• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

যে আন্দোলন এখন প্রাসঙ্গিক

প্রকাশ:  ১২ জুলাই ২০১৮, ০৩:৫৯ | আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৮, ২০:২৮
রোকেয়া প্রাচী
প্রিন্ট

সরকারি চাকরির প্রতি কেন লাখ লাখ তরুণের এত আগ্রহ, তা আমার ঠিক বোধগম্য নয়। পরিসংখ্যান ঘাঁটলেই দেখা যাবে, প্রতি বছর খুব সামান্য সংখ্যক (কয়েক হাজার) পদে নিয়োগের জন্য লাখ লাখ তরুণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বিসিএস গাইড মুখস্থ করছেন, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন।

বিবিসির একটি প্রতিবেদন চোখে পড়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে ঢোকার জন্য প্রতিদিন ভোর থেকে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকেন শিক্ষার্থীরা। এ দাঁড়িয়ে থাকা একাডেমিক পড়াশোনার জন্য নয়; বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরির নিরাপত্তা, বেতন কাঠামো আর পারিবারিক চাপের কারণেই বিসিএসমুখী হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মেধাবী। কিন্তু সরকারি চাকরিতে এত কর্মসংস্থানের বাস্তবতা কি আমাদের দেশে আছে?

কেন এত লোভনীয় সরকারি চাকরি- এ প্রশ্ন যেমন আছে; গুঞ্জন কিংবা উদাহরণও আছে সরকারি চাকরিজীবী আমলাদের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার। তাদের নিয়ে নেতিবাচক কথারও শেষ নেই। আসলে কি সবাই ঘুষ খান? অনৈতিকতার আশ্রয় নেন? সবাই কি অর্থলোলুপ? অলস চেয়ারে বসে দিন কাটান? তা নয়। সীমিত আয় ও জীবনযাপন মেনে নিয়ে শ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তারা- এমন উদাহরণও অসংখ্য। অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সৎ, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক সরকারি চাকরিজীবীরাই।

ভবিষ্যতে যারা যুক্ত হবেন এ তালিকায়, তারাও যেন তেমনটাই হন, সেদিকে কি আমরা যথাযথ নজর রাখতে পেরেছি?

দেশের সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের পর তাদের প্রতি সম্মানপূর্বক তারা ও তাদের সন্তানরা যেন সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার পান, সে বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে এ কোটা প্রবর্তন করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে সপরিবারে তাকে হত্যার পর থেকে টানা ২৪ বছর এ কোটা থেকে বঞ্চিত করা হয় মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের। যদি এ দুই যুগ ধরে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের মেধাবীদের সন্তানরা আমাদের সরকারি আমলা হিসেবে নিয়োগ পেতেন, তাহলে কি আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের একটি বিশাল অংশের জনবল পেতাম না?

তার বদলে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্বভার নেওয়ার পর পুনরায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা চালু করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে বঙ্গবন্ধুকন্যা ছাড়া আর কে দাঁড়াবেন? নিঃসন্দেহে এই কোটা প্রথার বিরুদ্ধে যারা, তাদের সন্দেহের চোখে দেখা আমাদের অবশ্যকর্তব্য।

এ দেশকে নিয়ে নানাভাবে ষড়যন্ত্র হয়েছে, হচ্ছে। দেশকে পঙ্গু করে দিতে পাকিস্তানি বাহিনী যেমন বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে শেষ ছোবল বসিয়েছিল, সেই ষড়যন্ত্রকারীরাই কৌশলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের গভীরে প্রবেশের নানা আয়োজন সম্পন্ন করে রেখেছে। সুযোগ পেলেই তারা ছোবল মারবে- এটি নিশ্চিত ধরে নিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন শেখ হাসিনা ও তার প্রতিটি সৈনিক।

সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা ৩০, জেলা ১০, নারী ১০ এবং উপজাতি কোটা ৫ শতাংশ। মোট ৫৫ শতাংশ কোটা পদ্ধতির আওতায় নিয়োগের বিষয়টি সময়োপযোগী করে সংস্কারের দাবিটি যৌক্তিক। বিশেষ করে জেলা কোটার বিষয়টি এই সময়ে এসে অপ্রাসঙ্গিক তো বটেই। যখন কোটা প্রণয়ন করা হয় তখন ১৯টি জেলা ছিল। সেই সময়ে কোটা বিন্যাস করা সম্ভব ছিল। এখন ৬৪ জেলায় কোটা বিন্যাস করা অবাস্তব। এ ছাড়া অধিকাংশ সময়ই নির্দিষ্ট কোটা পূরণের মতো চাকরিপ্রার্থীও পাওয়া যায় না। ফলে শিক্ষার্থীরা দাবি করতেই পারেন এটি সংস্কারের। কিন্তু এটি কি এমন কোনো ইস্যু যাতে দিন-রাত রাস্তায় পড়ে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে? ভাংচুর-সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হবে?

প্রতিটি যৌক্তিক দাবি ও আন্দোলনে তরুণদের পাশে ছিলেন শেখ হাসিনা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে তরুণদের আন্দোলনই বিচার প্রক্রিয়াকে বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি ও বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সহযোগিতা করেছে। কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতেও তরুণরা রাজপথে নেমেছে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীর মতো বাম ছাত্র সংগঠন কিংবা ছাত্রলীগ কর্মীরাও দাবিটিকে যৌক্তিক মনে করে স্লোগানে তাল মিলিয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের নামে যখন ভিসির বাড়িতে হামলা চলছে, বিদেশ থেকে তারেক রহমান প্রতিনিয়ত ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছেন, তখন কারও বুঝতে বাকি থাকে না, তরুণদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে কারা ফের দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে।

ভিসির বাড়িতে হামলা, এদিকে রাজপথে নেমে এসেছে ছাত্রীরাও। কোন অঘটন না ঘটে যায়- এমন দুর্ভাবনায় সারারাত ঘুমোতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের সেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, মমত্বের সঙ্গে কী অবলীলায় তরুণদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের ঘরে ফিরিয়েছেন, পড়ার টেবিলে পাঠিয়েছেন। বলেছেন- কোটা প্রথাই বাতিল করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা, নারী, উপজাতি কিংবা প্রতিবন্ধীদের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে ভাবনায় রেখে কোটা প্রথা বাতিল করে নতুন কী পদ্ধতি তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে কেবিনেট সেক্রেটারিকে অনুসন্ধান করতে বলেও দিয়েছেন তিনি। নিশ্চয় এটি খুব সহজেই করে ফেলার মতো ব্যাপার নয়। সংসদে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ বক্তৃতায় দেশের তথা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় একজন নেতা যখন একটি প্রতিশ্রুতি দেন, তখন আন্দোলনকারীদের কি কিছুটা সহনশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিত নয়? সে মন হয়তো আমাদের ছাত্রছাত্রীদের আছে। কিন্তু দূরদর্শিতায় মেধাবীরা কি কোথাও হেরে যাচ্ছেন?

২০০৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু করেছিল স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির। যে ছাত্রশিবির টুপি-দাড়ি ফেলে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশলে বিভিন্ন সেক্টরে ঢুকে পড়ছে, সে খবর নিশ্চয় কারও অজানা নয়।

স্বয়ং ছাত্রলীগের ভেতরেই যখন শিবির ঢুকে পড়ছে গোপনে, তখন কী করে নিশ্চিত হই সাধারণ ছাত্রসমাজের এ আন্দোলনের ভেতরেও তারা ঢুকে পড়েনি? জামায়াত-বিএনপির পরোক্ষ উস্কানিতে হয়তো ছাত্ররা ভুল পদক্ষেপ নিতে পারেন। কিন্তু এখন যে ভুল করার সময় নয়; শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন রাজনৈতিক সচেতন সমাজ গড়ার সময়। নইলে আবার যদি দেশ স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের হাতে পড়ে, দেশের কী অবস্থা হবে তা কি একবার পেছন ফিরে দেখলেই বুঝতে পারবেন না আমাদের মেধাবী সন্তানরা?

মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা বাতিল করেও কি মেধাবীদের আন্দোলন খুব বেশি জনসমর্থন আদায় করতে পারবে? বরং মেধা ও যোগ্যতা বিবেচনাতেই শুধু নয়; দেশকে নিরাপদ রাখতে জামায়াত-শিবির, যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তি ও তাদের দলের সন্তানদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া বন্ধের দাবিতে আন্দোলনই আজকের পরিপ্রেক্ষিতে বেশি যৌক্তিক।

দেশ রক্ষায় জামায়াত-শিবির ও স্বাধীনতাবিরোধী যারা সরকারি চাকরিতে বহাল থেকে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত করছে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও সরকারবিরোধী নানা চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার আন্দোলনই আজ অধিকতর প্রাসঙ্গিক।(সূত্র:সমকাল)

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী, অভিনেত্রী ও রাজনীতিক।

apps