Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • শনিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, ৬ মাঘ ১৪২৫
  • ||

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত, পাকিস্তান ও চীন

প্রকাশ:  ১০ মার্চ ২০১৮, ১৮:৪৩ | আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৮, ১৯:০৪
পুর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট icon

আপনার পছন্দ হোক বা না হোক, ভালো লাগুক বা না লাগুক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত-পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। দেশে ও দেশের বাইরের আলোচনায় আছে, পাকিস্তানপন্থী বিএনপি ও ভারতপন্থী আওয়ামী লীগ। অবশ্য নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার মুহূর্তে বিএনপি ও তার সহযোগীদের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গিয়েছিল; এবার বুঝি বিজেপি-বিএনপির রাখিবন্ধনে আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক বাংলাদেশ-ভারতের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ পাল্টে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিসাব উল্টায়নি। বরং বিজেপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে দুই দশকেরও অধিককালের পুরনো ‘লুক ইস্ট পলিসি’-তে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট পলিসি’ এক নতুন মাত্রা যুক্ত করে, যার ফলে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ঝুলে থাকা বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তি কার্যকর হয়। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি আশা-নিরাশার মধ্যে দোল খেতে থাকে। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীমতী সুষমা স্বরাজের ‘নেইবারস ফার্স্ট, বাংলাদেশ ফোরমোস্ট’নীতি আওয়ামী লীগ মোদি সরকারের রসায়নে নতুন মাত্রারই ইঙ্গিত দেয়। কেন গণেশ উল্টায়নি, এর অন্যতম কারণ বিজেপি ও বিএনপির মধ্যে আস্থার সংকট। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর মদদে ২০০১ সালে ক্ষমতায় থাকা জামায়াত-বিএনপি জোট সরকার কর্তৃক ভারতের আসামের স্বাধীনতাকামী সংগঠন দাবিদার ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম ‘উলফা’-র সদস্যদের বাংলাদেশের মাটিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া ও বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড ব্যবহার করে ‘উলফা’র জন্য আসামে অস্ত্রপাচারে খোদ সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব জড়িত থাকার বিষয়ে ভারতের বিশ্বাস বিজিপি-বিএনপি রাজনৈতিক মৈত্রীতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জন্ম নেয় আস্থাহীনতা। সেই থেকে বিজেপির আস্থা ফেরাতে দেশে ও দেশের বাইরে নানা দেন-দরবার করছে বিএনপি। বিজেপির নানা পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বিশেষ সখ্য গড়ে তুলতে বিএনপি তৎপর রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত বছরের অক্টোবরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীমতী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের সময় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে আকস্মিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন এবং সুষমা স্বরাজকে নিজ বাসভবনে দাওয়াত দিয়ে হাজির করানোর কূটনৈতিক তত্পরতা চালান। শ্রীমতী সুষমা তার সময়ের সুষম বণ্টন করে দাওয়াতে হাজির হতে না পারায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি নেতারা হোটেলে গিয়ে সুষমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ ঘটনায় বোঝা যায় অনাস্থার বরফ এখনও গলেনি। এর কারণ হিসাবে অনেকেই লন্ডনে খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার সঙ্গে আইএসআই-এর বৈঠককে দায়ী করছেন। এছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বের (সেভেন সিস্টারস) রাজ্যগুলোয় সহিংস বিচ্ছিন্নতাবাদী অপ-তত্পরতা রুখতে হলে সহায়ক প্রতিবেশী হিসেবে বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগই বেশি নির্ভরশীল হবে—সে বিবেচনাও প্রবল বলে রাজনীতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

একদিকে বিএনপির সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়নি, অন্যদিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ও মোদি সরকারের সম্পর্কের রসায়নে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। এর স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ হয়েছে–এক. রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে ভারতের না থাকা, বরং কিছু ক্ষেত্রে সু চি’কে ভারতের সমর্থন। আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রস্তাবের পক্ষে তো নয়ই বরং কখনও ভোটদানে বিরত থাকা কিংবা কার্যত প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া। ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে পুশ ব্যাক প্রচেষ্টা মোটেও বন্ধুসুলভ আচরণ নয়।

দুই. ভারত, বাংলদেশ বাণিজ্য শুল্ক ও অশুল্ক বাধার বেড়াজালে দীর্ঘসূত্রিতায় আটকা পড়েছে। ফলে একশ্রেণির ব্যবসায়ী অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এ অবৈধ বাণিজ্যের অঙ্ক ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

তিন. প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী সামলাতে বাংলাদেশ সরকার যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন আসামে বসবাসকারী অবৈধ বাংলাদেশিদের খুঁজে বের করার নামে আসামে যে জাতীয় নাগরিক তালিকা বা National Register of Citizenship (NRC) নবায়ন করা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাথায় ইচ্ছাকৃতভাবে একটা আতঙ্ক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বাঙালিদের না তাড়ালে নিজভূমে সংখ্যালঘু হয়ে পড়বেন আসামের মানুষ। শুধু বাংলাভাষী মুসলমান নয়, বাংলাভাষী হিন্দুরাও একই রকমভাবে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন আসামে। এটি কোনোভাবেই সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয় না। ভারতের সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত সম্প্রতি আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার মতো এক মন্তব্যে বলেছেন, চীনের মদদে পাকিস্তানের নতুন ছায়াযুদ্ধ চলছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। বাংলাদেশের মুসলমানদের তারা আসামে পাঠিয়ে ওই রাজ্যের জনবিন্যাসে পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। যেখানে রাজ্যের চার-পাঁচটি জেলা ছিল মুসলিমপ্রধান, এখন সেখানে আট-নয়টি জেলায় মুসলমানদের আধিক্য। জেনারেল রাওয়াত পাকিস্তান ও চীনের নাম উচ্চারণ করেননি। এই দুই দেশকে তিনি ‘পশ্চিম ও উত্তরের প্রতিবেশী’ বলে বর্ণনা করেছেন। ছায়াযুদ্ধের চরিত্র কেমন তা বোঝাতে গিয়ে রাওয়াত আসামের রাজনৈতিক দল বদরুদ্দিন আজমলের অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা এআইইউডিএফের উদাহরণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, রাজ্যে এই দলটির বাড়বাড়ন্ত বিজেপির চেয়ে অনেক বেশি। এর কারণ হিসেবে তিনি মুসলমান জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। এই যে বেড়ে যাওয়া, তার একটা বড় কারণ বন্যা, ফলে নিম্ন প্রবাহিকার দেশ বাংলাদেশে বাসস্থানের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। তার ব্যাখ্যায়, চীনের সাহায্যে পাকিস্তান ওই মানুষজনকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাঠিয়ে জনবিন্যাস বদলে দিচ্ছে। এটা ওদের একধরনের ছায়াযুদ্ধ। ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের পাশে দাঁড়িয়েছেন দেশের সাবেক সেনাপ্রধান ও বর্তমানে দেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিজয় কুমার সিং। বিপিন রাওয়াতের বক্তব্য এমন সময় করা হলো যখন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ চিহ্নিত করতে আসামে নাগরিক পরিচয়পঞ্জীকরণের কাজ চলছে দ্রুত লয়ে। আসামের শাসক দল বিজেপির দাবি, রাজ্যে প্রায় ৩০ লাখ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আছে, যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। বিপিন রাওয়াত ও বিজেপির বক্তব্যে একই সুর বিদ্যমান। আসামে বাংলাদেশিদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ইস্যু যে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল, তা বুঝতে রকেট বিদ্যা জানার প্রয়োজন পড়ে না।

বাংলাদেশের মানুষ আসামে কেন যাবে? বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলগুলোর একটি আসাম। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান আসামের চেয়ে অনেক ভালো। জীবনমানের কোনও কোনও সূচকে বাংলাদেশ ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে যে এগিয়ে আছে সে প্রশংসা অমর্ত্য সেনসহ অনেকে ভারতীয় অর্থনীতিবিদ-সমাজবিদরা করছেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়ের সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ছিটমহলে বসবাসকারী ভারতীয়রাই তো ভারতে ফিরে যায়নি, বাংলাদেশিরা কেন ভারতে বসতি গড়তে যাবে? বিনিময়ের আগে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলে ৪৫ হাজার ৪৭১ জন ভারতীয়দের বসবাস ছিল। তাদের সবারই ভারতে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে মাত্র ৯৮০ জন ভারতে গেছে। আর অবশিষ্টরা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে এখানে থেকে গিয়েছে। এদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকই রয়েছে। ‘কেমন আছে ভারতে চলে যাওয়া বাংলাদেশের হিন্দুরা?’ শিরোনামে রতন বালো-র অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সাক্ষ্য দিচ্ছে অভিবাসী হিন্দুরা নানাভাবে বঞ্চিত, কারও কারও জুটছে না বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম রসদও, বিত্তশালী কোনও কোনও পরিবার ছিন্নমূল হয়ে বাস করছে, কেউ আবার সব কিছু বিক্রি করে বাংলাদেশে ফেরত এসেছে, দেশত্যাগী অনেক হিন্দু পরিবার বাংলাদেশে ফিরে আসার ইচ্ছের কথা জানিয়েছেন প্রতিবেদককে। ভারতে আসা বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের অনেকেই আবার বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, ওই দেশেই আমরা ভালো ছিলাম। এখানে ভালো নেই। এখানে ভালো কিছু বন্দোবস্ত না হলে আবার বাংলাদেশের মাটিতে আগের ছিটমহলেই (বিলুপ্ত) ফিরে যেতে চাই। আসামে বাংলাদেশিদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ বিষয়ে গবেষক ভাস্কর নন্দী বলেন, ১৯৫০ সালে ভয়াবহ চরুয়া খেদা দাঙ্গায় একটি মুসলমান গ্রামেই আটশো মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনার পর দাঙ্গার আতঙ্কে হাজার হাজার মানুষ পূর্ব পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিলো। নেহরু-লিয়াকত চুক্তি অনুযায়ী তাদের ভারত ফেরত নেয় ঠিকই, কিন্তু সীমান্ত পেরুনোর সময়ে সঠিক নথিপত্র দেওয়া হয়নি। আর ওই শরণার্থীরা ফেরত আসার আগেই ১৯৫১ সালে আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা National Register of Citizenship (NRC) তৈরি হয়ে যায়। তাই বহু বাংলাভাষী মুসলমানেরই আর সেই NRC তে নাম ওঠেনি। আর এভাবেই বহু বাংলাভাষী মুসলমানকেই সন্দেহজনক ভোটার বা D Voter, অর্থাৎ সন্দেহজনক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করা হয়ে গেছে। ৩১ মার্চ ২০১৬ সালে বিবিসি’র সাংবাদিক অমিতাভ ভট্টশালীর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ধুবরীর প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব কুমার সেন বলেছেন, ‘লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশ থেকে চলে আসছে, এটা একেবারেই ভুল কথা। চোখের সামনেই তো দেখি যে সীমান্ত পেরিয়ে মানুষ আসে ঠিকই, আবার ফিরেও যায় কাজ করে। খুব কম সংখ্যক মানুষই ওদেশ থেকে এসে স্থায়ীভাবে থেকে যায়, তবে সেই সংখ্যাটা কখনোই লাখ বা হাজার নয়। এগুলো সব ভোটের সময় বলা হয়, কিন্তু সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান কেউ করতে চায়নি’। এসব তথ্য কি ভারত সরকারের অজানা?

আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক এতটাই তিক্ত ও শত্রুতামূলক যে ‘দা-কুমড়ো’, ‘সাপে-নেউলে’—কোনও বাংলা অভিধা দিয়েই বোঝানো যাবে না। বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত ও বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধের জন্য জঙ্গিবাদকে লেলিয়ে দেওয়া, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করতে দূতাবাস ব্যবহার করে তৎপরতা চালানো, আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখাসহ নানামুখী ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে পাকিস্তান।

চার. বাংলাদেশ চীন নতুন প্রেম নিয়েও ভারতের অস্বস্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চীন বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বাংলাদেশে দায়িত্বপালন করা ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বাংলাদেশকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘কোনও কিছু হলেই তো বাংলাদেশ চীনের কাছে যায়, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারত নয়, বাংলাদেশের উচিত চীনের কাছে যাওয়া।’

শেখ হাসিনা ও মোদি সরকারের মধ্যে কেন এ টানাপড়েন? ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্রচুক্তি করুক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাতে রাজি হতে পারেননি। ভারত অস্ত্র তৈরি করে না, সে নিজেই আমদানি করে। ভারতের সঙ্গে অস্ত্রচুক্তি করার অর্থ হলো, ভারত অন্য দেশ থেকে অস্ত্র কিনে বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করবে। দু’টোর কোনোটিই ভারতের জন্য সম্মানজনক নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ অস্ত্রচুক্তি করলে বিএনপিসহ আওয়ামী বিরোধীরা কথা তুলতো যে, গোলামি চুক্তি করে ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ কিংবা দেশ বিক্রি হয়ে গেছে। চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন কেনায় ভারত অসন্তুষ্ট হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়েও ভারত উদ্বিগ্ন। ভারতের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ভারতীয় সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কিছু নেই। তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা শুধু দেশের উন্নয়নের জন্য। দেশের প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে এমন যেকোনও দেশের সঙ্গে তার সরকার সহযোগিতার হাত বাড়াতে প্রস্তুত। অর্থনৈতিক দিক থেকে চীনের সঙ্গে ভারতেরও তো সহযোগিতা প্রচুর। এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি রাষ্ট্রীয় সমুদ্র এলাকা (টেরিটোরিয়াল সি), ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার পাহারা দিতে, সমুদ্র সম্পদ আহরণে, উন্নয়নে ও সমুদ্র সীমানার নিরাপত্তার প্রয়োজনে কোনও না কোনও পরাশক্তির সহযোগিতা বাংলাদেশকে চাইতেই হবে। ভারতও তার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করাসহ নানা প্রয়োজনে পরাশক্তির সাহায্য নিয়েছে, এখনও নিচ্ছে।

ভারতকে অনুধাবন করতে হবে চীন-ভারতের ‘লড়াই’য়ে বাংলাদেশ কোনোভাবেই জড়িত নয়। বরং বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর বানিয়ে চীনের কথিত ‘মুক্তার মালা’ সমুদ্রনীতি বাস্তবায়ন করার ভারতীয় উদ্বেগ ও আপত্তির কারণে বাংলাদেশ চীনের সহায়তায় কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের উদ্যোগ নিতে পারেনি। চীন বাংলাদেশের সাড়া না পেয়ে মিয়ানমারের রাখাইনে কাওয়াকফু গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। চীনের সহযোগিতায় সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর হলে, সোনাদিয়ায় চীনের বিনিয়োগ থাকলে বাংলাদেশ একদিকে ব্যাপক রাজস্ব আয়ের সুযোগ পেতো, অন্যদিকে চীনের স্বার্থেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন বাংলাদেশের পাশে সক্রিয় থাকতো, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের যে বুনিয়াদ সূচিত হয়েছে, নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তা নতুন মাত্রা লাভ করেছে। কেবল প্রতিবেশী হিসেবে নয়, ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার কারণেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদার। অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে আমাদের সহযোগী ভারত। শেখ হাসিনার সরকার উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভারতের কাছে তুলে দিয়েছে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেন কখনও বাংলাদেশে আশ্রয় না পায়, তা নিশ্চিত করেছে। ভারতকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সহজশর্তে ট্রানজিট দিয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে উভয়কে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। আসামের মতো কোনও কৃত্রিম সমস্যা সৃষ্টি বা কোনও প্রকার চাপ প্রয়োগের কৌশল নয়, কিংবা কোনও ভুল সিদ্ধান্ত যেন বাংলাদেশে আইএসআই-এর ফ্রন্ট উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী কেবল এ দুই দেশের জন্যই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সুত্রঃবাংলা ট্রিবিউন

apps