• শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫
  • ||

ভারতের কাছে মুচলেকা ও গাজীপুর নির্বাচন

প্রকাশ:  ২৫ জুন ২০১৮, ০১:২৮
মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)
প্রিন্ট

আগামীকাল ২৬ জুন গাজীপুরবাসী দ্বিতীয়বারের মতো তাদের নগরপিতা নির্বাচিত করবেন। তারপর ৩০ জুলাই হবে সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। কিছুদিন আগে হয়ে গেল খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন, যেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। এই সময়ে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনগুলো বহু দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা জাতীয় নির্বাচনের ওপর এর প্রভাব অবশ্যই থাকবে, যেটি হতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নির্বাচনের গুরুত্ব নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। তাই খুলনার পরে মানুষের দৃষ্টি এখন গাজীপুরের ওপর। তারপর একসঙ্গে হতে যাচ্ছে আরও তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। অফিশিয়ালি ও আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনগুলো দলীয় ভিত্তিতে হচ্ছে। মেয়র পদপ্রার্থীরা নিজ নিজ দলের নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। এই নির্বাচনে স্থানীয় ইস্যু ও ফ্যাক্টর জয়-পরাজয় নির্ধারণে কাজ করলেও জাতীয় রাজনীতির ইস্যুগুলোও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তাই ভোট প্রদানের সিদ্ধান্তে রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাবলি মানুষ অবশ্যই বিচার বিশ্লেষণ করবেন। সরকারি দলের প্রার্থীর জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ দুটোই আছে।

তবে জাতীয় রাজনীতির ফ্যাক্টর এবং বিগত পাঁচ বছরে গাজীপুরে বিএনপি দলীয় মেয়র অধ্যাপক আবদুল মান্নান স্থানীয় মানুষের জন্য কী করতে পেরেছেন এবং করেছেন, এগুলো বিবেচনায় নিলে সরকারি দলের প্রার্থীর চ্যালেঞ্জের চাইতে সুযোগের পরিধি অনেক বড়। দল সরকারে থাকায় কিছুসংখ্যক মানুষের মধ্যে সহজাত কিছু কারণেই অ্যান্টি এস্টাবলিসমেন্ট একটা অনুভূতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। এটাই হবে সরকারি দলের প্রার্থী জাহাঙ্গীরের জন্য অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। তবে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে একেবারে তৃণমূলের স্তর পর্যন্ত দলের ঐক্য ধরে রাখা হবে দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ। এ পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে তাতে বোঝা যায়, খুলনার মতো গাজীপুরেও সব ভুলে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। দলীয় ঐক্য ধরে রাখতে পারলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকগণ। নৌকার প্রার্থী জাহাঙ্গীর অপেক্ষাকৃত তরুণ হওয়ায় নতুন প্রজন্ম ও নতুন ভোটারদের ভোট তিনি প্রতিপক্ষের চাইতে বেশি পাবেন।

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থীর সুযোগের চাইতে চ্যালেঞ্জের পরিধি অনেক বেশি বড়। হাসান উদ্দিন সরকার বয়োবৃদ্ধ এবং অসুস্থ। তাছাড়া হাসান উদ্দিন সরকারের এক ভাই টঙ্গীর জনপ্রিয় নেতা ও আওয়ামী লীগের অপ্রতিদ্বন্দ্বী এমপি আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সাজাপ্রাপ্ত আসামি। হাসান উদ্দিন সরকারের সুযোগের মধ্যে সবচাইতে বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে বিএনপি-জামায়াতের বড় সংখ্যক একটি রিজার্ভ ভোট রয়েছে, যে ভোটগুলো সব সময় ধানের শীষ মার্কায় পড়ে থাকে। এই রিজার্ভ ভোটের মধ্যে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্নসহ চরম ভারতবিরোধী একটা গোষ্ঠী রয়েছে। তবে এবার এই গাজীপুরের নির্বাচনে চরম ভারতবিরোধী গোষ্ঠীর ভোট বিএনপির জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সম্প্রতি বিএনপির একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধি দল তারেক রহমানের নির্দেশে ভারতে গিয়ে সেখানকার প্রভাবশালীদের কাছে যেভাবে দয়া-দাক্ষিণ্য প্রার্থনা করেছেন তাতে এতদিনের চরম ভারতবিরোধী গোষ্ঠী বিএনপির ওপর ভীষণ ক্ষেপে গেছে। এটাকে জামায়াত ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠী দেখছেন হিন্দু তোষণ হিসেবে। যেটিকে এতদিন তারা হারাম কাজ বলে আসছে। সুতরাং ওই গোষ্ঠীর ভোট এবার বিএনপির বাক্সে পড়বে না। তবে তারা নৌকায় ভোট কখনো দেবে না। নির্বাচনের দিন বাড়িতে বসে রাগে-দুঃখে কপাট বন্ধ করে কপাল চাপড়াবে। অন্যদিকে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি এবং রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয় দেওয়ার কারণে স্বাধীনচেতা নিরপেক্ষ ভোটারের বড় একটা অংশ, যারা অ্যান্টি এস্টাবলিসমেন্ট ফ্যাক্টরের কারণে নৌকা মার্কায় ভোট হয়তো দিত না, তারা এখন ঘুরে গিয়ে ধানের শীষের পরিবর্তে শেষমেশ নৌকায় ভোট দেবে।

কারণ তাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প আর নেই। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে নিজেদের দেশ ও দলের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য যে কোনো দলের প্রতিনিধি প্রতিবেশী দেশে যেতেই পারে এবং সে লক্ষ্যে সেখানে বহুমুখী কর্মসূচি ও দেখা সাক্ষাতের মধ্যে দোষের কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু ভারতসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে বিএনপির প্রতিনিধি দল সেখানকার প্রভাবশালীদের কাছে দয়া-দাক্ষিণ্য চেয়েছেন যাতে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনের সময় ভারত যেন বিএনপিকে সমর্থন দেয়। আরও খবর বেরিয়েছে, বিএনপির প্রতিনিধি দল একটা লিখিত অঙ্গীকারনামা ভারতের কাছে দাখিল করেছে এবং তাতে ওয়াদা করেছে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ভারত যা চাইবে বিএনপি সরকার সেটাই করবে। বিএনপির এহেন লজ্জাকর মুচলেকা প্রদানের কারণে বাংলাদেশের সব মানুষ তো বটেই, বিএনপির সমর্থক ও ভোটাররাও অত্যন্ত বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। সুতরাং এতে বিএনপির কোনো লাভ হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। তাতে বরং বিএনপির ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের চিত্রই ফুটে উঠেছে, ফুটে উঠেছে দেশের মানুষের প্রতি তাদের কোনো আস্থা নেই এবং মানুষের কাছ থেকে তাদের রাজনীতি আজ বিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বের বহু দেশে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে সাংগঠনিক শক্তি থাকলে, গণমানুষের সমর্থন থাকলে, রাষ্ট্রের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করলে সেই রাজনৈতিক দলকে বিদেশে ধরনা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত অধ্যায়ের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে জন্ম নেওয়া বিএনপির রাজনীতির একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে ভারত বিরোধিতা। সামরিক শাসকের গর্ভে জন্ম নেওয়া দল হিসেবে না আছে রাজনৈতিক ঐতিহ্য, না আছে জাতীয় ক্ষেত্রে উদাহরণ দেওয়ার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান ও অর্জন, যেটি রয়েছে তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের। ভারত বিরোধিতার কারণেই বাংলাদেশের মানুষের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ, যারা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ছয় দফার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, এখনো মনে-প্রাণে বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি তারাই বিএনপির স্থায়ী সমর্থক ও ভোটব্যাংক।

সুতরাং সম্প্রতি ভারতে গিয়ে বিএনপির প্রতিনিধি দল যা করেছে তাতে শ্যাম রাখি না কুল রাখি করতে গিয়ে বিএনপি আম-ছালা দুটোই হারিয়েছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। একদিকে দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে স্বাধীনচেতা তরুণ সমাজের আস্থা হারিয়েছে, দ্বিতীয়ত তাদের এতদিনের ভোটব্যাংক গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হয়েছে এবং সর্বোপরি যে উদ্দেশে নতজানু হয়ে ভারত তোষণ করেছে সেটিও কখনো অর্জিত হবে বলে মনে হয় না। কারণ, ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির কর্ণধার তারেক রহমান ভারতে গিয়ে অঙ্গীকার করে এসেছিলেন তারা ক্ষমতায় গেলে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে আগের মতো বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুযোগ দেবে না। কিন্তু ২০০১-২০০৬ মেয়াদে জামায়াতকে নিয়ে ক্ষমতায় এসে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে কীভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছিল তা এখন ভারতসহ সবাই জানে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও এমপিরা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যারা সশস্ত্র যুদ্ধ করছে তারা স্বাধীনতাকামী, তাদের আমাদের সমর্থন দেওয়া উচিত। বিচ্ছিন্নতাবাদী ও স্বাধীনতাকামী, এ দুইয়ের পার্থক্য জেনেও ওইরকম বক্তব্য তারা প্রকাশ্যে দিয়েছেন। তাই ঢাকা সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বেগম খালেদা জিয়ার কাছে তিনটি বিষয় জানতে চেয়েছিলেন।

এক. ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে সংঘটিত ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলায় অধিকতর তদন্তের ব্যবস্থা হলে তাতে তিনি এবং বিএনপি সহায়তা করবেন কিনা। দুই. জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন পর্যায়ে থাকবে এবং তারা কি জামায়াত ত্যাগ করতে পারবে কিনা। তিন. ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সফরের সময় পূর্ব নির্ধারিত সাক্ষাৎ কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও একতরফাভাবে সেটি বাতিল করলেন কেন। ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত। আর সেটি হলো, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে আগামী দিনে বিএনপির সম্পর্ক কোথায় এবং কেমন হবে। কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে বিএনপি যে রাজনীতি করছে এবং গুলশানে পাকিস্তান দূতাবাসের দরজার অপরদিকে অবস্থিত ইউনাইটেড হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, এমন অবস্থান নিয়েও বাজারে নানারকম গুজব ছড়িয়ে পড়েছে।

তাতে অনেকেই ধারণা করছেন, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিএনপির পক্ষে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক সংযোগ রেখে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন বিএনপির জন্য অলীক স্বপ্ন হয়েই থাকবে। সবাই জানেন, ভারতসহ সব রাষ্ট্রেরই একটা স্থায়ী পররাষ্ট্র নীতি থাকে এবং তার লক্ষ্য থাকে নিজ দেশের জাতীয় নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক স্বার্থ। কোনো দেশই অন্য আরেকটি দেশের কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনতে সরাসরি কাজ করতে পারে না। পাকিস্তানের প্রতিভূ হয়ে যারা বাংলাদেশে রাজনীতি করবে তারা ভারত তো বটেই, বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন পাবে না।

সেই দিন শেষ হয়ে গেছে। পাকিস্তান এখন একটি সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও ব্যর্থ রাষ্ট্র। তারা একাত্তরের অপরাধের জন্য ক্ষমা চায়নি, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেয়নি। বরং উল্টো ঔদ্ধত্য সুরে একাত্তরের প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলছে। তাই বলা যায়, বিদেশ নির্ভর, পাকিস্তান প্রীতি এবং ভুলেভরা কৌশলের রাজনীতিকে মাথায় নিয়ে বিএনপি গাজীপুরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ফলাফল কী হবে তা দেখার জন্য আগামীকাল রাত পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন /পি আর