• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫
  • ||

ব্যাংকঋণে সুদ কমানোয় ব্যবসায়ীদের স্বস্তি

প্রকাশ:  ২৪ জুন ২০১৮, ১১:০৭
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট

ব্যাংকঋণের সুদের হার সিঙ্গল ডিজিট বা এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে সব শ্রেণির ব্যবসায়ীরা। এ জন্য তারা ব্যাংক উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীকেও বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছে। গত বুধবার বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) জরুরি বৈঠকে ব্যাংকঋণের সুদের হার ১ জুলাই থেকে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পাশাপাশি তিন মাস মেয়াদি আমানতের সুদের হার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। একই দিন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোও ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়।

পূর্বপশ্চিম বিশ্বকাপ কুইজে অংশ নিতে ক্লিক করুন।

ব্যাংকগুলোর এ সিদ্ধান্তে বিভিন্ন ফোরামে ব্যবসায়ীরা সন্তোষ প্রকাশ করছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসায়ীই উপকৃত হবে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। ঋণের সুদের হার কম হওয়ায় ছোট-বড় সব ধরনের

উদ্যোক্তাই ঋণ নিতে পারবে। দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে শেয়ারবাজারও চাঙ্গা হয়ে উঠবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবে বলেও তাঁরা আশা করছেন। তাঁদের ধারণা, এতে করে সামগ্রিকভাবে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান হবে আরো অসংখ্য বেকার তরুণ-তরুণীর।

গত বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) নেতারা ব্যাংকের সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এরও আগে ঢাকা ও চট্টগ্রাম চেম্বারের নেতারা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ মুনাফা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছিলেন।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগটা খুবই ভালো একটি উদ্যোগ বলে আমি মনে করি। কারণ বাংলাদেশে ব্যবসার ব্যয় অনেক বেশি। এর কারণ চড়া সুদের ঋণ। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করলে উত্পাদন খরচ বেড়ে যায়, যা মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’ এই ব্যবসায়ী নেতার মতে, ঋণের সুদের হার কমে এলে খেলাপি ঋণও কমে আসে। কেননা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে অনেকেই ব্যবসায় লোকসানের শিকার হয়ে ঋণটা পরিশোধ করতে পারে না।

ঘোষণা অনুযায়ী ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনতে হলে আমানতের সুদের হার কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হার। এ বিষয়ে মীর নাসির হোসেন বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বেশি হলে এটা আমানতের সুদের হার কমাতে বাধা দেবে। ফলে সরকারের উচিত হবে এ বিষয়টি ভালো করে বিবেচনা করা। তবে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনার যে ঘোষণা দিয়েছে সেটা যেন সঠিকভাবে প্রতিপালন করা হয়। কাজটি করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো এক অঙ্কের সুদে ঋণ দিচ্ছে কি না সেটা তদারক করতে হবে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে।

বর্তমানে প্রধান প্রধান সঞ্চয় স্কিমে ১০ শতাংশের বেশি হারে মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে। যে কারণে বেশি মুনাফার আশায় অনেকেই ব্যাংক থেকে আমানত তুলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। ফলে প্রতিবছর বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ আসছে এ খাত থেকে। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই এ খাতের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হচ্ছে সরকারকে।

চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। ছয় মাস না পেরোতেই এই লক্ষ্য ছাড়িয়ে যায়। শেষে সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা করে সরকার। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৪০ হাজার ৬৩ কোটি টাকা নিট ঋণ এসেছে সঞ্চয়পত্র থেকে।

ব্যবসায়ীরা বলছে, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বেশি থাকায় অনেক ছোট ও মাঝারি আকারের উদ্যোক্তা কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে রাখছে। এতে করে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ মূলেই বিনাশ হয়ে যাচ্ছে। এ খাতের মুনাফার হার কমিয়ে আনা হলে অনেকেই এই টাকা উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করবে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগও বিকশিত হবে।

গত বুধবার বিএবির বৈঠকে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান তমাল এস এম পারভেজ বলেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার না কমালেও তেমন কোনো অসুবিধা হতো না, যদি ব্যবসায়ীদের এ খাতে বিনিয়োগ বন্ধ করা যেত। বেশি মুনাফা পাওয়ার আশায় অনেক ব্যবসায়ী তাদের টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। এতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছে, ব্যাংকঋণের সুদের হার সিঙ্গল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তটি যুগান্তকারী। দীর্ঘদিন ধরেই এটা তাদের দাবি ছিল। বিনিয়োগের স্বার্থে সামনে দেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। তারা বলছে, আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদের গত পাঁচ বছরে দেশে বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট সহায়ক পরিবেশ বজায় ছিল। কোনো ধরনের হরতাল, অবরোধ বা রাজনৈতিক ডামাডোল ছিল না। যে কারণে অনেক অসুবিধার মধ্যেও ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পেরেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তের পর গত ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে আমানতের সুদহার কিছুটা বাড়তে শুরু করে। মেয়াদি আমানতের ওপর কোনো কোনো ব্যাংক ৮ থেকে ৯ শতাংশ সুদ অফার করতে থাকে। এমন অবস্থায় আমানতকারীরা কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেলেও ঋণের সুদের হার বেড়ে ১৪-১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এ অবস্থায় গত মার্চে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে নেতাদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর এপ্রিলে ব্যাংকের নগদ জমার বাধ্যবাধকতা (সিআরআর) কমিয়ে ৫.৫ শতাংশ করা হয়, সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এমনকি আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যাংকের করপোরেট কর ২.৫ শতাংশ করে কমিয়ে আনা হয়। এত সব সুবিধার বিপরীতে সরকারের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকঋণের সুদের হার কমিয়ে আনা। এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন ব্যাংক পরিচালকরা। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই থেকে ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নিয়ে আসার ঘোষণা এলো গত সপ্তাহে। সিআরআর কমিয়ে, বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি তহবিল জমার হার বাড়িয়ে এবং করপোরেট কর কমিয়ে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংকট মোকাবেলায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উদ্যোগকেও ব্যবসায়ীরা সাধুবাদ জানিয়েছে। সূত্র: কালের কণ্ঠ

/এসএম

ব্যাংকঋণ