Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৯, ৭ বৈশাখ ১৪২৬
  • ||

জাহান্নামমুক্ত জাহালম, বিএনপি ভুলে গেছে খালেদা জেলে

প্রকাশ:  ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:১৮
পীর হাবিবুর রহমান
প্রিন্ট icon

এক.

একজন নিরপরাধ জাহালম এক হাজার ৯২ দিন কারাদহন ভোগের পর অবশেষে মুক্ত হলেন উচ্চ আদালতের নির্দেশে। সোনালী ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতির ২৬টি মামলা থেকেও অব্যাহতি দিয়ে গত রবিবার আদালত তাঁকে মুক্তির নির্দেশ দিলে মধ্য রাতে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্ত হন জাহালম। কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাকে বিনা বিচারে আটক রেখেছে। আমি দুদকের বিচার চাই। ক্ষতিপূরণ চাই।’ তিনি গণমাধ্যম, মানবাধিকার কমিশন ও উচ্চ আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে যাঁদের জন্য বিনা বিচারে জেলে আটক ছিলেন, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান জাহালম। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার দুবরিয়া গ্রামের টিনের ছোট্ট বাড়িতে গরিব জাহালম থাকতেন। ছিলেন পাটকল শ্রমিক। কিন্তু দুদকের নয়জন কর্মকর্তা সোনালী ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতির ২৬টি মামলার তদন্ত করে জাহালমের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিলেন। বিচারিক আদালতে এসব মামলার বিচারও শুরু হয়েছে। তবে গত বছর দুদকের নজরে আসে, এই ব্যক্তি প্রকৃত আসামি আবু সালেক নন, তিনি পাটকল শ্রমিক জাহালম। তবু তার জাহান্নামের জীবন থেকে মুক্তি হয়নি।

মহামান্য হাই কোর্ট শুনানিকালে পরিষ্কার জানতে চেয়েছেন, যেসব তদন্তকারী অভিযোগকালে জাহালমের নামে ভুলভাবে অভিযোগপত্র দিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে দুদক কী ব্যবস্থা নিয়েছে? আদালত একই সঙ্গে বলেছেন, দুদক একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সুষ্ঠু তদন্ত হলে, জাহালমের বিষয়টি এ পর্যন্ত আসত না। যাঁরাই এর সঙ্গে জড়িত, তাদের অভ্যন্তরীণভাবে চিহ্নিত করুন। নির্দোষ জানার পরও তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা না করায় আদালত সমালোচনা করে বলেন, জাহালমের ঘটনার জন্য দুদকের বা ব্যাংকের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকার জালিয়াতির অভিযোগে আবু সালেকের বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা হয়। এর মধ্যে ২৬টিতে জাহালমকে আসামি আবু সালেক চিহ্নিত করে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। এসব মামলায় ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জাহালম গ্রেফতার হন। এরপর থেকেই তিনি জেল খাটছেন। আদালতে হাজিরা দিয়ে চলেছেন। গত ৩০ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘স্যার আমি জাহালম, সালেক না’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি নজরে আনা হলে, হাই কোর্ট জাহালমের আটকাদেশ কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে জাহালমের গ্রেফতারের ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি, মামলার বাদী, দুদক কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্র সচিবের প্রতিনিধি ও আইন সচিবের প্রতিনিধিকে ৩ ফেব্রুয়ারি রবিবার সকালে আদালতে হাজির থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই প্রতিনিধিরা আদালতে হাজির হলে, আদালতে দুদকের আইনজীবী বলেন, জাহালমের বিরুদ্ধে ২৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। দুদকের নয়জন কর্মকর্তা মামলাগুলো তদন্ত করেছেন। বিচারিক আদালতে এসব মামলার বিচারও শুরু হয়েছে। তবে গত বছর দুদকের নজরে আসে, এই ব্যক্তি প্রকৃত আবু সালেক নন। তিনি পাটকল শ্রমিক জাহালম। দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম আরও জানান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি দুদককে জানানো হয়। দুদকের অধিকতর তদন্তে উঠে আসে জাহালম নির্দোষ। আসল অপরাধী আবু সালেকের ঠিকানা খুঁজে বের করা হয়। এরপর জাহালমের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য বিচারিক আদালতে আবেদন করে দুদক। এ সময় আদালত দুদকের আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, দুদকের ফলস ইনভেস্টিগেশনের বা মিথ্যা তদন্তের সুযোগ কোথায়? দুদকের আইনজীবী আদালতকে জানান, একজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, এই জাহালমই আবু সালেক। আদালত তখন বলেন, মানবাধিকার কমিশন গত বছর ২৪ মে দুদককে জানিয়ে দিল, জাহালম নির্দোষ। এরপর সাত থেকে আট মাস চলে গেল, আপনারা কী পদক্ষেপ নিলেন! একটা লোক লেখাপড়া জানেন না। একজন শ্রমিক নির্দোষ জানার পরও আপনারা ব্যর্থ হয়েছেন। আদালত আরও বলে, এখানে একটি সিন্ডিকেট আছে। এখানে কোনো জজমিয়া নাটক সাজানো হয়েছে কি না, জাহালমকে মিথ্যাভাবে মামলায় অভিযুক্ত করার জন্য আপনার অফিসের কেউ আছে কি না আমরা দেখতে চাই। দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। দুদকের আইনজীবী যতই বলেছেন, জাহালমের বিষয়টি যখনই আমাদের নজরে এসেছে, তখনই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। আদালত ততবার বলেছে, একটা নির্দোষ লোক যখন আপনারা বুঝতে পারলেন, তখন আপনারা কী করেছেন? এক দিনের জন্যও আপনারা তাকে রাখতে পারেন না। কেন আপনারা তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করলেন না?

