Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • বৃহস্পতিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১১ মাঘ ১৪২৫
  • ||

প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সমীকরণে মালয়েশিয়া প্রবাসীরা

প্রকাশ:  ২২ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:২৯ | আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৮, ১২:২০
আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া
প্রিন্ট icon

প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সমীকরণে মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দেশটির ১৩টি প্রদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছেন এ রেমিটেন্স যোদ্ধারা। ছড়িয়ে আছে না বলে বলতে হয়, মালয়েশিয়াকে গঠনেই এসব প্রদেশে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশের এ সারথিরা। কুয়ালালামপুরের টুইন টাওয়ার, এম আরটি, তুনরাজ্জাক একসচেন্জ, কেএল টাওয়ার, সানওয়ে পিরামিড,সাইবার জায়া, পোর্টক্লাং, পেনাংয়ের বাতুফিরিঙ্গি সৈকত, তেরেঙ্গানুর মসজিদ, মেলাকার মালয় রেস্তোরাঁ, পাহাঙ্গের চা বাগান, পেরাকের রাবার বাগান, লংকাউই দ্বীপ- কোথায় নেই বাংলাদেশিরা।

জীবিকা নির্বাহের তাগিদে বাংলাদেশিরা মালয়েশিয়ায় বসবাস করলেও তাদের ঘামের-পরিশ্রমের সুফল বেশ ভালোভাবেই নিচ্ছে ভারত মহাসাগরের এ দেশটি।

এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়ায় এসে আবার কেউ ফেরত গেছে- এমন ঘটনা বিরল। বাংলাদেশিরাও খুব কম সময়েই মালয় ভাষা ও সংস্কৃতি আয়ত্ব করে এখানে দিনাতিপাত করছেন, গড়ছেন দেশের অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ।

এতোসব ভালো খবরের মধ্যেও মাঝেমধ্যে কিছু খবর পীড়া দেয় বাংলাদেশিদের। সেখানে অবস্থানের কাগজপত্রের ব্যাপারে অসতর্কতা অথবা খানিক ভুল কিছু লোককে হয়রানি এমনকি শাস্তির মুখেও ফেলে দেয়। আবার কতিপয় অসাধু চক্রের অসৎ কর্মের কারণে পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিকেই অস্বস্তির মুখে পড়তে হয়।

সচেতন মহলের মতে, সচেতনতা না আসায় বাংলাদেশিদের এ অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে বারবার পড়তে হয়। মালয়েশিয়ায় অবৈধ বিদেশি কর্মীদের রি-হিয়ারিং ও ই-কাডের মাধ্যমে বৈধতার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। শেষ হয় চলতি বছরের আগস্ট মাসে। বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালয়েশিয়া সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন রাজাকের সঙ্গে টেলিফোনিক আলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা দিতে অনুরোধ করলে সেই অনুরোধের প্রেক্ষিতে শুরু বৈধ প্রক্রিয়া আর এ প্রক্রিয়া চলে আড়াই বছর। ৩ টি ভেন্ডরের মাধ্যমে বাংলাদেশি প্রায় সাড়ে ৫ লাখ নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে ২ লাখের বেশি ভিসা পেয়েছেন। আরো দেড় লাখের বেশি ভিসা প্রাপ্তির অপেক্ষায় রয়েছেন এবং এর মাঝে প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি কর্মী নাম ও বয়স জটিলতায় ভিসা পাননি।

এ ছাড়া প্রায় ১ লাখেরও বেশি কর্মী দালালদের খপ্পরে পড়ে ভিসা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। যারা বৈধতার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেননি তাদেরকে নাম মাত্র কম্পাউন্ড (জরিমানা) দিয়ে দেশে ফেরতের ব্যবস্থাও করেছিল দেশটির সরকার। আর এ প্রক্রিয়াও চলে আড়াই বছর । বর্তমানে মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ট্রাভেল পাস না নিলে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ স্পেশাল পাস ইস্যু করছে না । কারণ হিসেবে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন আড়াই বছর সুযোগ দেয়া হয়েছিল সে সুযোগ অনেকে কাজে লাগাতে পারেনি বিধায় মালয়েশিয়া প্রশাসন করা রোপ করেছে। হাইকমিশন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সাথে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে অবৈধদের দেশে ফেরত পাঠাতে। আর যারা রি-হিয়ারিং প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করেও দালালদের খপ্পরে পড়ে বৈধ হতে পারেননি তাদের বৈধ করে নিতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে হাইকমিশন বললেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় মহলে প্রচলিত আছে, অসাধু চক্রের অসৎ কর্মের ফলশ্রুতিতে সামগ্রিকভাবে হয়রানির শিকার হওয়া অনেক বাংলাদেশিকে এটিএম বুথ হিসেবেও বিবেচনা করে অনেকে। তারা খুব সহজেই বাংলাদেশিদের ভুলে মাশুল হিসেবে জরিমানা স্বরূপ বিরাট অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়।

এমনও অভিযোগ আছে, বাংলাদেশিদের বন্দি রেখে তাদের স্বদেশ থেকে অর্থ এনে তারপর মুক্তি দেয়া হয়। কোটিপতি হয়ে যাচ্ছে প্রতারক চক্র। প্রভাবশালী মহল থেকে শুরু করে আইনরক্ষাকারী বাহিনীর এই সিন্ডিকেটের বেড়াজালে পড়ে জীবন বাজি রেখে সর্বস্ব হারাচ্ছেন ভাগ্যান্বেষীরা। কখনো বা মারা পড়ছেন বেঘোরে। এজন্য দায়টা বেশি কাদের? বলা যায়, শ্রমিক আইন এবং সাধারণ নিয়ম-কানুনের অজ্ঞতার জন্যই এভাবে ভুগতে হচ্ছে বেশিরভাগ বাংলাদেশিদের। কারও কারও অসদুপায় অবলম্বনের কারণে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে যেতে হয় অনেককে।

এ বিষয়ে মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্তারা বলছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দূতাবাসের ফেইসবুক পেইজে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি ২৪ ঘন্টা প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার চালু রয়েছে। এ কল সেন্টারের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা হয়। এ ছাড়া বিগত রি-হিয়ারিং প্রোগ্রাম শুরুর দিকে লিফলেটের মাধ্যমে জানান দেওয়া হয়েছে যাতে করে দূতাবাসের পরামর্শ ছাড়া কেই যেন কারো সঙ্গে টাকা পয়সা লেনদেন না করতে। অবশ্য, সচেতনতা বৃদ্ধিতে কোনো সংগঠন না থাকলেও মালয়েশিয়া বাংলাদেশিদের রয়েছে সর্বাধিক রাজনৈতিক সংগঠন!

বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর দিক থেকে মালয়েশিয়ার বাংলাদেশিদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু তাদের সেই ভূমিকার গুরুত্বটা কথ্যই থেকে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর স্বল্প আয়ের মানুষের প্রধান টার্গেট হয়ে ওঠে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০১৬ সালে ১০টি এজেন্সির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা পুনরায় চালু হয়। তারা সরকারি প্রক্রিয়ায় (জিটুজি) এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখেরও বেশি শ্রমিক পাঠালেও ১০ সিন্ডিকেটের দুর্নীতির কারণে ফের বন্ধ হয়ে যায় শ্রম বাজারটি। তবে নতুন প্রক্রিয়ায় শ্রমবাজার খুলতে এখন সময়ের ব্যপার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যেসব বাংলাদেশি শ্রমিক আগে দুবাই, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরবে কাজ করতেন, তারা মালয়েশিয়া আসার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করেন। আর যারা আগে মালয়েশিয়ায় এসেছেন তারাও তাদের প্রতিবেশী আর স্বজনদের উৎসাহ দিচ্ছেন মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানোর।

দালালরা মাত্র ৪০ হাজার টাকায় মালয়েশিয়ায় পৌছে দিয়ে মাসে ২৫-৩০ হাজার টাকা আয়ের লোভ দেখায়। আর এই ফাঁদে একবার পড়লেই শেষ পর্যায়ে ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকায় ছাড় মেলে। প্রথমে ৪০ হাজার টাকা জমা রাখলেও পরবর্তীতে তাদের আটকে রেখে এ মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

যারা এই দালাল চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হয়, পরিশেষে তারাই তাদের এলাকার মানুষদের আবার ফাঁদে ফেলার সুযোগ নেয়। কারণ প্রতিটি মানুষের কাছ থেকেই একটি বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়। স্থায়ী দালালরা তাদের বলে যে, মাত্র ১০- ১৫ জনকে বাংলাদেশ থেকে আনতে পারলেই তারা কয়েক লক্ষ টাকা আয় করতে পারবে।

বাগের হাটের রিপন বিশ্বাস (২৭), মালয়েশিয়ায় ষ্টুডেন্ট ভিসায় যাওয়ার জন্য চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কুমিল্লা জেলার বি-পাড়া থানার শিদলাই গ্রামের দালাল সাইফুল ইসলাম (৩০) কে দিয়েছিলেন সাড়ে ৩ লাখ টাকা। দালাল সাইফুল রিপনকে ষ্টুডেন্ট ভিসার নাম করে ইন্দোনেশিয়ার জঙ্গল হয়ে মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসে রিপনকে। তখন আর রিপনের কিছু করার নেই। লেখা পড়াতো দূরে থাক রিপন অবৈধ ভাবে মালয়েশিয়া অবস্থান করছেন। দালাল সাইফুলকে কিছু বললেই হুমকি দেয় পুলিশে ধরিয়ে দিবে। এরই মাঝে রিপন হারিয়েছে তার মাকে। ছোট্ট-ছোট্ট দুটি ভাই বোন দেশে নানার বাড়িতে। রিপন এখন পাগল প্রায় ভাই-বোনের জন্য । রিপন এই মূহুর্তে ইচ্ছে করলেও সহসা দেশে যেতে পারছেনা মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনের কড়াকড়ির কারণে। রিপনের এ অবস্থার জন্য দায়িকে? অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের কয়েকটি জেলায় প্রতি গ্রামে নিয়োগ দেওয়া আছে দালালচক্রের কর্মীদের। বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ, ফেনী, নোয়াখালী, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার ছাড়াও বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন গ্রামে এজেন্টের মত এসব সংঘ কাজ করে থাকে। প্রতি বাংলাদেশিকে নৌকায় উঠাতে পারলেই ৪০-৫০ হাজার টাকা করে পায় তারা।

মালয়েশিয়ার পুলিশ অনেকবার দুর্নীতির জন্য সমালোচিত হয়েছে। একটি বড় মাপের দুর্নীতি সিন্ডিকেট কাজ করে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন পুলিশের হাত ধরে। পাচারের শিকার হওয়া বা অবৈধ কাউকে ধরলেও অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেবার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

মালয়েশিয়ার সচেতন প্রবাসীরা মনে করেন, সচেতনতামূলক প্রচারণা ও স্বদেশিদের মধ্যে পরোপকারের মানসিকতাই এই বারংবার ভুলের বৃত্ত থেকে বের করে আনতে পারে বাংলাদেশিদের।

/পি.এস

মালয়েশিয়া,প্রবাসী
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত