• মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮, ২ শ্রাবণ ১৪২৫
  • ||

স্বামীর বিরুদ্ধে রোখসানার কোনো অভিযোগ নেই

স্ত্রীকে ফেলে যাননি আবদুল

প্রকাশ:  ২৫ জুন ২০১৮, ১১:০৮
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক
প্রিন্ট

‘আবদুল মেরি জান হ্যা। মে উসকে বিনা জিন্দা নহি রহ সাকতি। বাংলাদেশ হো ইয়া ইন্ডিয়া কহি ভি নহি রহনা চাহতি। ওহ এক বহতি ভালে ইনসান হ্যায়।

ইস ওয়ক্ত উসে জেল মাত ভেজিয়ে, উসে মেরে অর উসকে বাচ্চে কে পাস রহনে দিজিয়ে। আভি মেরি বাচ্চে ঠিক হ্যায়। মে বহত খুশ হু’ (আবদুল আমার জান, তাকে ছাড়া বাঁচব না। তাকে ছাড়া আমি বাংলাদেশ কিংবা ভারতেও থাকব না। সে অনেক ভালো মানুষ।

তাকে জেলে নয়, এ মুহূর্তে তাকে আমার ও সন্তানের কাছে থাকতে দিন)।- এ কথাগুলো বলেন ভারতীয় নাগরিক রোখসানা আক্তার। ১৯ জুন রাত সোয়া ১টায় ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন একটি টয়লেটে তিনি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন।

পূর্বপশ্চিম বিশ্বকাপ কুইজে অংশ নিতে ক্লিক করুন।

কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াছিন ফারুকী জানান, রোখসানার স্বামী আবদুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। স্ত্রীর প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা রয়েছে। ওই রাতে ট্রেনটি রোখসানাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পর ওই ট্রেনেই রোখসানা আবার কমলাপুর স্টেশনে ফিরে আসেন। তিনি বলেন, আবদুলের বিরুদ্ধে রোখসানা একটি কথাও বলছেন না।

রোববার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রোখসানার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয় এ প্রতিবেদকের। ভারতের বেঙ্গালুরুর বাসিন্দা রোখসানা হিন্দিতে কথা বলেন। রোখসানা জানান, প্রায় ৭ বছর ধরে বেঙ্গালুরুতে ফার্নিচারের কাজ করেন বাংলাদেশি নাগরিক মো. আবদুল হক।

একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। প্রায় দেড় বছর আগে তারা বিয়ে করেন। বিয়ের পর বেঙ্গালুরুতে বাবার বাড়ির কাছে একটি বাসায় তারা ভাড়া থাকতেন। আবদুলের ক্যান্সার আক্রান্ত মাকে দেখতে তারা বেঙ্গালুরু থেকে বেনাপোল সীমান্ত হয়ে ২ জুন অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।

চাঁদপুরের মতলব থানার উত্তর ডিঙ্গা ভাঙ্গা গ্রামে মাকে দেখাসহ আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় তারা ঘুরে বেড়িয়েছেন। সর্বশেষ ঢাকায় আবদুলের বড় বোন নিলুর বাসায় তারা আসেন। রোখসানাকে আজিমপুর মেটার্নিটি হাসপাতালে ডাক্তারি পরীক্ষা করিয়ে নিলু জানান, রোখসানার গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে। বিষয়টি কিছুতেই মানতে পারেনি আবদুল।

নারায়ণগঞ্জে বন্ধু সায়েদের বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে ১৮ জুন রাতে নিলুর বাসা থেকে বের হন তারা। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তারা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছান। ওসি মো. ইয়াছিন জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে স্টেশন চত্বরের কয়েকজন লোক রোখসানাকে থানায় নিয়ে যান। ওই সময় রোখসানা টয়লেটে যেতে চান।

টয়লেট থেকে রোখসানা বের না হওয়ায় লোকজন সেখানে যান। এ সময় টয়লেটের ভেতর শিশুর কান্না শোনা যায়। রাত সোয়া ১টার দিকে টয়লেট থেকে নবজাতকসহ রোখসানাকে উদ্ধার করে মহিলা পুলিশ। এরপর সন্তানসহ রোখসানাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দুই দেশের সরকার বিষয়টি ভেবে দেখবে জানিয়ে ওসি মো. ইয়াছিন আরও বলেন, এখানে সন্তানের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে, ২২ জুন রাতে ঢামেক হাসপাতাল থেকে আবদুলকে পুলিশ আটক করে। রোববার তাকে ৫৪ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়। এর আগে ঢাকা রেলওয়ে থানায় তার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি জানান, ৭ বছর ধরে তিনি বেঙ্গালুরুতে থাকেন। পপি আক্তার নামে তার আরেকজন স্ত্রী রয়েছে।

২০১২ সালে চট্টগ্রামে প্রেম করে পপিকে তিনি বিয়ে করেন। পপি ছিলেন হিন্দু, পরে তিনি মুসলমান হন। বিয়ের কিছুদিন পরই তারা ভারতে চলে যান। বেঙ্গালুরুতে তারা থাকতে শুরু করেন। তাদের সংসারে সন্তান না হওয়ায় প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়েই রোখসানাকে তিনি বিয়ে করেন। পাসপোর্ট করেই পপিকে নিয়ে আবদুল ভারতে যান। কারণ, তাদের বিয়ে উভয় পরিবার মেনে নিচ্ছিল না। আবদুল বলেন, মা ক্যান্সারে আক্রান্ত এটা শোনে কিছুতেই ঠিক থাকতে পারছিলাম না।

তার ভাষায়, বৈধ আর অবৈধ বুঝতে চাইনি। মাকে দেখার জন্য রোখসানাকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসি। বাংলাদেশে সন্তান হবে- এমন আশায় বুক বেঁধেছিলাম। তিনি বলেন, রোখসানাকে নিয়ে প্রতারণা করলে গর্ভাবস্থায় তাকে নিয়ে দেশে আসতাম না।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ৮ নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা নারায়ণগঞ্জগামী ট্রেনে রোখসানাকে উঠিয়ে পানি আনতে স্টেশন চত্বরে বের হই। ততক্ষণে ট্রেনটি ছেড়ে চলে যায়। রোখসানাকে পেতে আমি সড়ক পথে নারায়ণগঞ্জ গিয়েও পাইনি। পুরো রাত খুঁজেছি। পরদিন পত্র-পত্রিকায় সংবাদ আসে তাকে নাকি স্টেশনে ফেলে পালিয়েছি। কথাগুলো বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

বাংলাদেশ সরকার এবং ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে রোখসানা বলেছেন, তার স্বামী এমন কাজ কখনও করতে পারে না। তার কোনো অভিযোগ নেই। তারা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন, এজন্য বিচার হোক। কিন্তু, এ সময় নয়। এ সময় তার পাশে স্বামীর থাকা খুবই জরুরি। কারণ বাংলাদেশে স্বামী ছাড়া তার আর কেউই নেই। ২২ জুন হাসপাতালে দেখতে এসে আবদুল তাকে বলেছেন পুলিশের ভয়ে সে তার কাছ আসতে পারেনি। মিডিয়াতে তার বিরুদ্ধে লেখা হয়েছে।

ঢামেক হাসপাতালের নবজাতক ইউনিটের পরিচালক ডা. মো. তোফাজ্জল হোসেন খান রোববার জানান, শিশুটির অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। তার পেট ফাঁপা ছিল, জন্ডিস ছিল, তা কমে আসছে। এখনও মুখে কিছু খেতে পারছে না। স্যালাইন দেয়া হচ্ছে। ১ কেজি ৭০০ গ্রাম ওজন নিয়ে জন্মেছে শিশুটি। তার উন্নত চিকিৎসায় বোর্ড গঠন করা হবে। শিশুটিকে এখনও শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না। সূত্র: যুগান্তর

/এসএম

রোখসানা