• শনিবার, ২৬ মে ২০১৮, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

এমপিওভুক্তির বন্ধ দুয়ার খুলছে

প্রকাশ:  ০৩ জানুয়ারি ২০১৮, ২০:৩৩
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট
সরকার আরো কিছু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাত বছর সাত মাস পর অবশেষে খুলতে যাচ্ছে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির বন্ধ দুয়ার। মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে দেখা করে নতুন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির জন্য অর্থ বরাদ্দ চান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। দুই মন্ত্রীর আলোচনা শেষে এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। 

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে নিজ মন্ত্রণালয়ে ফিরেই শিক্ষামন্ত্রী নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সঠিক ব্যয় নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) নির্দেশ দেন। মঙ্গলবার বিকেলেই মাউশি সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়ে তা পাঠিয়েছে। এ নিয়ে বিচার-বিশ্নেষণ করে আজ বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব দিতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। 

মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার তথা এমপিও প্রক্রিয়াটি হচ্ছে বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বেতনের একটি অংশ সরকার থেকে দেওয়া। এ জন্য প্রথমে যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয় ও শর্ত পূরণের ভিত্তিতে সেই প্রতিষ্ঠানের যোগ্য শিক্ষকরা তালিকাভুক্ত হন। সাত বছর তালিকা করা বন্ধ রাখায় অনেক শিক্ষক বঞ্চিত ও অর্থকষ্টে জীবন যাপন করছেন। এ সময়কালে অনেক প্রতিষ্ঠানের স্তরের উন্নতি তথা নিম্ন-মাধ্যমিকের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের পরে স্নাতক চালু হলেও উচ্চতর অংশের শিক্ষকদের এমপিও হয়নি। এমপিওভুক্তির দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষক এখন সপ্তাহকাল রাজধানীতে অবস্থান ধর্মঘট ও গত রোববার থেকে আমরণ অনশনে আছেন। 

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপিওভুক্তির অর্থ যেন অপচয় না হয় সে জন্য সঠিক একটি নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেন। শিক্ষামন্ত্রী একটি প্রস্তাবিত নীতিমালা তৈরি করেই নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তা অর্থমন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে বলেন, আপনারা এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখুন। প্রয়োজনে সংযোজন-বিয়োজনও করতে পারেন। চূড়ান্ত করা নীতিমালা অনুসারেই এমপিওভুক্ত করা হবে। 

আবুল মাল আবদুল মুহিত মঙ্গলবারই দেশের বাইরে গেছেন। তিনি ফিরলে এ বিষয়ে অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যৌথ সভা হতে পারে। 

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, মঙ্গলবার দুই মন্ত্রীর আলোচনায় তারা একমত হন- কয়েক বছর এমপিওভুক্তি না করায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এ থেকে উত্তরণ প্রয়োজন। নির্বাচনের বছর বলে সংসদ সদস্যরাও শিক্ষকদের পক্ষে দাবি তুলেছেন। দুই মন্ত্রী একমত হন- এই মুহূর্তে এমপিওভুক্তির জন্য যে পরিমাণ অর্থ দরকার, তা শুধু প্রধানমন্ত্রীর থোক বরাদ্দের মাধ্যমেই পূরণ হতে পারে। এমপিওভুক্তি নীতিমালা চূড়ান্ত করার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে থোক বরাদ্দ চাওয়া হবে।

জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। তার আশ্বাসের ওপর ভর করে আমরা প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে রাখছি।

শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য, ‘আমি এই পরিবারের একজন কর্মী। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। আশা করি, আপনারা বিষয়টা বুঝবেন। আপনাদের এমপিওভুক্ত করা হবে।’

এসব প্রক্রিয়া শেষ করার পর মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় প্রেস ক্লাবে গিয়ে আমরণ অনশনরত শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিয়ে তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের জানালেও শিক্ষকরা এমপিওভুক্তির সুনির্দিষ্ট তারিখ দাবি আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। 

২০০৯ সালের ১৬ জুন সর্বশেষ নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির পর আর কোনো উদ্যোগ ছিল না। বর্তমানে সারাদেশের প্রায় সাড়ে সাত হাজার নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত : মাউশির নতুন করা প্রস্তাবে সারাদেশের এমপিওবিহীন ৭ হাজার ১৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করতে বার্ষিক ২ হাজার ১৮৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ২৫০ টাকা লাগবে বলে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ১২২৭টি নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ২১৯ কোটি ৭১ হাজার ৩০০ টাকা; ১ হাজার ৮৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৩৬৮ কোটি ১৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৫০ টাকা; এমপিওভুক্ত ৩ হাজার ২৭৫টি নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে মাধ্যমিকে উন্নীত করে এমপিওভুক্ত করতে ৫২২ কোটি ৬০ লাখ ৮১ হাজার ২৫০ টাকা; ৫১৮টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের জন্য ৩৫৭ কোটি ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৪০০ টাকা এবং এমপিওভুক্ত ১ হাজার ৩৩টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজকে ডিগ্রি স্তরে উন্নীত করে এমপিওভুক্ত করতে ৭১৭ কোটি ৩৮ লাখ ২৩ হাজার ৪৫০ টাকা লাগবে। 

এ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রতিটি ডিগ্রি কলেজ এমপিওভুক্ত করতে বছরে লাগে ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫০ টাকা; উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের লাগে ৬৮ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা, আর নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লাগে ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ৭৫০ টাকা।

পর্যায়ক্রমে হবে : মাউশির বাজেট শাখা থেকে জানা গেছে, এই মুহূর্তে সারাদেশে এমপিওভুক্তির সব শর্ত পূরণ করে অপেক্ষমাণ ৫ হাজার ২৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এগুলোতে কর্মরত এমপিওভুক্তির যোগ্য শিক্ষক-কর্মচারী আছেন প্রায় ৭৫ হাজার। তাদের সবাইকে এক অর্থবছরের বাজেটে এমপিওভুক্ত করা কঠিন। এ জন্য পর্যায়ক্রমে যোগ্য সবাইকে এমপিওভুক্ত করা হবে। এই মুহূর্তে থোক বরাদ্দ পেলে দুই থেকে আড়াই হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে পারে। ছয় মাস পর ২০১৮-২০১৯ সালের বাজেটে আরও আড়াই হাজার নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। 

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া প্রস্তাবিত নীতিমালায় জনসংখ্যা অনুপাতে সংশ্নিষ্ট এলাকায় এমপিওর প্রাপ্যতা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে প্রতিষ্ঠানের ভালো ফল, প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ আরও কিছু শর্ত। এমপিওভুক্ত হতে চাইলে সংশ্নিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জমি থাকতে হবে। ভাড়া ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো প্রতিষ্ঠান যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। জানা গেছে, 'নীতিমালা অনুসারে প্রাপ্য না হলেও দেশের পিছিয়ে পড়া এলাকা, চা-বাগান, হাওর, পার্বত্য এলাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। প্রত্যেক উপজেলায় কমপক্ষে একটি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত রাখার আশা আছে। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সর্বশেষ এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৬ হাজার ১৮০টি। এর মধ্যে স্কুল ১৬ হাজার ১৯৭টি, কলেজ দুই হাজার ৩৬৫টি, মাদ্রাসা সাত হাজার ৬১৮টি। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ সরকার প্রতি মাসে ৯৪১ কোটি ৫০ লাখ ২৪ হাজার ৭১১ টাকা ব্যয় করছে।

সূত্র: ইত্তেফাক