• বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫
  • ||

একজন অবহেলিত কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমান

প্রকাশ:  ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১২:৩৮
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রিন্ট

‘ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায় রে’, ‘কারো মনে তুমি দিও না আঘাত, সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে’, ‘আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা, নাই বা তুমি এলে’, ‘পৃথিবীর এই পান্থশালায়, হায় পথ ভোলা কবি’, ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি’, ‘বুঝি না মন যে দোলে বাঁশিরও সুরে’, ‘দেখ ভেবে তুই মন, আপন চেয়ে পর ভালো’, ‘পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমারই দেশ ভাই রে’ এমন প্রায় ৩ হাজারের অধিক গানের রচয়িতা

কবি আজিজুর রহমান। তার জনপ্রিয় গানগুলো এক সময় ছিলো মানুষের মুখে মুখে।

সেই একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি এবং গীতিকার আজিজুর রহমানের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘একুশে পদক’ প্রাপ্ত কবি আজিজুর রহমানের মৃত্যুর ৪০ বছর পেরিয়েও সরকারিভাবে তার স্মৃতি সংরক্ষণ ও স্মৃতিচারণে নেয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। এদিকে কবির মৃত্যুবাষির্কী উপলক্ষে তার জন্মভূমি হাটশ হরিপুরে আজিজুর রহমান সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে বুধবার(১২ সেপ্টেম্বর) সকালে তার সমাধিস্থলে পুষ্প অর্পণ করে আজিজুর রহমান সাহিত্য পরিষদ।

একুশে পদকধারী কবি, গীতিকার ও বেতার ব্যক্তিত্ব আজিজুর রহমান ১৯১৪ সালের ১৮ অক্টোবর কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বশির উদ্দিন প্রামানিক, মাতার নাম সবুরুন নেছা। গড়াই নদীর নৈসর্গিক সৌন্দর্য তাকে সব সময় মোহিত করে রাখত। ১৩ বছর বয়সে, ১৯২৭ সালে তিনি পিতাকে হারান। উচ্চশিক্ষা লাভের ভাগ্য না থাকলেও প্রবল ইচ্ছা ও অনুসন্ধিৎসার ফলে বহু বিষয়ক পুস্তকাদি স্বগৃহে পাঠ করে তিনি একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। সাহিত্যচর্চা শুরুর আগে নাটকে অভিনয়ে তার উৎসাহ ছিল বেশি। তিনি গড়ে তোলেন একটি নাট্যদল। নাট্যদলটি নাটক মঞ্চস্থ করত শিলাইদহের ঠাকুর বাড়িতে। এ কাজের জন্য সে সময় কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গণে তার সুনাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

সে কালের বিশিষ্ট অভিনেতা ধীরেন দত্ত, উপেশ ঠাকুরসহ বিভিন্ন নামিদামি অভিনেতারা অংশগ্রহণ করতেন তার নাট্যদলে। সমাজসেবায় কবি ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ। ১৯৩৪ সালে তিনি তার পিতামহ চাঁদ প্রামানিকের নামে হরিপুর গ্রামে গড়ে তোলেন চাঁদ স্মৃতি পাঠাগার। এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বইয়ের খোঁজে আসতেন এই পাঠাগারে। তার সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল প্রবল। তিনি একাধারে কুষ্টিয়া হাটশ হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়া (নদীয়া) ফুড কমিটির সেক্রেটারি, বেঞ্চ অ্যান্ড কোর্ট ডিভিশনের চেয়ারম্যান, কুষ্টিয়া জেলা বোর্ড ও ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্যের পদও অলঙ্কৃত করেছিলেন।

ছাত্র থাকা অবস্থায় মুসলিম ছাত্র আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছেন এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি প্রায় ৩০০-এর উপরে কবিতা রচনা করেছেন। তার মধ্যে নৈশনগরী, মহানগরী, সান্ধ্যশহর, ফেরিওয়ালা, ফুটপাত, তেরশপঞ্চাশ, সোয়ারীঘাটের সন্ধ্যা, বুড়িগঙ্গার তীরে, পহেলা আষাঢ়, ঢাকাই রজনী, মোয়াজ্জিন, পরানপিয়া, উলে­খযোগ্য।

এ কবিতাগুলো এক সময় নবযুগ, নবশক্তি, আনন্দবাজার পত্রিকা, শনিবারের চিঠি, সওগাত, মোহাম্মাদী, আজাদ, বুলবুল পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হতো। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা বেতারে প্রথমে অনিয়মিত এবং পরে নিয়মিতভাবে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারে চাকরীতে বহাল ছিলেন। ঢাকায় গিয়ে তিনি কবি ফররুখ আহমদের সহায়তায় বিভিন্ন শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকদের সাথে পরিচিত হন।

এসময় কবি ফররুখ আহমদ তাকে ঢাকা বেতারে নিয়ে যান। রাজধানীর বুকে, হারানো দিন, আগন্তুক প্রভৃতি ছায়াছবিতে তিনি গান রচনা করেছেন। প্রধানত গানের ফসলেই তার শিল্পের গোলা ভরেছে। অসুস্থ হয়ে পড়ায় ১৯৭৮ সালের পর কবির হাতে তেমন আর কলম ওঠেনি। একাকী বিছানায় শুয়ে দিন কেটেছে তার। সে সময় তিনি বিছানায় শুয়ে-শুয়ে লিখেছিলেন ‘পৃথিবীর এই পান্থশালায়, হায় পথ ভোলা কবি, জলের লেখায় বালুকাবেলায়, মিছে এঁকে গেলে ছবি’।

এটাই ছিল কবির লেখা শেষ গান। অর্থাভাবে চিকিৎসাও তার ভাগ্যে জোটেনি। ১৯৭৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কবি আজিজুর রহমান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় তাকে ভর্তি করা হয় তৎকালীন ঢাকার পিজি হাসপাতালে। এর ৩ দিনের পর ১২ সেপ্টেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। কবির জীবদ্দশায় তেমন কোনো সম্মাননা না পেলেও ১৯৭৯ সালে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘একুশে পদক’ লাভ করেন।

আজিজুর রহমান সাহিত্য পরিষদ এর সাধারণ সম্পাদক হাসিবুর রহমান রিজু জানান, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই কবির মৃত্যুবার্ষিকীতেও কোথাও তেমন কোনো কর্মসূচি চোখে পড়ে না। অথচ এই জনপ্রিয় গানগুলো আজ সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই কবির গানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়ার জন্য এবং প্রতিবছর সরকারিভাবে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে কবি আজিজুর রহমানের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালনের জোর দাবি জানাচ্ছি।

/পি.এস

কুষ্টিয়া,কবি