• শনিবার, ২৬ মে ২০১৮, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
  • ||

কুকের পাশে আমাদের জাবেদ ওমর গুল্লু

প্রকাশ:  ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:১২
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রিন্ট
আগে একসময় দেশসেরা ওপেনার ছিলেন জাভেদ ওমর।বাংলাদেশের হয়ে একমাত্র এবং বিশ্বের ৪১তম রেকর্ডে সেইদিন ভাগ বসিয়েছিলেন জাভেদ ওমর।৭৭ মিনিট উইকেটে থেকে ৮৫ রানে অপরাজিত থেকেই মাঠ ছেড়েছিলেন।বাকি সতীর্থ সব আউট হয়ে গিয়েছিলেন একে একে।

অ্যালিস্টার কুকের ২৪৪ রানের সেই ইনিংস আবারও স্মৃতিকাতর করে তুলল জাভেদ ওমর।তিনি ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন ১৬ বছর আগের এক দুপুরে।জিম্বাবুয়ের বুলাওয়েতে জীবনের প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেই অনন্য এক রেকর্ডে নাম লেখেন। টেস্ট ইতিহাসে ৪১তম বার ইনিংসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং করেছিলেন তিনি। ২৭৭ মিনিট উইকেটে থেকে ৮৫ রানে অপরাজিত থেকেই মাঠ ছাড়েন।একে একে বাকি সব আউট হয়ে গিয়েছিলেন ।

টেস্ট ইতিহাসে ৪৮ জন ব্যাটসম্যান ৫২ বার এই কীর্তির সাক্ষী হয়েছেন।এর মধ্যে জাভেদ আরও বিরল তালিকায় চলে যাচ্ছেন।টেস্টের পাশাপাশি ওয়ানডেতেও তিনি ব্যাট ক্যারি করেছিলেন একবার।টেস্ট ও ওয়ানডে দুই ধরনের ক্রিকেটেই ইনিংসে ব্যাটিং করার কীর্তি জাভেদ ছাড়া আরও আছে গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার, অ্যালেক স্টুয়ার্ট ও সাঈদ আনোয়ারের।জাভেদ আরও আলাদা হয়ে যাচ্ছেন এ কারণে, তাঁর দুবার ব্যাট ক্যারি করার ঘটনা ঘটেছিল একই সফরে, ১০ দিনের ব্যবধানে। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিতে ব্যাট করার কীর্তি আছে ক্রিস গেইলের। গেইল টি-টোয়েন্টিতে ব্যাট ক্যারি করা একমাত্র ব্যাটসম্যান। ওপেন করতে নেমে বাকি সব সতীর্থ অলআউট হয়ে গেলেও গেইল অপরাজিত ছিলেন ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।

বাংলাদেশের সাবেক এই ওপেনার ক্রিকেট ছাড়ার এত দিন পরও তৃপ্তি খুঁজে পান এই অর্জনে, ‘খুব ভালো লাগে। মনে হয়, দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলে আমারও কিছু অর্জন আছে। এই অর্জনগুলো একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়।’ কথাগুলো বললেন দেশের হয়ে ৪০ টেস্ট আর ৫৯ ওয়ানডে খেলা এই ক্রিকেটার।

২০০১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের জিম্বাবুয়ে সফরটি ছিল যেকোনো বিচারেই অনেক চ্যালেঞ্জের। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর বিদেশের মাটিতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিরিজ ছিল। ভিন্ন পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়ে খেলার বিষয়টিই ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য বড় ব্যাপার। জিম্বাবুয়ে দলটাও তখন ছিল খুবই শক্তিশালী। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, হিথ স্ট্রিক, অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল কিংবা গাই হুইটালরা ছিলেন জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা প্রজন্মের প্রতিনিধি।

এমন একটা সফরেই নিজেকে মেলে ধরেছিলেন জাভেদ। বুলাওয়ের প্রথম টেস্টে ৬২ আর অপরাজিত ৮৫ রানের পর হারারেতে পরের টেস্টের প্রথম ইনিংসেই কেবল ব্যর্থ হয়েছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ রানের জন্য ফিফটি পেলেন না। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা ঠিকই উতরেছিলেন জাভেদ, ‘দলের জন্য তো চ্যালেঞ্জ ছিলই। আমার নিজেকে প্রমাণেরও একটা বিষয় ছিল। অভিষেক টেস্টটা খেলতে না পারার দুঃখ বয়ে বেড়াচ্ছিলাম। বুলাওয়েতে প্রথম টেস্টে ফিফটি করে নিজেকে যেন ফিরে পেলাম। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৫ রানে অপরাজিত থেকে ব্যাট ক্যারি করলাম। ম্যাচটা আমরা হেরে না গেলে তৃপ্তিটা পুরোপুরি পেতাম। কিন্তু তারপরও ইনিংসটা অনেক সাহস জুগিয়েছিল।’

কুকের ইনিংসটার পর সেই দিনটির কথা খুব করেই মনে পড়ছিল জাভেদের, ‘কুকের ইনিংসটার সঙ্গে হয়তো আমারটার কোনো তুলনাই হয় না। কিন্তু নিজেরটা তো মনে পড়েছেই। কুক ২৪৪ রান করে ব্যাট ক্যারি করেছিল, আমি ৮৫ করে ব্যাট ক্যারি করেছিলাম। কিন্তু তৃপ্তিটা এখানে একই তালিকায় আমরা দুজনেই আছি। ক্রিকেট খেলে এগুলোই তো অর্জন।’

জাভেদের প্রিয় টেস্ট ইনিংস অবশ্য বুলাওয়েরটি নয়। এমনকি পাকিস্তানের বিপক্ষে পেশোয়ারে ক্যারিয়ারের একমাত্র সেঞ্চুরিটিও নয়। তাঁর প্রিয় ৪৩ রানের একটি ইনিংস। ২০০৫ সালে ঢাকায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই জাভেদের সেই ৪৩ রান যে খুব একটা অর্জনের অংশ হয়ে আছে। সে ইনিংসটি খেলে আরও একটি রেকর্ডও নিজের করেছিলেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটের এত দীর্ঘ ইতিহাসে কমপক্ষে ৩৪০ মিনিট ব্যাটিং করার পরও ফিফটি না-করার ইনিংস ছিল একটিই। ৩৪০ মিনিট ব্যাটিং করে ৪৩ করেছিলেন জাভেদ। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স সেই রেকর্ড ভেঙেছিলেন ভারতের বিপক্ষে ৩৪৫ মিনিট ব্যাটিং করে ওই ৪৩ রানই করে।

এই ইনিংসটির মাহাত্ম্যই অন্য রকম জাভেদের কাছে, ‘চট্টগ্রামে আমরা প্রথম টেস্ট জয় পেলাম। কিন্তু ঢাকার দ্বিতীয় টেস্টে পড়ে গেলাম কঠিন পরিস্থিতিতে।’ জিম্বাবুয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ বাঁচানোই কঠিন করে দিল বাংলাদেশের। ১৫০ ওভারের মতো ব্যাটিং করে পার করতে পারলেই কেবল টেস্টটা ড্র হতো; প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজে জয়ের গৌরব ছুঁতে পারত হাবিবুল বাশারের বাংলাদেশ। জাভেদ আর নাফিস ইকবালের ওপেনিং জুটি ব্যাটিং করেছিল ৮৬ ওভারের মতো, সে সময়ের বিচারে যা রীতিমতো অভাবনীয় ব্যাপার। জাভেদ ৪৩ রান করলেও নাফিস দারুণ এক সেঞ্চুরি করেছিলেন।

জাভেদ ফিরে যান আজ থেকে ১৩ বছর আগে জানুয়ারির সেই শীতল দিনটিতে, ‘ম্যাচ বাঁচাতে হলে ১৫০ ওভার কাটিয়ে দিয়ে আসতে হবে। সহজভাবে বললে, কাজটা ছিল অনেক কঠিন। আমাদের কোনো ব্যাটসম্যানেরই এত সময় ধরে ব্যাটিং করার অভ্যাস ছিল না। কিন্তু আমরা পেরেছিলাম। নাফিস তো দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিই করে বসল। আমার লক্ষ্য ছিল আউট হব না। কিন্তু আবার একেবারে গুটিয়ে গেলেও চলবে না। মোট কথা, মাটি কামড়ে থেকে পাল্টা আক্রমণ করতে হবে। এই ইনিংসে ৪৩ রান অনেক গুরুত্বের। সেই ইনিংস বাংলাদেশকে প্রথম টেস্ট সিরিজ জিততে সহায়তা করেছিল। ক্রিকেটের এগিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ ছিল সেটি। সেখানে আমার একটা অবদান আছে। এই তৃপ্তি আমি আজীবন বয়ে বেড়াব।’ বুলাওয়েতে প্রথম টেস্টে ফিফটি করে নিজেকে যেন ফিরে পেলাম। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৫ রানে অপরাজিত থেকে ব্যাট ক্যারি করলাম। ম্যাচটা আমরা হেরে না গেলে তৃপ্তিটা পুরোপুরি পেতাম। কিন্তু তারপরও ইনিংসটা অনেক সাহস জুগিয়েছিল। ’

/সম্রাট

নতুন বছরে টাইগারদের যত খেলা