• মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ১১ বৈশাখ ১৪২৫
  • ||
  • আর্কাইভ

মানব কল্যাণে বিলিয়ে দিবে আমার বাকি জীবন: শাহরীন

প্রকাশ:  ১৭ মার্চ ২০১৮, ১৮:০১
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট

‘আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন। তিনিই আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। আমি এখনও বেঁচে আছি, তা কিছুতেই ভাবতে পারছি না! আল্লাহ নিশ্চয় আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ভালো কিছু কাজ করার জন্য। আমার জীবন মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দেব। আমি মানুষের জন্য কাজ করব। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ৫ নম্বর বেডে শুয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে কথাগুলো বলেন নেপালের কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় আহত মৃত্যুঞ্জয়ী শাহরিন আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, আমি বেঁচে আছি। আমার পাশের সিটে বসা একজন যাত্রী চোখের সামনে হেলে পড়লেন। মাথা থেকে মগজ বের হয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল। বলছিল- মা, মাগো। তারপর আর কোনো শব্দ নেই। মারা গেলেন। পেছনের সিটে বসা যাত্রীগুলো যেন মিশে যাচ্ছেন। শুধু চিৎকার আর চিৎকার। আমি তখন সিট থেকে বের হতে পারছিলাম না। সঙ্গের এবং পরের সিটগুলোয় যাত্রীরা পড়ে আছে। একপর্যায়ে আর কিছু দেখতে পারিনি। আগুন আর ধোঁয়াই ভেতরটা অন্ধকার।’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন শাহরীন।

একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, ‘যখন বিমানটি হেলে যাচ্ছিল তখন সবাই শুধু কাঁদছিল, আমিও চিৎকার করছি। তারপর মুহূর্তেই বিকট শব্দে বিমানটি পড়ে যায়। সে যে কী অবস্থা, তা আর বলতে পারব না। ...আমার ২ বোন এক ভাই। বড় বোন দেশের বাইরে থাকেন। আমার কিছু হলে তারা ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। আমি নেপালের আর্মিদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি যখন আটকা পড়ে চিৎকার করছি তখন দেখি আর্মির লোকজন যাত্রীদের বের করার চেষ্টা করছে। প্লেনটির পেছন দিকে তখনও আগুন জলছিল। দু’জন আর্মির লোক আমাকে টেনে উদ্ধার করে নিচে নামান। ওই সময় আমি বলছিলাম, আমাকে ছেড়ে দেন, আমি নিজেই হেঁটে যাব। তারপর আমি অনেকটুকু জায়গা হেঁটে গেছি, হঠাৎ আর হাঁটতে পারিনি। এরপর তারা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন।

শাহরীন বলেন, ‘চোখের সামনে মৃত্যুকে দেখেছি, চোখের সামনে পোড়া মানুষ। কারও জীবন যেন এমন পরিস্থিতি না আসে। বিশ্বাস করুন, মানুষ যে বাঁচার জন্য কী করে, তা নিজ চোখে দেখেছি। কিছুই করার ছিল না। মৃত্যু যখন দেখেছি, এ জীবন মানুষের জন্য বিলিয়ে দিতে চাই। বিলিয়ে দেব।’

তিনি শিক্ষকতা পেশায় আছেন জানিয়ে বলেন, আমি জীবনে বহু দেশ ঘুরেছি নেপালে কোনোদিন যাইনি। প্রথমবারের মতো যাচ্ছিলাম। কিন্তু নেপাল দেখা হল না। এখন দেশের বস্তিগুলো ঘুরে ঘুরে দেখব। এ জীবন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিলিয়ে দেব।

বৃহস্পতিবার দেশে আসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, আমি যখন ত্রিভুবন বিমানবন্দরে তখন ভয়ে কাঁপছিলাম। সঙ্গে থাকা স্বজনদের বলছিলাম- আমি বিমানে উঠব না। জোর করেই বিমানে উঠানো হয় আমাকে। বিমানে উঠে আমি শুধুই কাঁদছিলাম। আমি চোখ খুলতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল এই বুঝি বিমানটি পড়ে যাচ্ছে। চোখ বুঝলেও দুর্ঘটনাটি চোখে ভেসে আসছিল।

শাহরীন বলেন, আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য যা যা প্রয়োজন তা যেন করা হয়। আমি বাংলাদেশে এসেছি, এখন সাহস পাচ্ছি। বৃহস্পতিবার নেপালের স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টায় বিজি-০০৭২ ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়ে বিকাল ৩টা ৪৭ মিনিটে বাংলাদেশে পৌঁছে শাহরীনকে বহনকারী বিমানটি।

বিকাল ৪টা ৫৭ মিনিটে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে পৌঁছেন শাহরীন। এর আগে দুপুরে ইউনিটের পরিচালক ড. আবুল কালাম, সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেনসহ ১৩ জন ডাক্তার ও ২১ জন নার্স প্রস্তুত থাকেন। শাহরীন পৌঁছা মাত্রই তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। এরপর চিকিৎসকরা তাকে দেখেন। তাকে বিকাল ৫টা ৫৭ মিনিটে ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) নেয়া হয়। ওখানে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে রাতে তার আত্মীয় স্বজনের অনুরোধে কেবিনে দেয়া হয়। 

এদিকে পরিচালক ডা. আবুল কালাম বলেন, শাহরীনের পিঠে ক্ষত আছে, ডান পায়ের নিচে ভাঙা আছে। প্রায় ২ সপ্তাহ লাগবে ক্ষত শুকাতে। তাছাড়া তার মাথায় আঘাত রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা- তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। দুর্ঘটনার স্মৃতি তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, চিকিৎসায় তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ রয়েছে সর্বোচ্চ চিকিৎসার। রোববার তার চিকিৎসার জন্য একটি বোর্ড গঠন করা হবে।

সূত্র: যুগান্তর