• রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫
  • ||

আনোয়ার হোসেন-ডলি আনোয়ার দম্পতির অপ্রদর্শিত কাহিনীচিত্র

আলোকচিত্র বিষয়ে হারানো কবিতার পুনরুদ্ধার

প্রকাশ:  ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০১:০৮ | আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০১:১৫
সালেম সুলেরী
প্রিন্ট

খ্যাতিমান আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেন প্রয়াত হলেন। পুরোন ঢাকায় জন্মেছিলেন ১৯৪৮-এর ৬ অক্টোবর। দেহাবসান মধ্য-ঢাকায় ২০১৮-এর পয়লা ডিসেম্বর। বাংলাদেশের বিজয় মাসের সূচনা দিবসে। কীর্তিমান মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮২ থেকে। অভিনেত্রী-স্ত্রী ডলি আনোয়ারের মাধ্যমে। ডলি আপার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বিপ্লব দাশের মাধ্যমে। বিপ্লব’দা ছিলেন ১৬ আনা আড্ডাবাজ, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক।

‘সাতদিন’ নামে তখন একটি নতুন সাপ্তাহিক বেরিয়েছিলো। আমিও ঢাকায় তখন ছাত্রত্বের পালকযুক্ত নতুন অতিথি। খন্ডকালীন কাজ দিতে অফিসে নিয়েছিলেন বিপ্লব দাশ। তিনি নির্বাহী সম্পাদক, মুখোমুখি করলেন সম্পাদকের। ভীষণ প্রীত হলাম এমন জগদ্বিখ্যাত নারী-সম্পাদক পেয়ে। ম্যাক্সি পরে সম্পাদকের আসন মাতিয়ে রেখেছেন। চিত্রনায়িকা হিসেবে তিনি তখন সুবিখ্যাত। সূর্যদীঘল বাড়ী’র জয়গুণ-খ্যাত মুখ্য অভিনেত্রী। ড. নীলিমা ইব্রাহিম-কন্যা ডলি আনোয়ার। প্রবাদপ্রতিম চিত্র-পরিচালক আলমগীর কবির-এর শ্যালিকা।

প্রথম আলাপেই ধ্যান-জ্ঞান কেড়ে নিলেন ডলি আপা। ধূমপানে ওনার-আমার ব্র্যান্ড একই। রুচিস্নিগ্ধ ‘বেনসন এন্ড হেজেস’। প্যাকেট থেকে শলাকা বের করে এগিয়ে দিলেন। পরে আবার পুরো এক প্যাকেট, সঙ্গে পুরি-চা। চলচ্চিত্রের একটি বাণিজ্যিক বিষয়ে লিখতে বললেন। ‘পতিতাদের নিয়ে চিত্রপরিচালকদের পতিতাবৃত্তি’। এরপর সম্পাদক ম্যাডাম ডাকলেন সাতদিন-এর আলোকচিত্র সম্পাদককে। আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন সেই খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের। তিনিই আলোকচিত্রে বিশ্বসম্মানে ভূষিত আনোয়ার হোসেন।

সূর্যদীঘল বাড়ী, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, দহন-এর চিত্রগ্রাহক। ডলি আপা একাধিক ছবির নায়িকা ছিলেন। বয়েসে আনোয়ার ভাই ওনার তিন মাসের ছোট। কিন্তু ক্যামেরার লেন্স থেকে ডলি ইব্রাহিমকে হৃদয়-ফ্রেমে বন্দি করেন। ফলে ১৯৭৯ সালে শুভ পরিণয়। প্রায় ১৩ বছর দীর্ঘায়িত হয়েছিলো সেই দাম্পত্য। ১৯৯০ সালে ডলি আপা বেছে নেন তৃতীয় সংসার। বিজ্ঞাপন নির্মাতা আনিস চৌধুরীর ঘরণী হন। তবে যাপিত জীবনে আর প্রশান্তি পাচ্ছিলেন না। অবশেষে আত্মহননের মর্মস্পর্শী ইতিহাস। ১৯৯১-এর ৩ জুলাই, বিষপানে জীবনের বিদায়ঘন্টা। অন্যদিকে জীবন-নায়িকা হারানো আনোয়ার ভাই! বিষন্নবদনে ফ্রান্সে বেছে নিলেন প্রবাস জীবন। ১৯৯৩ থেকে ২০০৮, টানা ২৫ বছর। ১৯৯৬-এ গ্রহণ করেন ফরাসী স্ত্রী, মরিয়ম ফরাসী। প্রবাসে প্রাপ্ত দু’সন্তানকেই বাংলা নামে ডাকেন। আকাশ আনোয়ার, মেঘদূত আনোয়ার। বিদেশে থাকলেও প্রতিবছর বাংলাদেশ ছুঁয়ে যেতেন। আমি অবশ্য অ্যামেরিকা থেকে আর সান্নিধ্য-স্পর্শ পাইনি।

ডলি আপা, আনোয়ার ভাই-এর দাম্পত্যকালে নিকটজন ছিলাম। ঢাকার ঝিগাতলার ভাড়া-বাসায় অনেক গিয়েছি। কোন আনুষ্ঠানিক বা বিত্তবানসুলভ আসবাবপত্র ছিলো না। মাটিতে বা মেঝের ফরাশেই বসা-খাওয়া-থাকা। থাল-বাসন-কাপ-পিরিচ-গ্লাস, সব মাটির। যেন সূর্যদীঘল বাড়ী’র জয়গুণে'র প্রলেতারিয়েত সংসার। একটি গরিবীপ্রধান ছবি তাদের জীবনচর্চা পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। নির্মাতা মশিউদ্দিন শাকের আর শেখ নিয়ামত আলীকে ধন্যবাদ। আরেকজন ‘বিজনেস পার্টনার’ ছিলেন ঐ দম্পতির। টিভি-নাটক নির্মাতা, অভিনেতা সদরুল পাশা। আমারও বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিলেন পাশা ভাই। সেই ‘আনোয়ার-ডলি-পাশা’ মিলিয়ে বিজ্ঞাপনী ব্যবসায় নামেন। সেই ত্রিচক্র মিলে সংস্থার নাম দেন তিন বর্ণে। ‘ক্যাম্পেন’- প্রচারণার সঙ্গে বেশ যায়, এমনই নামটি। একদিন ঘরোয়া আড্ডায় জানতে চেয়েছি- নামকরণের পটভূমি কি? আমার সঙ্গে ছিলো প্রয়াত বন্ধু গৌতম সাহা। আর সামনে সেই তিন তারকা-কুশীলব। হাসছিলো আর লুকানোর চেষ্টা করছিলো পটভূমিটি। কিন্তু ডলি আপা তুলনামূলকভাবে উদার এবং স্পষ্টবক্তা। বললেন, শ্যাম্পেন ঢালতে ঢালতে নামটি এসেছিলো। নাম-শেয়ার ঠিক করতেই বসেছিলো গলাভেজা আসর। আনোয়ারই প্রথম কবি হয়ে উঠেছিলো সেই আসরে। শ্যাম্পেন-এর পেগ হাতে নিয়ে বলেছিলো- ক্যাম্পেন। আমাদের নতুন বাণিজ্যযাত্রার নাম হোক : ক্যাম্পেন।

সেই দাম্পত্য নিয়ে এতো গল্প, এক বইয়ে কুলোবে না। আমি বিস্তারিত লিখবার উদ্যোগ নিয়েছি। তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত সুস্থ চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের বিকাশ। তাদের প্রচেষ্টা, আকাঙ্খা, প্রাচীর ও প্রণোদনাসমূহ। দ্বিতীয় বিষয়টি বিশেষ স্পর্শকাতর। অনেকের ধারণা, আনোয়ার ভাই ডিভোর্স দিয়ে অপরাধ করেছিলেন। ওনার কারণেই ডলি আপা আত্মহননের পথ বেছে নেন। কিন্তু প্রকৃত কারণটির সঙ্গে অন্য অনেককিছু জড়িত। তৃতীয় বিষয়টি আলোকচিত্র শিল্পের বিকাশ বিষয়ক। তিনটি অধ্যায় নিয়েই আমার প্রামাণ্য পর্যালোচনা রয়েছে। লিখছি গণমাধ্যমে, বই হয়েও বেরুবে আশাকরি। আপাতত ‘আলোকচিত্র’ শিরোনামে একটি কবিতা। এটি প্রথম রচিত হয় সেই আশির দশকেই। আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের সান্নিধ্য ছিলো কবিতাটি নির্মাণের অনুপ্রেরণা।

আলোকচিত্র

সালেম সুলেরী

সময়ের কাঁটা হাঁটা দিয়ে চলে আগামীর প্রতি দ্রুত।

স্মৃতি ইতিহাস পঠনের চেয়ে দু’চোখে যা দেখা ছবি-

অনেক জেনেছি, পৃথিবী-যাপিত সুনিপুণ সংসার,

আলোকচিত্র সবটুকু তার সত্যের দাবি রাখে।

মানসিক খিদা মেটাতে মানুষ যার কাছে নতজানু

সেইতো রিপু’র রূপালি পর্দা, প্রমোদ-প্রয়াসী ভাষা,

সংবাদময় জীবন যাপনে, ভূমিপরিমাপে আর

সব মানুষের না-মেলা আদল, পৃথক প্রতিচ্ছবি।

নিসর্গ-রূপ বড়ো অপরূপ! খোলা মাঠ থেকে তুলে

ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে তাবৎ অহরহ উপভোগ।

দিব্যসত্য হঠাৎ যখন মিথ্যে আঁধারে ঢাকা

প্রামাণ্য এক ভাষ্য-ভিডিও ধরে রাখে বাস্তব।

দূরগামী কোনো ঘুড়ি হয়ে কারো কৈশোর দূরে যায়

সশস্ত্রকাল নিয়তি বাড়ায় স্বজন হারানো স্মৃতি ;

প্রিয়মুখ যদি স্মৃৃতি-দরোজায় কড়া নাড়ে কোনোদিন

দূরাকাঙ্খার আলোকচিত্র সেই মুখ মেলে দেয়।

আমি থাকবো না, তুমি থাকবে কি? থাকবে আগামীকাল।

নিপুণ ক্যামেরা, শতভাগ লোকে ধারণ-ক্ষমতা খোঁজে,

মাটি ও মানুষ যন্ত্রযজ্ঞে ক্রমাগত পরাজিত,

পৃথিবী জানে না কতোটা ভাঙছে নিজ ছবি, হিমালয়!

এই যে হিসেব কে যে ধরে রাখে, হৃদয়ে ট্রেনের গতি

সবাই ছুটছি হাঁপিয়ে উঠছি কাঁপিয়ে তুলছি দেহ।

চিকিৎসকের জন্যে অধীর আগ্রহে বসে থাকা,

ক্ষত ও ক্ষতির হিসেব মেলাবে এক্সরে-যতোন যতো।

মুদিত দুঃখ, উদিত হাসির নিজস্বী ছবিদিন,

রঙিন হয়েছে সাদাকালো থেকে আলোজ্বলা রবিদিন।

ঋণ কোটি কোটি ছবি-কারিগরে, আলোকচিত্রী যারা-

ছবির আয়ুতে বেঁচে থাক কৃতী, স্মৃতিফ্রেমে আত্মারা...

//মাত্রাবৃত্ত

[email protected]

apps

সর্বাধিক পঠিত