যাক একজন হতদরিদ্র জাহালমের বিনা দোষে, বিনা অপরাধে তিন বছরের বেশি সময় কারাগার বা জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘটনায় তিনি নিজেই বুকভরে শ্বাস নেননি, গোটা দেশের মানুষ যেমন বিস্মিত হয়েছে, তেমনি আদালতের নির্দেশে মুক্তি দেওয়ায় স্বস্তি পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। দুদককে মানুষ একটি স্বাধীন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আস্থায় নিয়েছে এবং বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, এবার দেশে দুর্নীতি সহনীয় অবস্থায় আসবে। দেশজুড়ে সর্ব ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজ চক্রের লাগাম টেনে ধরা হবে, ঠিক তখন নির্দোষ জাহালমের তিন বছরের জাহান্নামবাসের ঘটনা প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রমাণ হয়েছে, মানুষের জন্য গণমাধ্যম। মজলুমের জন্য গণমাধ্যম দুর্বল হয়ে পড়েনি। মানুষের ন্যায় বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সমাজের আয়না হিসেবে গণমাধ্যম শক্তিশালী ভূমিকাই রাখছে।

হতদরিদ্র জাহালমকে মিথ্যা মামলায় জাহান্নাম বা কারাগারে বাস করানোর জন্য তাঁর দরিদ্র পরিবারকে আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়েছে। অর্থ খরচ করতে করতে নিঃস্ব হতে হয়েছে। মানুষের কাছ থেকে সুদে ঋণ করতে হয়েছে। আর মাঝখানে দরিদ্র জাহালমের জীবন থেকে তিনটি বছর বিনা অপরাধে বন্দীদশায় ঝরে গেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রকে এখন জাহালমকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। রাষ্ট্রের হয়ে দুদক বা সোনালী ব্যাংক এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাঁদের কারণে প্রকৃত আসামি আবু সালেককে আটক না করে ভুল তদন্তে জাহালমকে কারা জীবনের অন্তহীন যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছেÑ তাদের চিহ্নিত করে, তাদেরই বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

গোটা দেশ ও সমাজ অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রার পথে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়েছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো বাসাই বাঁধেনি, সমাজের সর্বস্তরে সুযোগসন্ধানী মতলববাজ, অসৎ সিন্ডিকেট নিজেদের অবস্থান দিনে দিনে সুসংহত করেছে। যেখানে অসহায় নিরপরাধ জাহালমরা জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করে। আর অন্যদিকে দুর্নীতিবাজ অসৎ শয়তানরা আইনের ঊর্ধ্বে উঠে বা সুষ্ঠু তদন্তের অভাবে কিংবা প্রভাবশালী মহলের ছায়ায় সমাজে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়, বুকভরে শ্বাস নেয়। এই অপরাধী চক্রকে যেমন ধরতে হবে, আইনের আওতায় আনতে হবে, তেমনি তাদের শক্তির ছায়া সরিয়ে দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সফল হয়েছেন। মাদকের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামে সাফল্যের মুকুট পরছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর ঘোষিত যুদ্ধ মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। তিনি দেশকে যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়েছেন, তেমনি দুর্নীতিবাজদের উল্লাস থামিয়ে দিতে পারবেনÑ এই আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেছেন।

দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ থেকে কমিশনার মোজ্জামেল হকের বর্ণাঢ্য সফল পরিচ্ছন্ন অতীত রয়েছে। তাঁদের প্রতি মানুষের অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস জন্মেছে।

শেখ হাসিনার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধে পরাজিত হওয়া যাবে না। বছরের পর বছর সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে জয়ী না হলে পরাজিত হবে দেশ। আর দুর্নীতিবাজদের উন্মত্ততা বেড়ে যাবে কয়েক সহস্র গুণ। জাহালমরা বিনা অপরাধে সংগ্রামমুখর জীবনের তিনটি বছর বিনা অপরাধে প্রতারিত হয়ে জেল খাটবে। আর অন্যদিকে ব্যাংক লুটেরা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটেরা এবং বিদেশে অর্থ পাচারকারীরা সব আইন ও বিধি-বিধানের ঊর্ধ্বে বহাল তবিয়তে থাকবে এটি হতে পারে না। ঘুষ ছাড়া মানুষের কাজ হবে না, নাগরিক সুফল জনগণ ভোগ করবে না, এমন বৈষম্য ও অন্যায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের সময়ে চলতে পারে না।

সারা দেশে কী পরিমাণ মানুষ বিনাবিচারে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর জেল খাটছে, কী পরিমাণ মানুষ বিনা অপরাধে কারাদহন ভোগ করছে, সেটিও খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। একজন নিরপরাধ জাহালমের কারাজীবন রাষ্ট্রকে এই তাগিদ দিচ্ছে, সৎ, সাহসী, দক্ষ জনবল দিয়ে দুদককে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে শেখ হাসিনার ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে বিজয় অনিবার্য করতে হবে। শেখ হাসিনার হাত ধরে দেশে যে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলছে, তা টেকসই হবে না বা তার সুফল জনগণ ভোগ করবে না, যদি না সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিত হয়। যদি না দুর্নীতির মূলোৎপাটন না করা যায়।

সারা দেশে সরকারি আইন কর্মকর্তাদেরও স্বচ্ছ মনিটরিংয়ে আনার জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একজন নিরপরাধ জাহালমের মুক্তির মধ্য দিয়ে যেমন প্রমাণ হয়েছে, গণমাধ্যম কতটা শক্তিশালী তেমনি, আবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বিচার বিভাগই গরিবের শেষ ভরসাস্থল। ন্যায় বিচার কতটা মানুষের মৌলিক অধিকার।

দুই.

উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্বের ভোট ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জনমত জরিপ সম্পন্ন করে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ-উত্তর বাংলাদেশে সংসদে মহাজোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলের আসনে বসানো হয়েছে। আরেক শরিক ১৪ দলের নেতাদেরও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না দিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে বলা হয়েছে। ভোটের অবিশ্বাস্য ফলাফল এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ১৪ দলের নেতাদের মধ্যে অভিমানের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেখা যাচ্ছে। ১৪ দল ও আওয়ামী লীগের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন চলছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আটজন ও ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা কাজী জাফরুল্লাহকে দ্বিতীয়বারের মতো নিজস্ব ক্যারিশমায় সিংহ মার্কা নিয়ে পরাজিত করে আসা মুজিবুর রহমান চৌধুরী বা নিক্সন চৌধুরী ছাড়া বাকি সবাইকেই যেমন সরকারি দল বলা যায়, তেমনি সবাইকে বিরোধী দলও বলা যায়। কারণ ওই নয়জন ছাড়া বাকি সবাই শেখ হাসিনার ইমেজ বা আওয়ামী লীগের শক্তির ওপরই বিজয়ী হয়ে এসেছেন। সেটি মহাজোটগত ভাবেই হোক আর ১৪-দলীয় জোটের ব্যানারেই হোক। যাঁরা লাঙ্গল নিয়ে ভোট করেছেন, তাদেরও বলতে হয়েছে, লাঙ্গলই নৌকা, নৌকাই লাঙ্গল। তেমনি যাঁরা বাইসাইকেল প্রতীকে জয়লাভ করেছেন, তাদেরও বলতে হয়েছে, নৌকাই সাইকেল, সাইকেলই নৌকা।

বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এখন পর্যন্ত আন্দোলনের কোনো কর্মসূচি না দিলেও বলে আসছে এই নির্বাচনী ফলাফল তারা মানছে না। নতুন নির্বাচন দিতে হবে এবং তারা সংসদে যাচ্ছে না। এমনকি দলীয় সরকার এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না।

ঢাকা উত্তরের মেয়র পদের উপনির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। বর্জন করায় এটি আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলামের একতরফা নির্বাচনে এটি পরিণত হয়েছে। যেন আতিকুল ইসলামকে নির্বাচনের দিন মেয়র ঘোষণা করা সময়ের ব্যাপারমাত্র। এই নির্বাচন রাজনীতিতে প্রভাব ফেলা দূরে থাক, বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় শতভাগ আকর্ষণহীন হয়ে পড়েছে।

বিএনপির সামনে উপজেলা নির্বাচন বর্জন কতটা যৌক্তিক, সেটি নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে এখনো কোনো আলোচনা দেখা যাচ্ছে না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির মতো একটি শক্তিশালী জনপ্রিয় দলের বর্ধিত সভা ডেকে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ, আত্মসমালোচনা, আত্মবিশ্লেষণ করে পোস্টমর্টেম করতে দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতির রণকৌশল নির্ধারণ করতে দেখা যাচ্ছে না।

বিএনপির নেতা-কর্মীদের সব আবেগ শক্তি ও ঐক্যের জায়গা দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় কারাবন্দী। বেগম খালেদা জিয়া মার্শাল ’ল ডিক্টেটর জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রীই নন, এরশাদের সেনাশাসন বিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা গণতন্ত্রের নেত্রী হিসেবে গণরায়ে দুবার ও সাংবিধানিকভাবে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। শারীরিকভাবেও তিনি নানান অসুখ-বিসুখে জর্জরিত। এর মধ্যে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যুশোক তাঁকে বইতে হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বা সেকেন্ড ইন কমান্ড তারেক রহমান একুশের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার বিচারে যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত আসামি হিসেবে আইনের চোখে পলাতক ও লন্ডনে নির্বাসিত। বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন দুঃসময় অতীতে কখনো আসেনি।

তারেক রহমান রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত হওয়ায় বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের আগে খালদা জিয়ার মুক্তি চাইলেও দাবিটি জোরালো করতে পারেনি। নির্বাচনেও পরিকল্পিত ও গোছানোভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিতে পারেনি। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া কারাবন্দী। এটি দেশের মানুষই নয়, বিএনপিও যেন ভুলতে বসেছে। সারা দেশে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান শুরু করেছেন। দলের কর্মীদের ধরে রাখতে নির্বাচন বা সফল আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। সরকারবিরোধী গণআন্দোলন গড়ে তুলবে এমন আলামতও বিএনপিকে নিয়ে পর্যবেক্ষক মহল দেখছেন না। এ ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাচন বর্জন করলে নেতা-কর্মীদের সংগঠিত রাখা দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

এদিকে ডাকসুসহ সব কলেজ সংসদ নির্বাচনের দুয়ার খুলতে যাচ্ছে। সেখানেও বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের অংশগ্রহণ এবং ফলাফল ঘরে তোলা আরেক দফা বড় চ্যালেঞ্জ। এক কথায়, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, সরকারবিরোধী আন্দোলন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে দলকে শক্তিশালী করার তিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিএনপি। আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষণ যেখানে দেখা যাচ্ছে না, পরিস্থিতি যেখানে অনুকূলে নয়, সেখানে উপজেলা নির্বাচন বর্জন করলে মাঠের কর্মীরা হতাশ ও বিষাদগ্রস্ত হবে।

বিএনপির দল গোছানোর কাজও মুখ থুবড়ে পড়বে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে উপজেলা নির্বাচন ঘিরে বিপুল উৎসাহই নয়, দলীয় মনোনয়ন লাভের জন্য একেক উপজেলায় অসংখ্য প্রার্থীর তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে। বিএনপি ওয়াক ওভার দিলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে ভোটযুদ্ধ যে শুরু হবে, সেটি যেমন নিশ্চিত বলা যায়, তেমনি আটটি আসন নিয়ে সংসদে না গেলে গণফোরামের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খান যে সংসদে যোগ দেবেন, এটি নিশ্চিত। এ ক্ষেত্রে তীব্র গণআন্দোলনের যেখানে সুযোগ নেই, সেখানে সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন বর্জন বিএনপির জন্য সাফল্য না ব্যর্থতা বয়ে আনবে, এটি তাদেরই বৃহৎ পরিসরে দলের সভা ডেকে আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত করতে হবে। এমনকি সংসদে যোগদান করে দল গোছানোর পথটি তারা বেছে নেবে কিনা তাও ভাবতে হবে। রণকৌশল চূড়ান্ত করতে হবে। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত