• মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ১১ বৈশাখ ১৪২৫
  • ||
  • আর্কাইভ

প্রচলিত বৃত্তের বাইরে দেখতে চাই আমাদের পুলিশ বাহিনীকে

প্রকাশ:  ১০ মার্চ ২০১৮, ২০:৫৩ | আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৮, ২১:০১
মনজুর রশীদ
প্রিন্ট

আমাদের পুলিশ বাহিনী পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুলিশ বাহিনীর মতো আইন শৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে প্রধান ভুমিকা পালন করে থাকে। তবে অন্যদেশসমূহ থেকে একটি বড় পার্থক্য হলো আমাদের মত সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, মত ও দর্শনে বহুধা বিভক্তি সমাজ ও রাষ্ট্র, অন্তকলহ, দ্বন্দ্ব-সংঘাতসমূহ অন্য দেশগুলোতে এতটা প্রবল নয়। তার ওপর রাজনৈতিকভাবে কর্তৃত্ববাদি ও সরকার নিয়ন্ত্রিত বাহিনী হওয়ায় তাদের জন্য অনেক সময় মূল্যবোধ নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন হয়ে কাজ করা দূরূহ হয়ে ওঠে। তবে আশার দিকটি হল আমাদের পুলিশ বাহিনীর রয়েছে নানা সাহসিকতার ঐতিহ্যগাঁথা। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পুলিশ বাহিনীর অকুতোভয় বীরত্বগাঁথা সকলেরই জানা।

 স্বাধীনতা পরবর্তী কালে বিশেষ করে বিগত এক দশকে বাংলাদেশ পুলিশের সনাতনী চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসা সবার কাছে বিশেষ দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছে। শুধু আইন পালন আর অপরাধ প্রতিরোধ বা দমনই নয়, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে যাচ্ছে। গত এক দশকে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমন এবং নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পুলিশ অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতেও আমাদের সেনাবাহিনীর সাথে সাথে বাংলাদেশ পুলিশের ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আমাদের পুলিশ বাহিনীর সম্মানিত সদস্যরা তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা আর পেশাদারীত্ব দিয়ে অপরাধ মোকাবিলায় প্রতিনিয়ত সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। নানা অনিয়ম দূনীর্তি অভিযোগের পরও এই বাহিনী তার পেশাদারীত্ব আর কর্মতৎপরতা দিয়ে জনগণের কাছে অন্যতম একটি প্রধান আস্থার জায়গা হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। 

কিন্তু এতকিছুর পরও পুলিশ বাহিনী সর্ম্পকে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা বহুল প্রতিষ্ঠিত। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নানা জরীপে এসব নেতিবাচক চিত্র ফুটে উঠতে দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে। সরকার ও সরকারী দলকে সন্তুষ্ট করতে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতি নিষ্ঠুর ও বর্বর আচরণ প্রদর্শন, প্রকৃত অপরাধীকে সহযোগিতা করে নিরীহ বা নির্দোষ মানুষদেরকে শাস্তি প্রদান বা হয়রানি করা, আবার কখনো কখনো নৈতিক স্খলনশীল আচরণ নিয়ে গণমাধ্যমে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ পুলিশ বাহিনীর গৌরবগাঁথাকে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

নিরাপরাধ ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা বিভিন্ন মামলা মোকাদ্দমার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা; অস্ত্র, মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা-ফেনসিডিলসহ নিষিদ্ধ মাদকসমূহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাগে বা ঘরে ঢুকিয়ে নিরপরাধ মানুষকে ‘ফাঁসানো’ও পুলিশের বিরুদ্ধে পুরানো অভিযোগ। প্রকৃত মৌলবাদি গোষ্ঠির বাইরে সাধারণ ধর্মানুরাগী মানুষকেও কখনো কখনো কোন মৌলবাদি দলের অনুসারির তকমা লাগিয়ে গ্রেপ্তার করার অভিযোগও আছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

 পুলিশী পরিচয়কে ব্যবহার করে অন্যায়ভাবে নানাবিধ সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি সাম্প্রতিককালে আরো যে সকল অভিযোগ পত্রিকার পাতায় হরহামেশা দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পুলিশকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা। যার ভয়াবহ প্রতিফলন আমরা দেখেছি সর্বশেষ বিএনপি’র শাসনামলে। সে সময় বিএনপি সরকার পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধী মত ও পথের মানুষকে যেভাবে নির্যাতন ও হেনস্তা করেছে তা ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারগুলোর আরো বেশী করে মনে থাকার কথা। বিএনপি’র সৃষ্ট সেই নির্যাতনের সংস্কৃতি আজ বিএনপি’র ঘাড়েই যেন জেঁকে বসেছে। আর এই অবস্থা বেশ উপভোগ করছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা – ঠিক যেমনটা করেছিলো একসময় বিএনপি’র নেতাকর্মীরা। 

ঠিক একইভাবে সেই ২০১৪ সনের জ্বালাও-পোড়াও এর ব্যর্থ আন্দোলনের পর থেকে সাম্প্রতিককালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গণগ্রেপ্তার এবং বাণিজ্যের অভিযোগও গণমাধ্যমে উঠে আসছে বারবার। বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে বিএনপি’র শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিগুলোতে সাদা পোশাকের কিছু পুলিশ জনসমাগমের সাথে মিশে গিয়ে সময়মত অস্ত্র উচিয়ে, জোরজবরদস্তি করে, টেনে হিঁচড়ে বা গলায় রিভলবার ঠেকিয়ে বা হাতে হাতকড়া পরিয়ে ফিল্মি কায়দায় যেভাবে তাদেরকে গ্রেফতার করেছে এবং সেই ছবিগুলো পত্রিকার পাতায় বড় শিরোনাম হয়ে এসেছে - তা একদিকে যেমন অত্যন্ত উদ্বেগজনক, সেইসাথে সেই পুরানো সংস্কৃতিকেই যেন আবার নতুন করে উপস্থাপনের পুনঃমঞ্চায়ন দেখছি আমরা সাধারণ জনগণ। বিগত সপ্তাহে পুলিশি একশনের একাধিক দৃশ্য সবাইকে হতবাক করেছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিএনপি’র মানববন্ধন কর্মসূচি চলাকালীন সময়ে বিএনপি মহাসচিবের কাছ থেকে ছাত্রদলের একজন নেতার কাপড় ছিঁড়ে-ছুড়ে অর্ন্তবাস বের করে তার হাতে হাতকড়া পড়িয়ে গ্রেফতার করা হয়। স্বাধীন রাষ্ট্রের একজন নাগরিককে প্রকাশ্য দিবালোকে আটকের এই উলঙ্গ প্রচেষ্টা্ কি কোনোভাবে সমর্থনযোগ্য? ছাত্রদল, ছাত্রলীগ কিংবা অন্য কোনো দলের পরিচয়ের আগে তিনিতো একজন মানুষ। 

এর আগে আমরা দেখলাম বিএনপি অফিসের সামনে অল্পকিছুসংখ্যক কর্মীর কালো পতাকা প্রদর্শনকালে দলটির মহাসচিবসহ উপস্থিত নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের জলকামান ব্যবহার করে রঙ্গীন পানি ছিটিয়ে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা এবং গেট থেকে টানা হেঁচড়া করে এই দলের কিছু নারী ও পুরুষ নেতাকর্মীকে আটক করার দৃশ্য। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সংবাদে প্রদর্শিত এই দৃশ্যগুলো সাধারণ মানুষকে কিন্তু পুলিশবাহিনী সম্পর্কে আবারো নেতিবাচক ধারণার সুযোগ করে দিচ্ছে। প্রায় একই ধরণের এমন দৃশ্য আমরা দেখেছি বিএনপি’র শাসনামলেও- নেতাকর্মীদের ওপর রাজপথে পুলিশের সে কি সাঁড়াশি আক্রমণ! বিএনপিকে খুশী করার জন্য সেসময় যেসকল পুলিশ কর্মকর্তা নির্যাতনের হোলি খেলায় মেতে উঠেছিলেন, আজ তাদের অস্তিত্ব কেউ কোথাও দেখতে পায় বলে মনে হয়না!

আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো দেশের বেশীরভাগ পুলিশের সততার বাস্তব নিদর্শনমূলক গল্পগুলো হারিয়ে যায় এই বাহিনীরই একটা অতি ক্ষুদ্র অংশের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য। ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়াও ছোট-বড় বিভিন্ন পদবীধারী সেই অংশের সক্রিয়ভাবে অপরাধ সংঘটিত করার জন্য কলঙ্কিত হতে হয় সামগ্রিক একটা দায়িত্বশীল বাহিনীকে। ভাবা যায় না, কতটা দুঃসাহসিক ও নির্লজ্জ সেই অপরাধগুলো। কিছুদিন আগে ‘দৈনিক কালের কন্ঠে’ লেখা পুলিশ বাহিনীর একজন সাবেক আইজিপি’র লেখায় ফুটে উঠেছে কিভাবে সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মক নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে আমাদের গৌরবময় পুলিশ বাহিনীরই একটি অংশ (নীচের লিঙ্ক এ পড়ুন): (http://www.kalerkantho.com/print-edition/muktadhara/2018/02/12/600919)।

আমাদের সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনার দায়িত্ব জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের। তা যখন যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেনো। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে দেশে শান্তি, সুশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সরকার ও নিরাপরাধ জণগণকে সহায়তা করা। আমাদের পুলিশ বাহিনীর যে সকল নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর সুষ্ঠ তদন্ত ও বিচার কামনার পাশাপাশি এগুলোকে আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখতে চাই।

 আমাদের প্রবাহমান নষ্ট রাজনীতির মধ্যে নিজেদেরকে সংযুক্ত না করে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মান উন্নয়নে পুলিশ বাহিনীকে আরও আন্তরিক, মানবিক ও সচেতন হতে হবে বলে সাধারণ জনগণ প্রত্যাশা করে। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে যে পুলিশ বাহিনীর অকুতোভয় প্রতিরোধের কথা ইতিহাস হয়ে গাঁথা আছে, যে পুলিশ বাহিনী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সঙ্কটকালীন সময়ে সাহসী অবদান রেখে যাচ্ছে, তাদের ভাবমূর্তি আরও উন্নত হবে এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক অবস্থায় থাকবে, নিরীহ ও নিরাপরাধ মানুষের বিপদের সময়ে বন্ধুর মতো তারা পাশে দাঁড়াবে – দেশের ঐতিহ্যবাহী একটি বাহিনীর কাছে দেশের সাধারণ নাগরিক হিসাবে এটা নিঃসন্দেহে খুব বেশী চাওয়া হবেনা!

লেখকঃ গবেষক, সমাজ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী।