতির সমগতিতে স্যাটেলাইট পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে ফলে পৃথিবীর যেই এক-তৃতীয়াংশ কাভার করে সেই এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে স্যাটেলাইটটি দৃশ্যত সরাসরি স্থায়ী বা পারস্পরিক গতিশূন্য হয়ে যায়।

পৃথিবীর একটি অংশের সঙ্গে স্যাটেলাইট আপেক্ষিকভাবে স্থির হয়ে যাওয়ার কারণে স্যাটেলাইটটিতে মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন গেজেট বা যন্ত্র স্থাপন করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে যেসব সুযোগ-সুবিধা স্যাটেলাইটে বিভিন্ন যন্ত্র বা গেজেট প্রতিস্থাপন করে পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর অন্যতম হলো: কমিউনিকেশন বা ব্রডকাস্টিং, মিলিটারি ও রিকনোসেন্স, মেট্রোলজি, নেভিগেশন, ইমেজিং ও রিমোট সেন্সিং, রিসার্চ ইত্যাদি।

স্যাটেলাইটে একটি এন্টিনা বা ডিশ প্রতিস্থাপন করে ভূপৃষ্ঠ থেকে রেডিও তরঙ্গ প্রেরণ ও সংগ্রহ করে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক করা হয়, যার মাধ্যমে দ্রুতগতিসম্পন্ন বিভিন্ন সিগন্যাল প্রেরণ ও গ্রহণ করা সম্ভব হয়, যা ব্রডকাস্টিং ও ইন্টারনেট  ব্যবহারের সুযোগ অনেকগুণ বৃদ্ধি পায়। সাধারণত বিশ্বব্যাপী দূরত্বে দ্রুতগতিসম্পন্ন উচ্চমাত্রার রেডিও তরঙ্গ প্রেরণ করার বেলায় স্যাটেলাইটের এন্টিনা অনেক বেশি কাজ করে কিন্তু ভূমি থেকে ভূমি এবং স্বল্প দূরত্বের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি একক স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। বিশেষ করে ক্ষুদ্র আয়তনের দেশ যেসব দেশের দৈর্ঘ্য প্রস্থ ৫০০ কিলোমিটারের কম সেসব দেশের স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা বিলাসিতার শামিল।

স্যাটেলাইটের কাঠামোতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন ক্যামেরা, সেন্সরে অত্যন্ত সংবেদনশীল গেজেট প্রতিস্থাপন করে সামরিক তথ্য, চলাচল, স্থাপনা ইত্যাদি সামরিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি বা অতি সেন্সেটিভ তথ্য সংগ্রহ করার কাজে ব্যবহার করা হয় সামরিক স্যাটেলাইট। সামরিক তথ্যাদি গ্রহণ বা আদান-প্রদান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ যা কোনো দিনই পৃথিবীর কোনো ছোট দেশই সংগ্রহ করতে পারবে না এবং আজ পর্যন্ত কেউ পারেনি। তাছাড়া ছোট এবং স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য এ ধরনের সামরিক কাজের জন্য স্যাটেলাইট ব্যবহার করতে যাওয়া মানে দেশের জনগণের সর্বনাশ ডেকে আনা। মেট্রোলজিক্যাল তথা আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ করার জন্য স্যাটেলাইটের কাঠামোতে অত্যন্ত সংবেদনশীল উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন গেজেট প্রতিস্থাপন করে আবহাওয়ার গতি-প্রকৃতি লাগাতার পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাতে আবহাওয়ার যে কোনো পরিবর্তন সঙ্গে সঙ্গেই পর্যবেক্ষণ করে তার পূর্বাভাস প্রদান করতে পারে। এটি একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এর জন্য উচ্চমাত্রার পেশাগত দক্ষতা অর্জন অত্যাবশ্যক। সাধারণত মহাসাগরের দূরবর্তী কোনো দেশের জন্য আবহাওয়ার ত্বরিত বা তাত্ক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করা তেমন জরুরি নয়, কারণ মহাসাগরে সৃষ্ট যে কোনো বিরূপ আবহাওয়া দূরবর্তী দেশে পৌঁছতে অনেক সময়ের ব্যাপার যা সাধারণ আবহাওয়া টাওয়ার থেকেই জেনে নেওয়া সম্ভব। 

তাছাড়া বিমান চলাচলের জন্য যে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দরকার পরে তা সাধারণত ছোট দেশের ভৌগোলিক সীমায় তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না। মহাসাগরের ওপর দিয়ে বিমান চলাচলের সময় আবহাওয়ার পূর্বাভাস যত জরুরি স্থলভাগের ওপর দিয়ে বিমান চলাচলের সময় তত বেশি জরুরি নয়। তাছাড়া বিশ্ব বিমান চলাচল এখন আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের ওপর নির্ভরশীল সেখানে ছোট ছোট দেশগুলোর আলাদা আবহাওয়া তথ্যের কোনো গুরুত্ব বহন করে না। স্যাটেলাইটে বিভিন্ন সেন্সর, মনিটর, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা ও অন্যান্য গেজেট প্রতিস্থাপন করে গভীর সমুদ্রে ও মহসাগরে জাহাজ চলাচলের নেভিগেশনে অনেক সহায়তা পাওয়া যায়। তাছাড়া লম্বা দূরত্বের বিমান চলাচলের নেভিগেশনেও অনেক সুবিধা হয়। বড় বড় শহরের অলিগলি চিনতে বা নির্বিকারে গাড়ি চালাতে যেমন নেভিগেশন সহায়তা করে তেমনি দুর্গম বা অপরিচিত বা আন্তঃপ্রদেশ বা দূরবর্তী নগর-মহানগরের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগের জন্যও নেভিগেশন খুবই প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হলো কোনো গভীর সমুদ্র বা মহাসাগর যেমন আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই তেমনি লম্বা দূরত্বের কোনো বিমানপথ আমরা নিয়ন্ত্রণ করি না। একইভাবে আমাদের দেশটি ক্ষুদ্র এবং এককেন্দ্রিক হওয়াতে কোনো জটিল বা অপরিচিত সড়ক নেটওয়ার্ক বা জাল নেই যে এক সড়ক থেকে আরেক সড়কে যেতে খুব বড় ভুল করে ফেলব। কাজেই আমাদের প্রেরিত স্যাটেলাইটে আরও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে নেভিগেশন তথ্য সংগ্রহ করার তেমন কোনো প্রয়োজন পড়বে না। নেভিগেশনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন তা অনেক কম খরচে আমরা অন্য স্যাটেলাইট থেকে নিতে পারব।

একইভাবে অত্যন্ত উচ্চ প্রযুক্তির বিভিন্ন গেজেট স্যাটেলাইটে প্রতিস্থাপন করে ইমেজিং ও রিমোট সেন্সিংয়ের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠ, ভূঅভ্যন্তরসহ আকাশ-মহাকাশের বিভিন্ন সম্পদের অবস্থান, পরিমাপ ইত্যাদি জেনে নিয়ে তা আহরণ বা সংরক্ষণ করার আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রযুক্তি সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু সেই তথ্য প্রযুক্তি সক্ষমতায় পৌঁছতে আমাদের মতো মধ্যম আয়ের দেশের আরও অনেক সময় লাগবে এবং সক্ষমতা অর্জনের জন্য অন্তত আগামী ১০-১৫ বছর স্যাটেলাইট আমাদের কোনো কাজে আসবে না। ইমেজিং ও রিমোট সেন্সিংয়ের জন্য আমাদেরকে প্রথমে প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোগত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে, তারপরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে সুবিধা অর্জন করা যাবে। তবে আনন্দের কথা এই যে আমাদের প্রেরিত স্যাটেলাইটিতে উন্নত প্রযুক্তির ইমেজিং ও সেন্সিংয়ের তেমন কোনো গেজেট সন্নিবেশিত করা হয়নি। কাজেই এ স্যাটেলাইট আমাদের ভূগর্ভস্থ তেল, গ্যাস বা প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে তেমন কোনো ভূমিকা রাখবে কি রাখবে না এমন কোনো তথ্যও আমরা কারও কাছ থেকে এখন পর্যন্ত পাইনি।

স্যাটেলাইটে অতি উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন গেজেট প্রতিস্থাপন করে নানাবিধ রিসার্চ বা গবেষণা করা হয় বা আরও অধিকতর গবেষণা করা যেতে পারে। স্যাটেলাইটে প্রতিস্থাপিত বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তির গেজেট খুবই ব্যয়বহুল। স্যাটেলাইটভিত্তিক গবেষণা করার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন বৈজ্ঞানিকের অভাব আমাদের যেমন রয়েছে তেমনি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ব্যয়বহুল গবেষণার বিষয় আমাদের করায়ত্ত এখনো হয়নি। অতিমাত্রায় কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ার পরেও আমাদের কৃষিকে প্রকৃতির নির্ভরতার ওপর থেকে বের করে আনতে পারিনি। এখনো আমরা অল্প সময়ে উৎপাদন সক্ষম ধানের জাত আবিষ্কার করতে পারিনি। বেশ কয়েকটি কৃষি বিদ্যালয় এবং প্রচুর পরিমাণ কৃষি বিশেষজ্ঞ ও বৈজ্ঞানিক থাকার পরেও শুধু সরকারি বাজেটে পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ না দেওয়ায় কৃষিতে ইপ্সিত অর্জন এখনো সম্ভব হয়নি। নির্দিষ্ট করে যদি শুধু কৃষি গবেষণার জন্য বছরে অতিরিক্ত অন্তত ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হতো তাহলে অতি বর্ষা, শীত, কুয়াশা বা বন্যা সহনশীল উচ্চ ফলনশীল ধান ও কৃষিজ উৎপাদন অর্জন আমাদের নতুন প্রজন্মের কৃষি বৈজ্ঞানিকরা অনেক আগেই আবিষ্কার করতে পারত, যার জন্য স্যাটেলাইটের প্রয়োজন পড়ত না। স্যাটেলাইটের খরচের ১০ ভাগের একভাগও যদি আমরা গ্রিন হাউস কৃষিতে ব্যয় করতে পারতাম তাহলে আজকে আমরা শাকসবজি উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই হতাম না, সঙ্গে সঙ্গে খুবই সীমিত মূল্যে জনগণকে সরবরাহ করা সম্ভব হতো। যদি কৃষকদের কম মূল্যে পশু ও মৎস্য খাদ্য, ওষুধ ও ভিটামিন এবং অবকাঠামো সুযোগ সরকার দিতে পারত তাহলে অত্যন্ত কম মূল্যে জনগণ তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রোটিন পেতে পারত। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে সরকার কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে সস্তায় বিভিন্ন খাদ্য উপকরণ সরবরাহ করা সম্ভব হতো।

উক্ষেপিত স্যাটেলাইটটি নাকি যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করা হবে। এ বক্তব্যটিই বলে দেয় যে অত্যন্ত অপ্রয়োজনে এ স্যাটেলাইটটি উেক্ষপণ করা হয়েছে। কারণ আমাদের যোগাযোগের জন্য স্যাটেলাইটের কোনো প্রয়োজন নেই। তাছাড়া বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের জন্য অন্তত তিনটি স্যাটেলাইটের প্রয়োজন পড়ে। কাজেই একটি স্যাটেলাইট দিয়ে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ করা কখনই সম্ভব হবে না। বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ স্থাপন করতে হলে আমাদের অন্তত আরও দুটি অন্য দেশের স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে যা ব্যয়বহুল হবে।

আবার বলা হচ্ছে, উেক্ষপিত স্যাটেলাইটটি নাকি মূলত ব্যবহার হবে আমাদের বিকাশমান ব্রডকাস্টিং শিল্পের আরও উন্নত ব্যবহার বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে। অর্থাৎ আমাদের স্যাটেলাইটটি হবে DTH অর্থাৎ সরাসরি প্রতিটি মানুষের ঘরে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান পৌঁছে যাবে। অর্থাৎ জনগণ এখন থেকে ঘরে বসে বসেই আমাদের তথা নেতাদের চেহারা মোবারক দেখতে পারবে। খুবই ভালো প্রস্তাব। কিন্তু আমাদের কয়েকটি অপ্রিয় প্রশ্ন : ঘরে বসে নিজেদের টেলিভিশনে ছবি দেখতে হলে প্রতি বাড়িতে কোনো আলাদা এন্টিনা লাগাতে হবে কিনা এবং যদি আলাদা এন্টিনা লাগাতে হয় তাহলে কোনো ফি বা লাইসেন্স ফি হবে কিনা এবং এন্টিনাটি টাকা দিয়ে কিনতে হবে কিনা।  যদি কোনো ফি দিতে হয় বা লাইসেন্স নিতে হয় তাহলে কি সরাসরি সরকারের কাছ থেকে নেবে বা দেবে নাকি টিভির যে চ্যানেল দেখা হবে সেই টিভি থেকে নেবে বা দেবে নাকি অন্য কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিতে হবে বা দিতে হবে?

বাংলাদেশে একটি প্রবাদ আছ ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’। এ প্রবাদটি দিয়ে বোঝানো হয় যে অন্যের প্রয়োজন দেখে নিজের কোনো কাজ করা ঠিক না।  তাই আমাদের বক্তব্য, স্যাটেলাইট অনেক উন্নত দেশের প্রয়োজন থাকতে পারে কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে আমাদের স্যাটেলাইটের প্রয়োজন এখনো হয়নি। এটি হয়ে গেছে আমাদের গরিবের  ঘোড়া রোগের শামিল।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য।

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন