Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৬ ফাল্গুন ১৪২৫
  • ||

ঘোরের মধ্যে দেশ, কেয়ামতের আজাবে বিএনপি

প্রকাশ:  ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:১৩
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট icon

বহুল আলোচিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৮৮ আসনে বিশাল বিজয় অর্জন করে শপথ নিয়েছে। সরকার গঠন করেছে। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই বিশাল বিজয় অর্জনের পর এ নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো ও মোট চতুর্থবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বরাজনীতিতে নিজের নেতৃত্বকে আরও পাকাপোক্ত করেছেন। অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-জামায়াতনির্ভর রাজনৈতিক শক্তির ওপর সংবিধানপ্রণেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের করুণ ও অসহায় পরাজয়ের পর নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে এ নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত আটজন সংসদ সদস্য শপথ নেবেন না বলে ঐক্যফ্রন্ট জানিয়েছে। তিনজন বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র হিসেবে। অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের আসন ভাগাভাগিতে নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন বাতিল হওয়া সুমহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দোসর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর ২২ জন প্রার্থী ঐক্যফ্রন্টের প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করায় বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট আরেকবার বিতর্কের মুখে পড়েছে। ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, জামায়াতকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, এটা তিনি জানতেন না। এটা তাদের ভুল হয়েছে।

রাজনীতিতে সাধারণত কেউ ভুল স্বীকার করেন না। ড. কামাল হোসেন জানতেন না, এ কথাটিতে সংশয় থাকলেও তাঁর ভুল স্বীকারকে নানা মহল সাধুবাদ জানিয়েছে। নেতৃত্বহীন বিএনপি এখন আরেক দফা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গোটা দেশ একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। নির্বাচনে শেখ হাসিনার ইমেজ ও উন্নয়নের ওপর ভর করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর নির্ভর করে মহাজোট দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হবে এমনটাই নানা জনমত জরিপে বিশ্বাস করেছিলেন।

জয়ের ব্যাপারে সরকারি দল আশাবাদী ছিল, আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের এমন ভরাডুবি, যে ভরাডুবিতে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভোটযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এভাবে ধুলোয় মিশে যাবে, তা আশা করেনি; তেমনি বিএনপিও এই করুণ পরিণতির ফলাফল তাদের জন্য অপেক্ষা করছে, তা চিন্তায় আনেনি। তাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটবিরোধী জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতা-কর্মীরা রীতিমতো শোকস্তব্ধ। মহাজোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি ইতিমধ্যে সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা ও তাঁর ভাই জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় উপনেতা এবং জাপা মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করেছে। সরকারও এতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছে।

সরকার গঠনের বেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছেন। সেটি নিয়ে আগেও লিখেছি। কিন্তু রাজনীতির অঙ্গনে সেই আলোচনা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। দলের প্রবীণ অভিজ্ঞ নেতাদের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেননি। ঠাঁই দেননি তাঁর কোনো আত্মীয়স্বজনকে। এমনকি ১৪ দলের নেতাদেরও মন্ত্রিসভায় রাখেননি। গুণগত পরিবর্তনের দিক থেকে এটি বড় ধরনের ইঙ্গিতবহ বিষয়। এই তিন পক্ষেই অভিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ও যোগ্যতায় শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা মন্ত্রী হওয়ার দাবি রাখতেন। কিন্তু শেখ হাসিনা একদম নতুন মুখ মন্ত্রিসভায় তুলে এনেছেন। তিন-চার জন অভিজ্ঞ মন্ত্রীর সঙ্গে যাদের এনেছেন তার বেশির ভাগই চিন্তাই করেননি, এবার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাবেন। যাদের কাছে একটি মনোনয়ন লাভ ছিল বড় প্রাপ্তি, তারাই প্রথমবার এমপিই হননি, পূর্ণ মন্ত্রীও হয়েছেন। এমনকি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সাধারণত দলের প্রভাবশালী নেতাদের কাউকে করা হয়। যাঁরা তৃণমূল নেতা-কর্মী, এমপি ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। এখানে কুমিল্লার লাকসাম থেকে নির্বাচিত তাজুল ইসলামকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী করেছেন। তাজুল ইসলাম এবার নিয়ে তিনবার এমপি হয়েছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন। নিয়মিত টেলিভিশন টকশোর আলোচক ছিলেন। তৃণমূল উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে ঝুঁকিই নেননি, শেখ হাসিনা তাঁর নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নতুনদের ওপর তুলে দিয়েছেন। এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণের দায় এখন মন্ত্রীদের ওপর। দলের অভিজ্ঞ প্রবীণ নেতাদের যাঁরা মন্ত্রী হননি, তাঁরা সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হবেন। সংসদকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে পারবেন। ১৪ দলের শরিক নেতাদের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না নিয়ে তাদের জন্যও সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। এতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কার্যত জনসমর্থিত শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বিএনপি সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসতে না পারলেও জাতীয় পার্টি যদি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে এবং ১৪ দলের নেতারাও মন্ত্রিত্বের মোহ ত্যাগ করে বিবেকতাড়িত হয়ে যুক্তির কাছে নত হয়ে সংসদে কথা বলেন, তাহলে জাতীয় সংসদ তুমুল বিতর্ক, আলোচনা ও সরকারের জবাবদিহির কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বিগত পাঁচ বছর দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছেন। সংসদের কারও মাইক বন্ধ করেননি বলে এমপিরা তাঁর ওপর খুশি। উচ্চশিক্ষিত মেধাবী স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী হয়তো ৩০ তারিখ সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই আবার স্পিকার পুনর্নির্বাচিত হবেন। নিশ্চয়ই একটি প্রাণবন্ত সংসদ উপহার দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। পঞ্চম ও সপ্তম সংসদ রাজনৈতিক রিপোর্টার হিসেবে কভার করেছি। মরহুম স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী ও হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীর কথা কখনো ভুলতে পারি না। হুমায়ূন রশিদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর স্পিকার কার্যালয়ে সেদিন গিয়েছিলাম। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, এমপিদের জন্য অনেক কর্মশালার আয়োজনসহ নানা পরিকল্পনা তাঁর রয়েছে। এমপিদেরও পার্লামেন্টে আইনপ্রণেতা হিসেবে, পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে নিজেকে তৈরি করার স্বপ্ন ও মনের তাগিদ থেকে তৈরি করা প্রয়োজন।

আমাদের সংসদের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে অনেক তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান প্রয়াত হয়েছেন। তাদের দুর্দান্ত বিতর্ক, সেন্স অফ হিউমার এখনো রাজনীতিতে স্মৃতিকাতর মানুষকে স্মরণ করায়। তাদের সুনাম ও অবদানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা পোষণ করে মানুষ। একজন সংসদ সদস্যের সংসদ কার্যপ্রণালি বিধি, সংবিধান এবং পার্লামেন্টারিয়ানদের আত্মজীবনী বা তাদের বিতর্কের ধরন পাঠ করা উচিত।

সংসদের লাইব্রেরি অনেক সমৃদ্ধ। আমাদের রিপোর্টিং জীবনে সংসদ কভার করতে গিয়ে অনেক পার্লামেন্টারিয়ানের কাছ থেকে যেমন শিখেছি, তেমনি সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি ও সংবিধানের অনেক অনুচ্ছেদ প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। অনেক তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান ইন্তেকাল করেছেন, পরলোকগমন করেছেন। অনেক পার্লামেন্টারিয়ান সংসদে আসতে পারেননি। পঞ্চম সংসদে জ্বলে ওঠা পার্লামেন্টারিয়ান তোফায়েল আহমেদ এখনো মেধায়, দক্ষতায়, অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ রাজনীতিবিদ হিসেবে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন নিয়ে সংসদে আছেন। রাশেদ খান মেননের মতো পার্লামেন্টারিয়ানও আছেন। এঁদের সঙ্গে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের পার্লামেন্টারিয়ানদের এনে কর্মশালা করানো যায়। যেখানে আমাদের নির্বাচিত এমপিরা শিখতে পারেন। এমনকি সংসদ কভার করা পেশাদার রিপোর্টাররাও অংশগ্রহণ করতে পারেন।

সংসদ সদস্যদের কথা বলার সুযোগ স্পিকার শারমিন যখন দিচ্ছেন, তখন তাদেরও উচিত সুযোগকে কাজে লাগানো। নেতা-নেত্রী বন্দনা আর বিশেষণে বিশেষণে প্রাপ্ত সময় শেষ না করে বিষয়বস্তুর ওপর যুক্তিনির্ভর, অর্থবহ আলোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে সংসদ, মানুষ ও গণমাধ্যমের দৃষ্টিলাভের চেষ্টা করা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত আটজন প্রতিনিধিকেও সংসদে এসে গণতন্ত্রের স্বার্থে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি নির্বাচনের আগে গণভবনের দুয়ার খুলে হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে যেভাবে সংলাপের আয়োজন করেছিলেন, তেমনি সংলাপের উদ্যোগও নিয়েছেন। বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট এখন পর্যন্ত যাই বলুক না কেন, আমাদের বিশ্বাস তারা সংলাপেও যাবেন, নির্বাচিত সদস্যরা যত কমই হোন না কেন, সংসদে যাওয়ার সুযোগ নেবেন। নির্বাচন নিয়ে তাদের বক্তব্য ও দাবি তারা সংলাপ ও সংসদে মন খুলে বলবেন। বিএনপির রাজনৈতিক শক্তি এমন পর্যায়ে নেই যে, কালকেই সরকারবিরোধী গণআন্দোলন শুরু করে পরশু গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকারের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেবে।

সরকারের জন্য, সরকারি দলের জন্য এই ফলাফল যেমন বিচার-বিশ্লেষণ করে দায়িত্বশীল জায়গা থেকে নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ ও গণমানুষের আস্থা অর্জনের তাগিদ দেয়, তেমনি বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টকেও সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিচার-বিশ্লেষণ করে নিজেদের ভুল-ত্রুটি ও কর্মকা-ের পোস্টমর্টেম করে রাজনীতির রণকৌশল নির্ধারণের তাগিদ দেয়। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির সামনে যে কঠিন বাস্তবতা এসে দাঁড়িয়েছে বা যে চ্যালেঞ্জ দরজায় কড়া নাড়ছে, তা হচ্ছে এক যুগ ধরে একদিকে ক্ষমতার বাইরে থেকে নেতা-কর্মীদের নিপীড়নের মুখে পতিত হওয়া ও অন্যদিকে আন্দোলন বা নির্বাচনে সাফল্য অর্জন করতে না পারার হতাশার কালো গ্রাস দলের তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের ধরে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

এই নির্বাচনের পরও যদি বিএনপি মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতকে না ছেড়ে দলকে নতুনভাবে ঢেলে না সাজায়, তাহলে সেটি হবে আত্মঘাতী। বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছে আবেগ-অনুভূতি ও ঐক্যের প্রতীক হচ্ছেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। শারীরিকভাবে অসুস্থ খালেদা জিয়া এখন দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দী। তাঁর উত্তরাধিকার ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একুশের গ্রেনেড হামলায় যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্তই নন, লন্ডনে নির্বাসিতই নন, আইনের চোখে একজন পলাতক আসামি। বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও বিএনপির ভাগ্য একই সুতোয় বাঁধা পড়েছে। তারেক রহমান বিএনপির অ্যাসেট না বোঝা? লন্ডন থেকে তাঁর নির্দেশ বিএনপির জন্য কতটা সুখের বা সাফল্যের তা দলের নেতৃত্বকে বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সদ্য স্বাধীন দেশে তৃণমূল বিস্তৃত একমাত্র রাজনৈতিক দল ছিল এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ। পরিবার-পরিজনসহ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুতই করা হয়নি, কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যাই করা হয়নি, হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে হয় কারাদহন, নয় ভারতে নির্বাসিত জীবন দিয়েছিল। সেনাশাসক জিয়ার ক্ষমতার অন্দরমহল থেকে প্রতিষ্ঠিত তিন বছরের অতি ডান, অতি বামের সমন্বয়ে গঠিত বিএনপিকে প্রহসনের নির্বাচনে বিশাল ভোটে রাষ্ট্রপতিই নির্বাচিত করেনি, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন দিয়েছিল। আর একমাত্র দল আওয়ামী লীগকে ৩৯ আসন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সেদিন নেতৃত্বহীন অবস্থায় যদি সংসদে যেতে পারে তাহলে আজ বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট আটটি আসন নিয়ে সংসদে কেন যেতে পারবে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেদিন আওয়ামী লীগ যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দলের সর্বস্তরে সংগঠন গোছাতে নেতা-কর্মীদের নিয়ে সুসংগঠিতভাবে শ্রম দিতে পারে, তাহলে বিএনপিকে কেন শর্টকাট পথ ছেড়ে দলের সর্বস্তরে সংগঠন গোছানোর পরিকল্পনা নিতে দেখা যাবে না? খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যুকে সংসদের ভিতরে-বাইরে সামনে নিয়ে দল গোছানোর চ্যালেঞ্জ এখন বিএনপির জন্য অনেক বড়।

বিএনপি ডান-ঘেঁষা থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করেই তাদের সামনের পথ তৈরি করতে হলে ইতিহাসের মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করার পথ পরিহার করতে হবে। দেশে নতুন প্রজন্ম বা তারুণ্যের শক্তি যেমন মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় বিকশিত জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে, বিএনপিকে জনপ্রিয় হতে হলে সে বিষয়টি দলীয়ভাবে গ্রহণ করে অতীত ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। বিএনপির নেতৃবৃন্দ কি আদৌ আপাতত তারেক রহমানের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ও দুঃসময়কে মাথায় নিয়ে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে রণকৌশল নির্ধারণ করতে পারবে?

বিএনপির এখন দলের বর্ধিত সভা থেকে সর্বস্তরের সিরিজ বৈঠক করে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে দল গোছানো ও মানুষের কাছে যাওয়ার পথ খুঁজতে হবে। রাজনৈতিক আন্দোলন দেশে শক্তিশালী হয়ে দানা বাঁধবে এমন সম্ভাবনা পর্যবেক্ষকরা দেখছেন না। সময়ের জন্য অপেক্ষায় থেকে সামাজিক ইস্যু ও মানুষের জন্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সভা-সমাবেশের পথটি নিতে হবে।

বিএনপি এই নির্বাচনে আসার আগে গত পাঁচ বা ১০ বছরে উপজেলা, জেলা পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখার জন্য কার্যকর সভা-সমাবেশ করেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে গণজোয়ার তাদের সামনে দৃশ্যমান ছিল। সে নির্বাচন বর্জন ও পরবর্তী হঠকারী অবরোধ আন্দোলনের খেসারত পাঁচ বছরে দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আগেও নেতা-কর্মীদের হতাশ ও বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। বার বার বলেছে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ছাড়া শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে না। অন্যদিকে আন্দোলন দূরে থাক নেতা-কর্মীদের মামলার জাল থেকেও বের করতে পারেনি। মাঝখানে বেগম খালেদা জিয়া দ-িত হয়ে কারাগারে গেছেন। নির্বাচনে অযোগ্য হয়েছেন। তারেক রহমানসহ দলের অনেকেই একুশের গ্রেনেড হামলায় ফাঁসি থেকে যাবজ্জীবন হয়ে নানা মেয়াদে দ-িত হয়েছেন।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গড়লেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছিল অগোছালো, অসংগঠিত ও পরিকল্পনাহীন। ঐক্যফ্রন্ট জামায়াতকে যুক্ত করায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক চেতনার সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিজ দায়িত্বে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট বা নৌকায় সংগঠিতভাবে তুলে দিয়েছে। দেশের ব্যবসায়ী থেকে শিল্পী-সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক এমনকি তারুণ্যের নৌকায় ওঠার চিত্র দৃশ্যমান ছিল। আওয়ামী লীগ এবারের মতো পরিকল্পিত নির্বাচন অতীতে কখনো করেনি।

শেখ হাসিনার নির্বাচনী ইশতেহার নিজের তত্ত্বাবধানে করেছেন। ড. আবদুর রাজ্জাক, ড. মশিউর রহমান. ড. খলীকুজ্জমানরা এই ইশতেহার তৈরি করেছেন। যেখানে শেখ হাসিনা নিয়মিত তদারকি করেছেন। এটি সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি তিনবার গভীর মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছেন। তারপর সেটি হাতে নিয়ে সময় লিখেছেন রাত সাড়ে ১১টা। বুকলেট আকারে ছাপানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর ওবায়দুল কাদের মহাজোটের সঙ্গেই সমন্বয় করেননি, দলের টিমওয়ার্ক করে সারা দেশের নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করেছেন। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষই নয়, গণমাধ্যম কর্মী থেকে শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, কলাকুশলীদের সঙ্গে দফায় দফায় আনন্দঘন পরিবেশে মিলিত হয়েছেন। নির্বাচনী ট্রেনযাত্রাসহ সব মিলিয়ে গণজোয়ার দৃশ্যমান করেছেন।

আওয়ামী লীগের ডিজিটাল প্রচারণার কাছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপির প্রচারণা দাঁড়াতেই পারেনি। ‘জয় বাংলা, জিতবে এবার নৌকা’ এই গানের সঙ্গে শহর থেকে গ্রামের ছেলে-বুড়ো সবাই নেচে উঠেছে। দলীয় বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করেছে। শেখ হাসিনার ইমেজ ও উন্নয়নকে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ছড়িয়েছে। অন্যদিকে হতাশা-বিষাদগ্রস্ত নেতা-কর্মীদের সামনে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট শেখ হাসিনার বিকল্প দূরে থাক কাছাকাছি নেতৃত্বও দৃশ্যমান করতে পারেনি। বিএনপির ভোটদুর্গগুলো তছনছ হয়ে যায়। বিএনপির অনেক শক্তিশালী জনপ্রিয় প্রার্থীর পরাজয় বা প্রাপ্ত অল্প ভোট মানুষের মনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করলেও ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় আসবে এটি কেউ ভাবেনি, বিএনপির নেতা-কর্মীরাও নন। বিএনপির অনেকের ভাবটা এ রকম ছিল-ভোটের দিন ভোটাররা এসে নীরবে ধানের পক্ষে ব্যালট বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে। কিন্তু বিএনপি যে মাও সে তুংয়ের প্রতিষ্ঠিত চীনা কমিউনিস্ট পার্টি নয়, এটি বেমালুম ভুলে দায়সারা গোছের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে।

গ্রামের ভোটাররা শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও কৃষিতে সাফল্যের সুবিধা লাভের হাসি হেসে নৌকায় চড়েছে। এই ভোটের ফলাফল শাসক দলের নেতা-কর্মীদের, মন্ত্রী, এমপিদের যাতে উন্নাসিক না করে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অতিউৎসাহী না করে। সরকারের জন্য সেটি যেমন চ্যালেঞ্জের তেমনি দেশের মানুষকে বিস্ময়কর ভোটের ফলাফল থেকে, ঘোর থেকে মুক্ত করে নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ এবং সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে চলমান জিরো টলারেন্সের নীতিতে অটল থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠিন যুদ্ধে জয়ী হওয়াটা আরও বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে ৪৮ বছরে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের এমনকি সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতি বিষাক্ত ক্যান্সারের মতো ছড়িয়েছে। সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার কঠিন চ্যালেঞ্জে সরকারকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত হতে হবে, সেই চিন্তা মাথায় নিয়েই অগ্রসর হতে হবে।

অন্যদিকে বিএনপিকে কোনো হঠকারী পথ নয়, এই কঠিন চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দলকে রাজনীতিতে শক্তিশালী রূপে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে আনার কঠিন চ্যালেঞ্জটিই নিতে হবে। শক্তিশালী সরকারের পাশাপাশি শক্তিশালী বিরোধী দল গণতান্ত্রিক সমাজের চাহিদা। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াই কারাবন্দী নন, অসংখ্য নেতা-কর্মী মামলার জালে আটকা। সেখান থেকে নেতা-কর্মীদের মুক্ত করে দলকে সুসংগঠিত করতে সংসদের ভিতরে-বাইরে অবস্থান নিয়ে সমঝোতার পথটি রণকৌশলের অংশ হিসেবে নিতে হবে। ৩০ জন সদস্য থাকলেই সরগরম করা যায়, কথা বলা যায়, জনমত গঠন করা যায়, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, এটি সত্য নয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপি মহাসচিব হিসেবেই নন, একজন পরিশীলিত, মার্জিত সজ্জন মানুষ হিসেবে রাজনীতিতে নিজের ইমেজ তৈরি করতে পেরেছেন। সংসদে তিনি কথা বললে তাঁর গুরুত্ব গণমাধ্যম থেকে সরকারি দল এমনকি দেশের মানুষ উপেক্ষা করবে না।

সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে বা ধানের শীষ প্রতীকেই বিজয়ী হননি, আজন্ম আওয়ামী লীগার হিসেবে বঙ্গবন্ধুর মুজিবকোট ও তাঁর রাজনীতির স্লোগান তাঁর নির্বাচনী এলাকায়ই নয়, সিলেট বিভাগের দেশ-বিদেশে থাকা নেতা-কর্মীদের সহানুভূতি কুড়িয়েছে। কুলাউড়া আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা সুলতানকে ছাড়েননি। তাই তিনি ঝড়ের কবল থেকে উঠে এসেছেন। ঐক্যফ্রন্ট সংসদে না গেলে সুলতান মনসুরকে আওয়ামী লীগ নিয়ে গেলে কীইবা করার আছে? কারণ সুলতান মনসুর আজীবন আওয়ামী লীগ করেছেন। আওয়ামী লীগই করতে চেয়েছেন। ভোটযুদ্ধে দাঁড়িয়েও কালো মুজিবকোট যেমন ছাড়েননি, জয় বাংলা ও বঙ্গবন্ধু ভোলেননি।

বিএনপির জন্য এই নির্বাচন বা রাজনীতি কেয়ামতের আজাব হলেও এই চ্যালেঞ্জ দেশের সব নেতা-কর্মীকে নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে নিতে হবে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত