• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

ভেঙ্গেছে সাধুর হাট, ফিরছে যে যার আপন ঘরে

প্রকাশ:  ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:৫২
দেবাশীষ দত্ত, কুষ্টিয়া
প্রিন্ট

ভেঙেছে সাধুদের হাট । সাধুরা ফিরতে শুরু করেছে যে যার আপন ঘরে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া লালন আখড়াবাড়িতে আয়োজন তিন দিনের হলেও বাউল ভক্তদের প্রথাগত নিয়মে পুণ্যসেবার মধ্যে দিয়ে বুধবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে শেষ হয়েছে তিরোধান দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। তবে মেলা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।

দুর-দূরান্ত থেকে আসা বাউলরা নিজ নিজ আস্তানা ছেড়ে বিছানাপত্র গুছিয়ে রওনা হয়েছে অনেকেই। তবে যাওয়ার আগে আঁখড়া বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। গুরুকে বারবার প্রণাম ও নানা রকম ভক্তি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিদায় নেন শিষ্যরা। গুরু ভক্তি আর সিদ্ধ মন নিয়ে বিদায় নেয়ার সময় অনেক বাউল তাদের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। আবার দেখা হবে সাঁইজির উদাসী ডাকের টানে।

গুরু মহির শাহ জানান, সাঁইয়ের জীবদ্দশায় শুধূমাত্র তার ভক্ত আর শিষ্যদের নিয়ে উৎসব করতেন। সে নিময় মেনেই বাউলরা ভাটাই আসে উজানে ফিরে যায় যে যার আপন নিবাসে।

বুধবার দুপুরে তাঁরা মরা কালী গঙ্গায় গোসল সেরে মাছ-ভাত ও ত্রিব্যঞ্জন দিয়ে (তিন ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি তরকারি) পুণ্যসেবা গ্রহণ করেন।

পুণ্যসেবা গ্রহণকে কেন্দ্র করে দুপুর ১টা, লালন একাডেমীর প্রধান ফটক তখন বন্ধ। ভিতরে লাইন দিয়ে কলা পাতা সামনে নিয়ে হাজার হাজার সাধু ফকিরের অপেক্ষা। একটু পরেই একযোগে শুরু হলো খাবার বিতরণ। তবে কোন তাড়াহুড়ো নেই। সবাই খাবার পাবার পর বিশেষ আওয়াজ দিয়ে জানিয়ে দেয়া হলো বিতরণ শেষ। এবার খাওয়া শুরু হলো একযোগে। মাছ, ভাত ও সবজি দিয়ে প্রায় ৫ হাজার বাউল, সাধু ফকির পুর্ণসেবা গ্রহণ করেন।

প্রকৃত ভেকধারী বাউলরা সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যাপারে খোঁজ-খবরও রাখেন না। তাদেরকে মঞ্চে ডাকলেও তারা আসন ছেড়ে উঠেন না। ভোরে সূর্য ওঠার আগেই অহিংস মানবতা প্রতিষ্ঠায় আপন মোকামে গুরুর চরণ ছুয়ে দিক্ষা নিয়ে ভক্তি নিবেদন করে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে অনেক বাউল। লালন আঁখড়ার আশে পাশে ও একাডেমীর নিচে যারা আসন গাড়ে তারা সাঁইকে ভক্তি আর আরাধনায় নিমগ্ন থাকে কখনো স্থান ত্যাগ করেনা। বিছানাপত্র হাতে নিয়ে কথা বলেন গাজীপুরের বাউল গুর ইসাহক শাহ। প্রায় একযুগ বাড়িতে ফেরেন না তিনি। সংসার ধর্ম টানে না তাকে। বাড়ির কোন খবর রাখেন না। সারা বছর পথেই কেটে যায় এ ফকিরের। তবে মাঝে মধ্যে আসেন সাঁইজির ধামে। মনের তৃষ্ণা মেটাতে। পরিপূর্ণ হৃদয় নিয়ে ফিরেন ভবের বাজারে। তবে অনেক বাউল, সাধু আঁখড়া ছাড়লেও অনেকে গুরুর বাড়িতে থেকে যাবেন আরও কদিন।

বিদায় বেলায় লালন অনুসারীরা বলেন, সমাজ-ইতিহাসের ধারায় বিচার করলে বলা যায়, গ্রামবাংলার মানবতাবাদী মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন লালন ফকির। সামাজিক ভেদনীতি, শ্রেণি-বৈষম্য, বর্ণ, শোষণ, জাতপাতের কলহ ও সাম্প্রদায়িক বিরোধের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকন্ঠ। লালনের নাম আজ দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশে উচ্চারিত হয়। একজন গ্রাম্য নিরক্ষর সাধকের এ অর্জন ও প্রতিষ্ঠা স্বভাবতই বিস্ময় জাগায় মনে। মানুষের প্রতি মানুষের শোষণ-বঞ্চনা-অবিচারের চির অবসান কামনা করে সমাজ মনস্ক সাধক লালন শ্রেণীহীন শোষণমুক্ত এক মানবসমাজের স্বপ্ন দেখেছেন।

/পি.এস

কুষ্টিয়া,বাউল,ছেঁউড়িয়া,লালন
apps