• বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
  • ||

শোকাবহ আগস্ট ও সংগ্রামের দিনগুলি

প্রকাশ:  ০৩ আগস্ট ২০১৮, ০৫:০৯ | আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৮, ০৫:৪০
তোফায়েল আহমেদ
প্রিন্ট

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে পরিবারের ১৭ জন সদস্যসহ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে পরিবারের সদস্যসহ এরূপ ভয়াবহভাবে হত্যার ঘটনা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। বর্বর হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে ঘাতক খুনিচক্র স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রগতিকে।

ভোর থেকেই দিনটি ছিল বিভীষিকাময়। হত্যাকাণ্ডের পরপরই সকালে আমাকে প্রথমে গ্রেফতার করে গৃহবন্দি করা হয়। ধানমণ্ডির যে বাসায় আমি থাকতাম (এখন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান বাস করেন), সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সেই বাসাটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বাসায় কাউকে ঢুকতে বা বেরোতে দেওয়া হয়নি। আমার সঙ্গে তখন বাসায় অবস্থান করছিলেন ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুদ্দিন আহমেদ মিয়া। তিনি ভোলা জেলা বাকশালের সেক্রেটারি ছিলেন।

দু'দিন পর ১৭ তারিখ খুনিচক্রের অন্যতম ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর একদল উচ্ছৃঙ্খল অভ্যুত্থানকারী আমার বাসভবন তছনছ করে। ঘরের দেয়ালে সংরক্ষিত বঙ্গবন্ধুর ছবিগুলো ভেঙে ফেলে। মায়ের সামনেই হাত-চোখ বেঁধে আমায় রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে খুনিচক্রের সমর্থনে সম্মতি আদায়ে উপর্যুপরি নির্যাতন চালায়। তখনও জেনারেল শফিউল্লাহ সেনাপ্রধান এবং কর্নেল শাফায়াত জামিল ব্রিগেড কমান্ডার। তাদের হস্তক্ষেপে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা প্রয়াত আমিন আহমেদ চৌধুরী (পরে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল) আমাকে বাড়িতে মায়ের কাছে পেঁৗছে দেন। এরপর ২৩ তারিখই এ চৌধুরী একদল পুলিশসহ এসে আমার বাসভবন থেকে আমাকে এবং জিল্লুর রহমানের (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) বাসভবন থেকে তাকে বঙ্গভবনে নিয়ে যান। বঙ্গভবনে খুনি মোশতাক তার অবৈধ সরকারকে সমর্থন করার জন্য আমাদের দু'জনকে প্রস্তাব দেন। আমরা দু'জনেই খুনি মোশতাকের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি। এরপর আমাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।

সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ জিল্লুর রহমান, আমাকে ও আবদুর রাজ্জাককে একই দিনে গ্রেফতার করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোণে অবস্থিত পুলিশ কন্ট্রোলরুমে ছয়দিন বন্দি রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। আমাদের সঙ্গে আরেকজন বন্দি ছিলেন। তিনি 'দি পিপল' পত্রিকার সম্পাদক প্রখ্যাত সাংবাদিক আবিদুর রহমান। পুলিশ কন্ট্রোলরুমের একটি ছোট্ট ঘরের মধ্যে পাশাপাশি দুটি চৌকির একটিতে ঘুমাতাম আমি ও রাজ্জাক ভাই এবং অপরটিতে জিল্লুর ভাই ও আবিদুর রহমান।

এমনি একদিন রমজান মাসের ৩ তারিখ আমরা রোজা রেখে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শেষ রাতের দিকে সেনাবাহিনীর একদল লোক আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বলতে থাকে, 'হু ইজ তোফায়েল, হু ইজ তোফায়েল!' রাজ্জাক ভাই জেগে উঠে আমাকে ডেকে তোলেন। আমি চোখ মেলে দেখি আমার বুকের ওপরে স্টেনগান তাক করা। আমি অজু করতে চাইলে অনুমতি দেওয়া হয়। কক্ষের সঙ্গেই সংযুক্ত বাথরুম। অজু করে আসার সঙ্গে সঙ্গেই জিল্লুর ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আবিদুর রহমানের সামনেই আমার চোখ বাঁধে এবং বারান্দায় নিয়ে হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। আমি অনুভব করি আমাকে রেডিও স্টেশনে আনা হয়েছে। এরপর হাত-চোখ বাঁধা অবস্থায়ই চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।

জ্ঞান ফিরলে আমাকে অনেক প্রশ্ন করা হয়। বঙ্গবন্ধু কী করেছেন, তার কোথায় কী আছে এ রকম বহু প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর না দেওয়াতে ভীতি প্রদর্শন করে খুনিরা বলে, ইতিমধ্যে আমার এপিএস শফিকুল আলম মিন্টুকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সে আমার বিরুদ্ধে ৬০ পৃষ্ঠার এক বিবৃতি দিয়েছে। সেই বিবৃতিতে আমার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে। তথাপি আমি নিরুত্তর থাকি। শুধু একটি কথাই বলেছিলাম, 'বঙ্গবন্ধু যা ভালো করেছেন আমি তার সঙ্গে ছিলাম, যদি কোনো ভুল করে থাকেন তার সঙ্গেও ছিলাম। এর বেশি কিছুই আমি বলতে পারব না।' তখন তারা চরম অসন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় আমার ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু করে। ভয়াবহ সেই নির্যাতনের ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছি।

এরপর অর্ধমৃত অবস্থায় পুলিশ কন্ট্রোলরুমে নিয়ে আসা হয়। সেখানে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদকারীদের মধ্যে খুনি ডালিমের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট চিনতে পেরেছিলাম। আমাকে রুমের মধ্যে একা রেখে তারা মিটিং করছিল আমাকে নিয়ে কী করবে। এখনও মনে আছে অজ্ঞাত একজন আমার মাথায় হাত রেখে শুধু বলছিলেন, 'আল্লাহ আল্লাহ করেন, আল্লাহ আল্লাহ করেন।' কারণ তার ধারণা হয়েছিল ঘাতকের দল আমাকে মেরে ফেলবে। শেষ পর্যন্ত ঘাতকরা এসে আমাকে বলল, 'আমরা যে প্রশ্নগুলো করেছি তার উত্তর দিতে হবে; উত্তর না দিলে আপনাকে আমরা রাখব না।' এবারও নিরুত্তর থাকায় পুনরায় তারা আমাকে নির্যাতন করতে থাকে এবং একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন ঘাতক দল পুলিশ কন্ট্রোলরুমের যে কক্ষে আমরা অবস্থান করছিলাম সেই কক্ষে রাজ্জাক ভাই ও জিল্লুর ভাইয়ের কাছে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় রেখে আসে। সেখানে জ্ঞান ফিরলে যন্ত্রণায় আমি চিৎকার করতে থাকি। শারীরিক অসহ্য ব্যথা নিয়ে যখন আর্তনাদ করছি, তখন জিল্লুর ভাই ও রাজ্জাক ভাই আমার এ অবস্থা দেখে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন এবং তারা দু'জনেই আমার সেবা-শুশ্রূষা করেন। এরপর সিটি এসপি সালাম সাহেব ডাক্তার নিয়ে আসেন।

এ অবস্থার মধ্যেই রাতে মেজর শাহরিয়ার আমার কাছ থেকে বিবৃতি নিতে আসে। তিনি আমাকে বলেন, 'যে প্রশ্নগুলো করা হয়েছে তার লিখিত উত্তর দিতে হবে।' আমি মেজর শাহরিয়ারকে বললাম, 'আপনারা আমাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন দিতে পারেন; আমি কোনো কিছু লিখতেও পারব না, বলতেও পারব না।' ওরা যখন দেখল আমার কাছ থেকে কোনো বিবৃতি আদায় করা সম্ভব নয়; তখন তারা উপায়ান্তর না দেখে চলে যায়। পরদিন অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বর আমাকে ও আবিদুর রহমানকে ময়মনসিংহ কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ফাঁসির আসামিকে অন্ধকার নির্জন প্রকোষ্ঠে যেভাবে রাখা হয় ময়মনসিংহ কারাগারে আমাকেও সেইভাবে বন্দি করে রাখা হয়। এরপর ২০ মাস ময়মনসিংহ কারাগারে অবস্থানের পর '৭৭-এর ২৬ এপ্রিল আমাকে কুষ্টিয়া কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কুষ্টিয়া কারাগারে আটকাবস্থায় '৭৭-এর ২৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনৈক সেকশন অফিসার কর্তৃক ব্যাকডেটে স্বাক্ষরিত অর্থাৎ '৭৫-এর ১০ সেপ্টেম্বর তারিখে জারি করা আটকাদেশের সত্যায়িত কপি আমার কাছে প্রেরণ করা হয়। আটকাদেশের সত্যায়িত কপি প্রাপ্তির পর আমার স্ত্রী আনোয়ারা আহমেদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আমার পক্ষের আইনজীবীরা_ সর্বজনাব সিরাজুল হক, এএইচ খোন্দকার, সোহরাব হোসেন, সালাহউদ্দীন আহমেদ এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আদালতে বলেন, 'তার আটক সম্পূর্ণ অন্যায় এবং ১৯৭৫ সালের জরুরি ক্ষমতা আইনের আওতায় তার আটকাদেশের যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করার মতো কোনো তথ্য-প্রমাণ সরকারের হাতে নেই। ফলে ওই আটকাদেশ অবৈধ ও আইনের এখতিয়ারবহির্ভূত।'

বিচারপতি কেএম সোবহান এবং বিচারপতি আবদুল মুমিত চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি ডিভিশন বেঞ্চ '৭৮-এর ৯ জানুয়ারি এক রুল জারি করেন। রুলে বলা হয়, 'কারাগারে আটক তোফায়েল আহমেদকে কেন আদালতের সামনে হাজির করা হবে না এবং কেন তাকে মুক্তি দেওয়া হবে না' সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও অন্যদের কারণ দর্শাতে বলা হচ্ছে।

কুষ্টিয়া কারাগারে যখন আমি বন্দি তখন আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। রাজ্জাক ভাই এবং আমার একসঙ্গে রিট হয়। রাজ্জাক ভাই হাইকোর্ট থেকে মুক্তি পেলেও আমি মুক্তি পাইনি। অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ে আমি মুক্তি পেলাম ৪ মাস পর অর্থাৎ ১৯৭৮-এর ১২ এপ্রিল। কুষ্টিয়া কারাগারে ১৩ মাসসহ সর্বমোট ৩৩ মাস বন্দি থাকার পর আমি মুক্তি লাভ করি।

ইতিমধ্যে কারাগারে আটকাবস্থায় আমি আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই। জাতির জনককে হত্যা করেই খুনিচক্র ক্ষান্ত হয়নি; একই বছরের ৩ নভেম্বর কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যারা নেতৃত্ব দিতেন বা বারংবার নেতৃত্ব দিয়েছেন দলের এবং সরকারের ঐতিহাসিক মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, কামারুজ্জামান সাহেব- যারা জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য তাদের কারাভ্যন্তরে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।

এ হত্যাকাণ্ডের আসল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় রাজনীতিতে চরম শূন্যতা তৈরি করা। সেই মুহূর্তে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের পর '৭৬-এ দলের হাল ধরেন মহিউদ্দীন আহমেদ। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম সহসভাপতি। যখন '৭৫-এ 'বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ' গঠিত হয় তখন তিনি ছিলেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও জেলহত্যার পর '৭৬-এ যখন দল পুনর্গঠিত করার সুযোগ এলো, তখন মহিউদ্দীন আহমেদকে অস্থায়ী সভাপতি আর সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করে দল অগ্রসর হলো। আওয়ামী লীগ তখন নিষিদ্ধ।

এরপর '৭৭-এ সেনাশাসক জিয়াউর রহমান দরখাস্ত করে দলের অনুমোদন দিতে আরম্ভ করেন। যেহেতু আওয়ামী লীগ কোনো গুপ্ত সংগঠন নয়, নিয়মতান্ত্রিক দল তথা কনস্টিটিউশনাল পার্টি, সেহেতু অবৈধ পন্থায় দাবি আদায়ের দৃষ্টান্ত দলের ইতিহাসে নেই। সুতরাং আওয়ামী লীগকে চিরাচরিত সাংবিধানিক পথেই এগোতে হয়েছিল। অনেক ষড়যন্ত্র করেছেন জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দিতে বলেছেন। দলীয় গঠনতন্ত্র থেকে মূলনীতিগুলো পরিবর্তন করতে বলেছেন। কিন্তু নেতৃবৃন্দ বাদ দেননি।

