• সোমবার, ২২ জুলাই ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১
  • ||

গরীবের ডাক্তারের চিরবিদায়

প্রকাশ:  ১৬ এপ্রিল ২০২৩, ২০:২৫ | আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৩, ২০:৩৮
সানজিদা জান্নাত পিংকি

জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে গণস্বাস্থ্য। স্বাস্থ্যসেবার পথিকৃৎ এক কিংবদন্তির গল্পে মেশানো মহানুভবতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যে দেশের স্বাস্থ্যখাত সোনায় মোড়ানো সে দেশে গণস্বাস্থ্যের আকাশকুসুম এই ব্যবধান রূপকথার কোন গল্প নয়, জাদুকরের কোন ম্যাজিকও নয়! একজন কীর্তিমানের অনন্য দৃষ্টান্ত। জাতির সূর্য সন্তানের এই নির্দশন সবার মুখে মুখে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হলেও তাঁর কাছ এটা গণ মানুষের প্রতিষ্ঠান তাই এর নাম গণস্বাস্থ্য। সরকারী হাসপাতালগুলোতেও যে সেবা মিলে না সেটা মিলবে একজন বীর সেনানীর প্রতিষ্ঠিত্ব প্রতিষ্ঠানে। ছোড়া থেকে বুড়ো কে চেনে না গণ মানুষের এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে?

'গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র' নামের সূতিকাগার বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর দিকে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসে এফআরসিএস অধ্যয়নরত ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। চাইলেই সেখানে নিজের জীবন গড়ে নিতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের আহ্বান শুনে তিনি চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করে লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে আসেন। তারপর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। এরপরে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল নামে ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। যার ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি এই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের।

অন্যান্য দিনের থেকে সেদিনের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের রূপ ভিন্ন। সকাল থেকেই একটা থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে তরুণ থেকে বেড়ে উঠতে উঠতে নাড়ির টান তৈরী হয়েছিল জাফরুল্লাহ চৌধুরির, সেখানেই আজ তিনি এসেছেন নিথর লাশ হয়ে।

পরিবারের ইচ্ছায়ই তাকে আনা হয়েছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। যদিও জাফরুল্লাহর চাওয়া ছিল তার মরদেহ দেওয়া হবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার কাজে। কিন্তু এমন মহাপ্রাণের শরীরে ছুরিকাঁচি বসাতে রাজি হননি চিকিৎসকরা। অগত্যা তাকে আনা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাতেই সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসে জাফরুল্লাহর মরদেহ।

পরদিন বেলা দশটায় এই কিংবদন্তির লাশবাহী গাড়ি নেয়া হলো পিএইচএ মাঠে। শামিয়ানা টাঙিয়ে অতি যত্নে সাজানো হয়েছে শ্রদ্ধা নিবেদনের স্থান। মুহুর্তেই যেনো হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে শবগাড়ির চারপাশে। ভেতরে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন গণস্বাস্থ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা, নিভৃত গ্রামে আলো ছড়ানোর কারিগর ডা. জাফরুল্লাহ।

ফিসফিসিয়ে অনেকেই নিজেদের স্মৃতিচারণ করছেন। কেউ কেউ স্মরণ করছেন জাফরুল্লাহকে দেখার কথা। তার সঙ্গে সৃষ্টি হওয়া স্মৃতি। শোকবহিতে ঝরে পড়ছে ঝরে পড়া ফুলের সুবাশের বর্ণনা। কেউ কেউ লিখছেন বেদনার নীল কাব্য। কারো কারো চোখে মুখে গভীর শোকের ছাপ। কেউ কেউ আহাজারি করে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন।

কাজে কিংবা প্রাণের টানে জাফরুল্লাহ নিয়মিত এসেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। আজও এলেন তবে নিথর; প্রাণহীন। আগে যেখানে ফিরলে তার প্রাণস্পন্দনে উচ্ছ্বাস ছড়াতো। সেই প্রিয় মাটিতে জাফরুল্লাহর আগমনে সবার মধ্যে শোকের ছায়া। দল-মত নির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ফুলের স্তবক অর্পণ করে, নীরবে দাঁড়িয়ে তার প্রতি জানায় শ্রদ্ধা।

একে একে প্রিয় জাফরুল্লাহকে শেষ বারের মতো দেখতে সেখানে ভিড় জমান তার রণাঙ্গনের সহযোদ্ধা, দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা। জড়ো হন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, গণ বিশ্ববিদ্যালয়সহ জাফরুল্লাহর অনুরাগী স্থানীয় বাসিন্দারাও। ৫০ বছরের সম্পর্ক বলে কথা।

অনেকেরই হাতে ছিল ফুল। সকলেই তার প্রতি ফুল দিয়ে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে চান। শ্রদ্ধা জানিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বের হচ্ছিলেন জাফরুল্লাহর সঙ্গে দীর্ঘযাত্রার সঙ্গী হওয়া অনেকেই। অনেকের মুখেই তখন জায়গা করে নিয়েছে বিষণ্ণতা।

জাফরুল্লাহর হাত ধরেই নতুন জীবন পাওয়া র‍্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমন তখন কার্যত বাক্‌রুদ্ধ। কোনো মতে শুধু একটা কথাই বলতে পারলেন— ‘স্যার নেই... কিছুতেই মানতে পারছি না।'

এ দিন প্রায় দুই ঘণ্টা সেখানে রাখা হল তার মরদেহ। অনুষ্ঠিত হয় নামাজে জানাজা। এরপর কবরের জন্য নির্ধারিত জায়গায় নেওয়া হয় তাকে। তার শেষ যাত্রার মিছিলে যুক্ত হন শত শত মানুষ। কেউ নির্বাক, শোকস্তব্ধ।

অবশেষে কবরে নামানো হয় মরদেহ। পেছনে পড়ে থাকে তার প্রিয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। মাটি শুষে নেয় তার জন্য গড়িয়ে পড়া বহুজনের চোখের জল। এক জীবন মানুষের জন্য লড়ে যাওয়া জাফরুল্লাহর জন্য তখন আকাশ বাতাস যেন গাইছে ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।’

লেখা: শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close