• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
  • ||

প্রশাসনের হস্তক্ষেপেও বাল্যবিয়ে থেকে রক্ষা পেল না আঁখি

প্রকাশ:  ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ২১:১৪ | আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ২১:২৪
কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রিন্ট

১৩ বছরে পা দিলেন আঁখি আক্তার। পড়েন গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীতে। অন্য ৮-১০জন ছাত্র-ছাত্রীর মতো বিদ্যালয়ে এবং বাড়িতে তারও সময় কাটে দুষ্টুমি আর খেলাধুলায়। কিন্তু এই বয়সেই জোরপূর্বক বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে তাকে। যে বয়সে বিয়ে আর বর কি তা চেনাই দায়, সেই বয়সেই আজ রাতে বাসর ঘরে তাকে মুখোমুখি হতে হবে পঁয়ত্রিশ বছরের অর্ধযুবকের সাথে।

বিবাহ বন্ধনে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হস্তক্ষেপ করলে ধুর্ত পরিবার তাদেরকে বিবাহ না প্রদানে আশ্বস্থ করলেও ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই বিবাহ সম্পন্ন করে তাৎক্ষনিক জোরপূর্বক মেয়েকে স্বামীর সাথে শশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেয় পিতা মফিজুর রহমান।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে বসা আঁখি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শুভপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের মফিজুর রহমান হান্নাতের কন্যা এবং একই গ্রামের দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী। বিগত কয়েকদিন পূর্বে পাশ্ববর্তী পাশাকোট গ্রামের টুনু মিয়া ওরফে টুনু ড্রাইভারের ছেলে নুরুন নবী’র সাথে বিবাহের দিন-তারিখ সম্পন্ন করে দুই পরিবার।

নুরুন নবী সম্পর্কে আঁখির খালাত ভাই। বিয়ের ২দিন পূর্বে দুই বাড়িতেই বিয়ের গেইট সাজানো হয়। কিন্তু বাল্যবিয়ে প্রদানেরর্ ঘটনাটি প্রকাশ হওয়ায় সামাজিকভাবে বাঁধার সম্মুখিন হয় আঁখির পরিবার। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রাশেদা আখতার যোগাযোগ করলে আঁখির পরিবার তাদেরকে আশ্বস্থ করে জানায়, আঁখির বিয়ে দিবে না তারা। পরদিন বিয়ের গেইট খুলে ফেলে পরিবার এবং গোপনে বরপক্ষের সাথে সমঝোতা করে।

সমঝোতায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ১৮ (অক্টোবর) দুপুরে ‘আকদ’ অনুষ্ঠানের নামে মেহমানদারি ও খাওয়া-দাওয়া সম্পন্ন হবে মর্মে উভয় পক্ষ একমত পোষন করে। উভয় পক্ষের এ চালাকিও প্রকাশ হলে বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইউপি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান নিজে উপস্থিত থেকে কঠোর ভাবে আঁখির পরিবারকে নিষেধ করেন বিয়ে না দেওয়ার জন্য। তারা আবারো চালাকি করে বিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানায়। কিন্তু এদিন রাতের আলো নামতেই মেয়ের পিতা মফিজুর রহমান পাশ্ববর্তী শ্রীপুর ইউনিয়নের যশপুর গ্রামের হাফেজ রশিদকে বাড়তি অর্থ প্রদান করে আঁখি ও নুরুন নবীর বিবাহ সম্পন্ন করেন। তাৎক্ষণিক মেয়েকে সিএনজি যোগে পাঠিয়ে দেয় শশুরবাড়িতে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সমাজপতি ও রাজনীতিবীদ জানান, বারবার উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনকে ধোঁকায় ফেলে একটি শিশু মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে পিতা। তারা সমাজের লোকদেরও বিকেলে জানায় বিবাহ দিবে না। কিন্তু রাতের আলো নামতেই মেয়েটিবে গোপনে বিবাহ প্রদান করে সে। এসব ঘটনার উপর্যুক্ত শাস্তি না হলে আরও বাড়তে থাকবে বাল্যবিবাহ।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, আজ দুপুরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার স্যারের নির্দেশে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আমাকে ফোন করে বাল্যবিবাহ বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলে। আমি তাৎক্ষণিক আঁখির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করি। এসময় তারা আমাকে আশ্বস্থ করে বিবাহ প্রদান করবে না মর্মে। কিন্তু সন্ধ্যার পরপরই শুনতে পাই তারা অত্যন্ত গোপনে এবং অল্প সময়ে কালিমার মাধ্যমে মেয়েটিকে শশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে।

স্থানীয় ইউপি মেম্বার মোঃ আমান জানান, প্রশাসনের নির্দেশে বিকেল ইউপি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান মজুমদারসহ আমরা ঘটনাস্থল দুর্গাপুর গিয়ে বিবাহের সকল আয়োজন বন্ধ করি। এসময় বিয়ের প্যান্ডেলও খুলে ফেলি। পরিবারও আশ্বস্থ করে আমাদের বিয়ে দিবে না মর্মে।

এদিকে বাল্যবিয়ের বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিনহাজুর রহমানকে মুঠোফোনে সাংবাদিকেরা জানালে তিনি তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করেন এবং ইউপি চেয়ারম্যান ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।

ওএফ

apps