'৭৭-এ জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে সুন্দর একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। তারপর '৭৮-এ যখন আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়, তখন সংগ্রামী জননেতা আবদুল মালেক উকিল সভাপতি, রাজ্জাক ভাই সাধারণ সম্পাদক এবং আমি সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হই। '৭৮-এর ১২ এপ্রিল কারাগার থেকে বেরিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শুরু করি। রাজ্জাক ভাই, আমি এবং অন্য নেতৃবৃন্দ যেমন- আবদুল মান্নান, আবদুল মোমিন, মহিউদ্দীন আহমেদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ প্রত্যেকেই দলকে পুনঃসংগঠিত করতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেছেন। শেখ আবদুল আজিজ, আবদুস সামাদ আজাদ থেকে শুরু করে যারা বরেণ্য নেতৃবৃন্দ তারা তখন কারাগারে। যারা বাইরে ছিলেন সকলেই দলকে সংগঠিত করতে কাজ করেছেন।

কারামুক্ত হওয়ার পর আমি ও রাজ্জাক ভাই, মালেক উকিল সাহেবকে সামনে রেখে সংগঠনকে তৃণমূল থেকে মজবুত ও চাঙ্গা করার চেষ্টা করি। '৭৫-এর ২০ আগস্ট অবৈধ প্রক্লেমেশন জারি করে, সংবিধান স্থগিত করে খুনি মোশতাক বাণিজ্যমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি বনে গিয়েছিলেন। অথচ ক্ষমতাসীন হওয়ার আগ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মাত্র। সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপ্রধানের অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি, সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি তখনও বর্তমান। এতদসত্ত্বেও নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে খুন করে, সাংবিধানিক পন্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সীমাহীন মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে খুনিচক্র রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ ছিল 'রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতি' সম্পর্কিত। অনুচ্ছেদ ৪৮-এ বলা হয়েছিল, 'বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত হইবেন।'

যেহেতু খুনিচক্রের হোতা খন্দকার মোশতাক জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নন, বরং অস্ত্রের জোরে অবৈধপন্থায় বেআইনিভাবে তার আগমন। সুতরাং সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের যতটুকু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত ততটুকু স্থগিত করে দিল। স্থগিত করা হলো ৫৫ অনুচ্ছেদটি। এই অনুচ্ছেদে ছিল, 'অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি' শিরোনামে 'রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ক্ষেত্রমতো শূন্যপদে নির্বাচিত নতুন রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত উপ-রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতিরূপে কার্য করিবেন।' যেহেতু খুনি মোশতাক ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী, আর উপ-রাষ্ট্রপতি জীবিত ছিলেন বিধায় খুনি মোশতাকের পক্ষে রাষ্ট্রপতির পদে সমাসীন হওয়ার কোনো সাংবিধানিক সুযোগ না থাকায় সেটি স্থগিত হলো। তারপর ১৪৮ অনুচ্ছেদটি ছিল শপথ-সংক্রান্ত। রাষ্ট্রপতির শপথ-সংক্রান্ত সাংবিধানিক বিধিবিধানকে ভূলুণ্ঠিত করা হলো।

অন্যদিকে স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়া বিচারপতি সায়েমকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছিল স্রেফ বন্দুকের জোরে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী খুনিচক্রের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অসাংবিধানিক। খুনিচক্রের এই অবৈধ অবস্থানের মধ্যেই নিহিত ছিল আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংগঠিত করার অমোঘ মন্ত্র। আমাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে নানা মহল থেকে ষড়যন্ত্র আর ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করা হয়। মিজানুর রহমান চৌধুরী নির্বাচনের আগে দল থেকে চলে গেলেন। যারা দলে ছিলেন অথচ ষড়যন্ত্র আর দল ভাঙনে তাল দিলেন না, সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিকে ধ্যান-জ্ঞান করলেন, তাদের ওপর নেমে এলো চরম নির্যাতন-নিপীড়ন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আমি ৩৩ মাস কারাগারে বন্দি ছিলাম। যখন মুক্তি পেলাম জিয়াউর রহমান তখন রাষ্ট্রপতি। আমরা তার সামরিক শাসনের মধ্যেই আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। এমনকি ঢাকায় ১৯৮০ সালে রাজশাহী কারাগারে জেলহত্যার বিরুদ্ধে আমরা যে হরতাল কর্মসূচি দিয়েছিলাম, সেই মিছিলে আমি আর রাজ্জাক ভাই নেতৃত্ব দিয়েছি। সামরিক সরকার মিছিলের ওপর ট্রাক চালিয়ে দিয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম।

জিয়াউর রহমান ছিলেন নীতিহীন স্বৈরশাসক। তিনি প্রকাশ্যে জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন 'I will make politics difficult for politicians' এবং এই নীতিহীন প্রচেষ্টায় তিনি সফল হয়েছেন। ক্ষমতা এবং নীতিহীনতা একত্রিত হলে কী হয়, সেদিন জিয়াউর রহমান তা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন! এরপর '৭৯-এ যে নির্বাচন হলো, আমি সেই নির্বাচনের বিরুদ্ধে ছিলাম। 'হ্যাঁ', 'না' ভোটের মাধ্যমে সেনাশাসক জিয়াউর রহমান যখন ৯৯ শতাংশ ভোট পক্ষে নিলেন, তখন আমরা শহীদ মিনারে শপথ নিয়েছিলাম, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের শাসনে আমরা নির্বাচন করব না। কারণ আমরা ইঙ্গিত পেয়েছিলাম এই নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না। সামরিক শাসনকে বৈধতা দিতে জেনারেল জিয়ার প্রয়োজন একটি রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট।

এই ঘৃণ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে রাজনীতিবিদদের বেচাকেনার সামগ্রীতে পরিণত করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে কলুষিত করতে জিয়াউর রহমান আরও ঘোষণা করেছিলেন, 'Money is no problem' এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দু'হাতে অর্থ ছড়িয়ে বহু রাজনীতিককে ক্রয় করে রাতারাতি তিনি বিএনপি নামক দল খাড়া করলেন। অর্থ দিয়ে রাজনীতিকদের ক্রয় করার অসাধু প্রক্রিয়ায় জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে আমার কাছে বিভিন্ন রকম অস্বস্তিকর প্রস্তাব আসতে লাগল। সেগুলো ছিল হীনস্বার্থ সংবলিত প্রস্তাব। সমস্ত প্রস্তাব আমি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি।

আমাকে বঙ্গভবনে নেওয়ার জন্য জিয়াউর রহমান বহু চেষ্টা করেছেন; কিন্তু আমি তার সঙ্গে কখনও দেখা করিনি। জিয়াউর রহমানের আমলে আমাদের ওপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। আমাদের মিছিল-মিটিংয়ে আক্রমণ হয়েছে। যখন জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এলেন তার আগ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে আমরা কত কষ্ট করেছি। প্রাণান্ত পরিশ্রম করে দলকে সংগঠিত করেছি, নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছি।

সংগ্রামের সেদিনগুলো পেরিয়ে আজ যখন দেখি গণমানুষের মধ্যে দলের সাংগঠনিক তৎপরতা কম, তখন আমার অতীত দিনের সেসব কথা মনে পড়ে যায়। সামরিক শাসনের মধ্যেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আমরা সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েছি। চরম দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও আমরা আপস করিনি।

'৭৫-এর পর চরম দুঃসময় তখন তো একটা করুণ অবস্থা। দেশজুড়ে হত্যা, গুম, গ্রেফতার আর ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা। অবর্ণনীয় করুণ অবস্থায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আমাদের কেটেছে। নিজের বাড়িতে থাকতে পারিনি। পাঠক ক্ষমা করবেন! নেহাত ব্যক্তিগত বিষয় বলছি। আসলে আমরা যারা জনকল্যাণের রাজনীতি করি, তাদের ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নেই। রাজনীতির সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবন একাকার হয়ে আছে।

আমি যখন কারাগারে, আমার স্ত্রীকে কেউ বাড়ি ভাড়া দেয়নি। তোফায়েল আহমেদের স্ত্রীকে বাড়ি ভাড়া দিলে আর্মি ধরে নিয়ে যাবে। আমার ভাগি্ন জামাই নজরুলের নামে বাড়ি ভাড়া নিয়ে পরিচয় গোপন করে মাসিক দেড় হাজার টাকা ভাড়ায় সেই বাড়িতে আমার স্ত্রী থেকেছেন। তিনি এক বছর ছিলেন কলাবাগানে। সেই বাসায় কোনো ফ্যান ছিল না। পরে এক এডিসির কল্যাণে তার আজিমপুরের বাসার দোতলায় তিনি আমার পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

আমি কারামুক্ত হয়ে ফিরে এলে তার সেই আজিমপুরের বাসায় আমাদের ঠাঁই হয়। তিনি বরিশালের এডিসি ছিলেন। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। সেই সময় করুণ অবস্থা গেছে আমার পরিবারের। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাত্র ২১,০০০ টাকা, স্ত্রীর নামে ৮,০০০ আর মেয়ের নামে ৪,০০০ টাকা ছিল। জিয়াউর রহমান এগুলো ফ্রিজ করেছেন। আমরা ওই টাকা তুলতে পারতাম না। তারপর আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দেওয়ার বহু রকম চেষ্টা করেছেন। কোনো দুর্নীতি আবিষ্কার করতে পারেননি। কোনো মামলা দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত কেরানীগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা বোরহানউদ্দীন গগনকে দলের সাংগঠনিক কাজ করার জন্য আমি সাধারণ একটা গাড়ি দিয়েছিলাম। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি সেই গাড়ি ফেরত দিয়েছিলেন। অথচ সেই গাড়ির জন্য আমার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

জিয়াউর রহমান সাংঘাতিকভাবে ক্ষিপ্ত ছিলেন আমার ওপর। কারণ তিনি অনেককে পাঠিয়েছেন আমার কাছে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য। আমি দেখা করিনি। আমার এই বনানীর বাড়ি, এই বাড়ির জমি বঙ্গবন্ধু আমাকে দিয়েছিলেন। '৭৫-এর ৩০ জুলাই বরাদ্দ করে দিলেন আমার স্ত্রীর নামে। ১৫ আগস্টের পর আমি কারাগারে। '৭৬-এ আমার স্ত্রী চিঠি পেলেন বরাদ্দকৃত প্লটের জন্য টাকা জমা দিতে হবে। আমার স্ত্রীর কাছে কোনো টাকা নেই। তখন তার ২৮ ভরি স্বর্ণ, যার থেকে ইতিমধ্যে ৪ ভরি বিক্রি করে খেয়েছেন। আর ২৪ ভরি বন্ধক দিয়ে ভোলার সোনালী ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু প্রথম কিস্তি পরিশোধে লাগবে ১৭ হাজার টাকা। ১ লাখ টাকা করে বিঘা। এখানে জমির পরিমাণ ১২ কাঠা থেকে একটু কম। তাতে জমির দাম হয় ৫৯ হাজার টাকা। ১৩ হাজার টাকা জোগাড়ের পর ৪ হাজার টাকা দিয়েছিলেন রফিকুল্লাহ চৌধুরী।

আজকে যিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, তার বাবা। তিনি ৪ হাজার টাকা দিয়ে আমার স্ত্রীকে সাহায্য করার পর বাড়ির প্রথম কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হয়েছিল। আমার এপিএস ছিল শফিকুল ইসলাম মিন্টু। আমি তাকে চাকরি দিয়েছিলাম ১৯৭৩ সালে। ১৫ আগস্টের পর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য খুনিচক্রের ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বে কতিপয় সেনাসদস্য তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় মিন্টুকে হত্যা করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়। তার মৃতদেহটি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমার মেজো ভাইকে '৭৫-এর ৫ অক্টোবর গুলি করে হত্যা করা হয়। গ্রামের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে তাকে হত্যা করে সর্বহারা পার্টির লোকেরা। আমার বড় ভাই '৭৫-এর ১১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। আমি তখন ময়মনসিংহ কারাগারে। এক ছেলে কারাগারে, দুই ছেলে নেই। আমার মায়ের তখন কী ভয়াবহ আর করুণ অবস্থা! আমার ঢাকার বাসায় তখন বড় ভাইয়ের ছেলে টুটুল, বড় ভাইয়ের মেয়ে রোকেয়া, সেজো ভাইয়ের ছেলে মিলন, আরেক ছেলে খোকন, মেজো ভাইয়ের মেয়ে রুজু থাকে। তারা কেউ পড়ে স্কুলে, কেউবা কলেজে।

আমি যখন বঙ্গবন্ধুর পলিটিক্যাল সেক্রেটারি তখন আমার দুই ভাইয়ের দুই মেয়ে ও এক বোনের মেয়ে এই তিনজনকে আমি ইডেন কলেজে ভর্তি করিয়ে দিই। ওরা আমার বাড়িতে থেকেই ম্যাট্রিক পাস করে। এরা তিনজন আমার বাসায় থাকে। আমার মেজো ভাইয়ের ছেলে রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলে পড়ে, সে আমার বাসায় থাকে। তার আরেক ভাই খোকন সে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরিতে পড়ে। মেজো ভাইয়ের মেয়ে রুজু সে উদয়নে পড়ে। আমার স্ত্রীর ভাই হুমায়ুন, আমার বাসায় থাকে। এতগুলো ছেলেমেয়ে আর পরিবারের সদস্য নিয়ে আমার স্ত্রীর সংসার পরিচালনা করার সামর্থ্য ছিল না। আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে মাসে তিন হাজার টাকা পাঠাতেন। আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী মজু ভাই তিনি প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা দিতেন। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তার বেহেশত কামনা করি।

আমার এক বন্ধু হামিদ, যে চাকরির বেতনের টাকা থেকে আমার স্ত্রীকে অর্থ সাহায্য করতেন। এভাবে প্রাপ্ত সর্বমোট সাত হাজার টাকা, যার মধ্যে দেড় হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া দিয়ে বাকি সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় আমার স্ত্রী সংসার নির্বাহ করতেন। আমার বাসায় কোনো ফ্যান বা তেমন কোনো আসবাবপত্র ছিল না। আমি তো সরকারি বাসভবনে ছিলাম। আমার গ্রেফতারের পর যেদিন আমার স্ত্রী বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান সেদিন তো তার কিছুই নেই, কপর্দকশূন্য। একটা খাট আর আলমিরা ছিল। ছেলেমেয়েগুলো ফ্লোরিং করত। আমি যে বাড়িটাতে ছিলাম সেটা ছিল পরিত্যক্ত বাড়ি। গভর্নমেন্টের বাড়ি। ধানমণ্ডির তিন নম্বর রোডে বর্তমান আওয়ামী লীগ অফিসের পাশের বাড়িটা। এখন সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান থাকেন। এই বাড়ি প্রথমে বরাদ্দ দিয়েছিল 'তোফায়েল আহমেদ, পলিটিক্যাল সেক্রেটারি টু প্রাইম মিনিস্টার' অর্থাৎ আমার নামে। তখন আমার বয়স বত্রিশ। এই অল্প বয়সে আমি চিন্তা করি আমার নামে বরাদ্দপত্র দেবে কেন? তাহলে তো এটা মনে করার অবকাশ থাকবে যে এটা আমার বাড়ি। তখন আমি আমার নাম বাদ দিয়ে বরাদ্দপত্র সংশোধন করে 'অ্যালোটেড টু পলিটিক্যাল সেক্রেটারি টু দি প্রাইম মিনিস্টার' লেখার নির্দেশ দেই।

পরবর্তীকালে এই বাড়ির জন্যই জিয়াউর রহমান আমার নামে এই মর্মে মামলা দিয়েছিলেন যে, এই বাড়ি আমি দখল করেছি। যখন আদালত বিশদে কাগজপত্র বিশ্লেষণ করল তখন প্রমাণিত হলো যে, বাড়িটি 'পলিটিক্যাল সেক্রেটারি টু দি প্রাইম মিনিস্টার'-এর নামে অ্যালোটেড। ফলে মামলা বাতিল হলো। এভাবে একের পর এক মামলা দিয়ে আমাকে হেনস্তা করা হয়।

এই অবস্থার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে আমরা সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে আমাদের মূল দলসহ সব সহযোগী সংগঠনকে শক্তিশালী করে নিজেদের মধ্যে সব ভেদাভেদ ভুলে কেবল দলকেই ধ্যান-জ্ঞান করে, দলীয় ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতে আওয়ামী লীগের পতাকা তুলে দিয়েছি। তিনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হয়ে দলের সেই পতাকা গৌরবের সঙ্গে সমুন্নত রেখেছেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হওয়ার পর আমরা তাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করে যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই সর্বস্তরের গণমানুষের সমর্থন পেয়েছি। ব্যাপক গণসমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে কাজ করেছে সংবিধান ও সত্যের কাছে আমাদের অঙ্গীকার ও দৃঢ় মনোবল, যা গড়ে উঠেছিল ঊনসত্তর আর একাত্তরের মহত্তর চেতনায় তথা বঙ্গবন্ধুর চেতনার ভিত্তিতে যে চেতনার ধারক-বাহক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

'৭৫-এর মর্মন্তুদ ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে শির সমুন্নত রাখার সাহসী অভিযাত্রায় এটা প্রমাণিত সত্য যে, আওয়ামী লীগ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চেতনার সফল ও সার্থক উত্তরাধিকার।

তোফায়েল আহমেদ : বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য

তোফায়েল আহমেদ
apps