Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৯, ৭ বৈশাখ ১৪২৬
  • ||

পুলিশ-আসামির সেলফি !

প্রকাশ:  ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০৩:০৩
বরিশাল প্রতিনিধি
প্রিন্ট icon
ছবি সংগ্রহ

বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বাধিক বিতর্কিত নেতা জাহিদুর রহমান মনির মোল্লা। বেশ কয়েকটি মাদক মামলায় জড়িয়ে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি। কিন্তু এই নেতা দীর্ঘদিন ধরেই বরিশাল পুলিশের চোখে পলাতক। আদালত দুটি মাদক মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালি মডেল থানা পুলিশ বলছে- তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

পুলিশের এমন প্রতিবেদন দেখে সর্বশেষ তার সন্ধান চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন বরিশাল অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে- বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুর রহমান মনির মোল্লা বরিশাল নগরীতেই অবস্থান করছেন। এমনকি তিনি পুলিশ প্রশাসনের আশেপাশেও থাকছেন। এই বিষয়টি নিয়ে বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গনে রীতিমত বিতর্কের ঝড় বইছে।

এরই মধ্যে পহেলা বৈশাখের দিন অর্থাৎ রোববার (১৪ এপ্রিল) বিকেলে মনির মোল্লা বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন ট্রাফিক সার্জেন্টের সাথে সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করলে সেই বিতর্ক আরও দ্বিগুণ মাত্রা পায়দ্বিগুণ মাত্রা পায়। এখন প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। দুটি মাদক মামলার পলাতক আসামি পুলিশ কর্মকর্তার সাথে সেলফি তোলার সাহস বা ক্ষমতা কোথায় পেলেন এই বিষয়টি নিয়েও নানা প্রশ্ন ডালপালা মেলেতে শুরু করেছে। তবে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এমন প্রশ্নের কোন উত্তর মিলছে না।

কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট হাসান বলছেন, আওয়ামী লীগ নেতা মনির মোল্লার বাসার সামনে রুপাতলী এলাকায় পহেলা বৈশাখের দিন ডিউটি পালন করেন। সেই সময় তিনি বাসা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের মুঠোফোনে সেলফি ধারণ করেন। এবং পরবর্তীতে সেলফি ছবিটি তার নিজস্ব ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেছেন। কিন্তু তিনি যে মাদক মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে দাবি করেন ওই সার্জেন্ট।

তবে রাজনৈতিক সমালোচকরা বলছেন, আলোচিত দুটি মাদক মামলার আসামির দীর্ঘদিন পলাতক থাকার বিষয়টিতে এমনিতেই পুলিশ ভাবমূর্তি সংকটে রয়েছে। কিন্তু সেই পলাতক আসামি যদি পুলিশের সাথে সেলফি তোলে এ বিষয়টি আসলেই উদ্বেগ বা আতঙ্কের আতঙ্কের। এমনকি এতে পুলিশের দায়িত্ব পালনে অপারগতার বিষয়টি প্রকাশ পায়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সাথে সখ্যতা থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

যদিও এর সরল ব্যখ্যা হচ্ছে- রুপাতলী এলাকার বাসিন্দা মনির মোল্লা একেতো প্রভাবশালী তার ওপরে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো একটি পদে অধিষ্ঠিত। যে কারণে আদালতের নির্দেশ সত্বেও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করছে না।

সূত্রমতে, ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর শহরের রুপাতলী এলাকার ওজোপাডিকোর ডাকবাংলোর একটি রুম থেকে ৭০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ডিবি পুলিশের এসআই দেলোয়ার হোসেন। এসময় খবর ছড়িয়ে পড়ে মনির মোল্লা ও তার সহযোগী পুলিশ কনস্টেবলসহ ৪ জনকে আটক করা হয়। কিন্তু ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে আটক করা হয়নি দাবি করে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। এমনকি একটি মামলাতেও মনির মোল্লাকে আসামি দেখানো হয়নি। তাছাড়া উদ্ধার ইয়াবার সংখ্যাও কমিয়ে দেখানো হয় এজাহারে। এ বিষয়টি নিয়ে তখন সংবাদকর্মীদের দৌড়ঝাপ ও পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক লেখালেখির কারণে বরিশালজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। ফলশ্রুতিতে প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে পড়েন পুলিশ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। কিন্তু কোন মহল থেকে এই বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খোলেননি।

পরবর্তীতে দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুলিশ সদস্যসহ তিন ব্যক্তিকে আদালতে প্রেরণ করলে বিচারকের কাছে তারা মনির মোল্লার সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরেন। এ নিয়ে বরিশাল পুলিশ প্রশাসন আরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। এমনকি বিষয়টি নিয়ে বরিশাল পুলিশের ইজ্জতেও টান পড়ে। তখন তৎকালীন পুলিশ কমিশনার এসএম রুহুল আমিন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে মাঠ পুলিশকে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে দেখার দায়িত্ব দেন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মো. জসিম উদ্দিনকে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা দীর্ঘ তদন্ত শেষে এক বছর পরে অর্থাৎ ২০১৮ সালের ২১ ডিসেম্বর দুটি মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করেন। এবং দুটি মামলার একটিতে মনির মোল্লাসহ ১১জন এবং অপরটিতেও মনির মোল্লাসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এই তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর উচ্চআদালত থেকে অন্তবর্তীকালীন জামিন নেন আওয়ামী লীগ নেতা মনির মোল্লা। পরবর্তীতে তার জামিনের মেয়াদ শেষ হলে হাজতবাসের আশঙ্কায় আদালতে হাজিরা দেননি। ফলে আদালত বেশ কয়েকটি ধার্য তারিখে তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশকে নির্দেশ দেন।

কিন্তু মনির মোল্লা প্রকাশ্যে এলাকায় অবস্থান করলেও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ আদালতকে বরারবই খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দেয়। যে বিষয়টি নিয়ে গত বছরের শেষ দিকে বরিশালের স্থানীয় একটি পত্রিকায় খবরও প্রকাশ করে। সেই সংবাদের পরে বেশ কিছুদিন বরিশাল ছেড়ে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট আদালতের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালের ২১ ডিসেম্বর দুটি মামলায় অভিযোগপত্রে মনির মোল্লাকে অভিযুক্ত করার পরে তিনি উচ্চআদালত থেকে অন্তবর্তীকালীন জামিনে মুক্তি নেন। কিন্তু সেই জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে তিনি আর আদালতে হাজির হননি। ফলশ্রুতিতে গত ৫ মার্চ বরিশাল অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাকে পলাতক আসামি দেখিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন।

এই নেতা ঘনিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছেন, মনির মোল্লার মামলা দুটি এখন চূড়ান্ত বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। যেকোন সময় এ দুটি মামলার রায় ঘোষণা করতে পারেন বিচারক। এতে তাঁর সাজাপ্রাপ্তির আশঙ্কা রয়েছে। পাশপাশি মামলা দুটি মাদক সংক্রান্ত হওয়ায় দলীয়ভাবেও তিনি কোন ধরণের সহায়তা বা সহযোগিতা পাচ্ছেন না। বরং এই মামলার কারণে বরিশাল মহানগর বা জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ বা ডাক সারির অনেক নেতা তার ওপর নাখোশ। ফলে দলীয় ফোরামে তিনি তেমন একটা সুবিধা না পেয়ে অনেকাংশে রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়েছেন।

কিন্তু মনির মোল্লার ওপর বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালি মডেল থানার ওসির সুনজর থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারে অগ্রসর হচ্ছে না। তা ছাড়া ওসির কাছ থেকে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে এই মাদক ব্যবসায়ি বিদেশ ভ্রমণও করেছে বলে দাবি সূত্রটির।

এক্ষেত্রে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগ নেতা কাজী মনিরুল ইসলামের ভাষ্য হচ্ছে, পরোয়ানা জারির পরেও আসামিকে গ্রেপ্তার না করা আদালতকে অবমানা করার মতো গুরুতর অপরাধ। এই অপরাধে আদালত সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের বিরুদ্ধে যে কোন সময় পদক্ষেপ নিতে পারেন। পাশাপাশি এই অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেকোন সময় মামলা নিতে পারে। এমনকি ওই কর্মকর্তাকে আটক করেও জিজ্ঞাসা করার সক্ষমতা দুদক রাখে বলে মনে করেন এই আইনবীদ।

তবে মাদক মামলার আসামি মনির মোল্লাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের কোন অনাগ্রহ নেই দাবি করে বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতায়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জাহিদুর রহমান মনির মোল্লা পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশ রুপাতলীস্থ বাসায় বেশ কয়েকবার হানা দিলেও পায়নি।

কিন্তু পলাতক আসামি কিভাবে পুলিশ সার্জেন্টের সাথে সেলফি তুললেন এমন কোন প্রশ্নের সদুত্তোর দিতে পারেননি ওসি।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের নবাগত কমিশনার মো. শাহাবুউদ্দিন খান বলেন, তিনি এখানে দায়িত্ব নিয়েছেন সবেমাত্র দুদিন। যে কারণে বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন।

তবে কোন পুলিশ কর্মকর্তা যদি আদালতের নির্দেশের পরেও আসামিকে গ্রেপ্তার করেননি এমন অভিযোগ পেলে অবশ্যই কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি মনির মোল্লার বিষয়টি সম্পর্কের খোঁজ-খবর নেয়া হবে।

পিবিডি/জিএম

বরিশাল,মহানগর আ. লীগের নেতা,পুলিশ,আসামির সেলফি
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত