• মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১
  • ||

মজিদ মাহমুদের কাটাপড়া মানুষ: কবিমানস

প্রকাশ:  ১৬ এপ্রিল ২০২৩, ২১:২৬ | আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৩, ২১:২৯
ড. জি এম মনিরুজ্জামান

আশির দশকের অন্যতম কবি মজিদ মাহমুদ (জ. ১৯৬৬-) বিষয় ও প্রকরণে স্বতন্ত্র। তাঁর অন্যতম কাব্য মাহফুজা মঙ্গল। ১৯৮৯ সাল হতে ২০১১ সালের মধ্যে রচিত বিশটি কবিতা নিয়ে মাহফুজা মঙ্গল মজিদ মাহমুদকে সফলতা এনে দিয়েছে। তাঁর অন্যতম আরেকটি কাব্য যেটি কাব্য পরিক্রমায় বিশেষত্ব এনে দিয়েছে সেটি কাটাপড়া মানুষ (২০১৭)। চুয়াল্লিশটি কবিতা নিয়ে কাটাপড়া মানুষ কাব্যটি বিষয়-ভাবনা ও শৈল্পিক সত্তায় মজিদ মাহমুদকে স্বতন্ত্র করেছে। এছাড়া কবিসত্তায় ইতিহাস ও সমাজমনস্ক কবি হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। এর বিস্তার ও বিষয়-শৈলী তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ থেকে ভিন নানা কারণে। সমকালের রোমান্টিক আবহ থেকে বের হয়ে তিনি মানব জীবনের দুঃখ-কষ্টকে মূল উপজীব্য করে তোলেন। তিনি সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের দুঃখ-কষ্ট এবং হাহাকারে ব্যথিত হয়ে পড়েন। সেসব আত্মকথা বেরিয়ে আসে নানা শব্দবদ্ধে। এমন কয়েকটি শব্দবদ্ধে এর আঁচ পাওয়া যাবে; যেমন কাটাপড়া মানুষ, হাঙ্গার স্টাইক, নিয়তি, জীবনের জয়গান, নৈঃশব্দে বাঁচা, অ্যানাটমি, ক্রসফায়ার, স্বৈরাচারী কবি, হত্যাকাণ্ড, হতাশাবাদী, রাজা, যুদ্ধ, সুন্দরবন, সাম্যতত্ত্ব, সময়, ঘুমপাড়া নিগান, নিন্দুক, শ্রম, মহররম, ভদ্দরলোক প্রভৃতি। তাঁর কবিতার ভাষায় বিশেষ ধরনের প্রকাশরীতিও লক্ষ করা যায়। তিনি একুশ শতকের গোড়াতেই একালের সমাজের কাছে কতোখানি দায়বদ্ধতা কবিতার ভাষা থেকেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এসবের মাঝে কবির মনোজগতের কোনো চেতনার পরিচয় পাওয়া যায় কিনা বা কাটাপড়া মানুষ কাব্যেও কবিতাগুলোর মধ্যে তিনিইবা কীভাবে অবস্থান করেন- সেসব বিষয় খুঁজে দেখা যেতে পারে।

কবি মজিদ মাহমুদ কাটাপড়া মানুষ কাব্যে সমকালীন সমাজের অসঙ্গতিকে দেখান। নিরাপত্তাহীনতায় অনিশ্চয়তায় বেঁচে থাকা মানুষের জীবনকে তিনি কবিতায় বেছে নেন। গুম, খুন, হত্যা, ক্রসফায়ার, ধর্ষণ প্রভৃতির সঠিক বিচার হয় না এই সমাজে। অধিকন্তু শিশুরা বালির মাঠে খেলতে গিয়ে লাশ হয়ে বাড়িতে ফেরে। সেখানে প্রতিবাদ করার মতো মানুষ নেই। এসব দেখে কবি বিবেকের দংশনে আহত হন। ভাষা হয়ে প্রকাশ পায় কবির সেসব বেদনাকথা। ‘কাটাপড়া মানুষ’, ‘রাজন’, ‘তনুজা’, ‘ক্রসফায়ার’, ‘হত্যাকাণ্ড’, ‘অন্ধকারের সৈন্য’, ‘কতিপয় আমলা ও হাজারী মশাই’, ‘রাজা’, ‘যুদ্ধ’ প্রভৃতি কবিতায় কবির ভাষাহীন বোধের তথা মনোলোকের প্রতিচ্ছবি ভেসে আসে।

কবি সাধারণ মানুষের পাশে না থাকতে পেরে নিজেও অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। তিনি হারিয়ে ফেলেন শক্তি। তখন কবিতা লেখা আর গুরুত্বপূর্ণ নয় কবির কাছে। কেননা সমাজে ধর্ষিতা নারীর হয়ে কেউ প্রতিবাদ জানাচ্ছে না। শীতলক্ষ্যার জলে শুধু লাশের নির্মম সমাহার। রাজন ও ত্বকীর মতো শিশুহত্যা বিশ্ব-বিবেককে দংশন করে। প্রতিদিন এমনি এক একটি স্মৃতি-বিস্তৃতি হয়ে যোগ হয়ে যায় নতুন নতুন স্মৃতি। কবি প্রকাশ করেন :

প্রতিদিন প্রাতঃরাশের আগে আমিও

মানুষের ভেতরের মানুষকে জাগিয়ে তুলি

জেগে ওঠো প্রবঞ্চিত প্রেমিকের দল, সম্ভ্রম হারানো বোন

যারা কালরাতে ঘুমাতে পারনি নিজের বিছানায়

যে সব মা জেগে আছ সন্তান ফেরার প্রত্যাশায়

অথবা, শবেবরাতের জ্যোৎস্নায় খেলতে যাওয়া শিশুটি বালির সাথে লাশ হয়ে মিশে থাকে। সমকালীন এবিষয়গুলো কবির মনোজগৎকে আলোড়িত করে :

মা ও বাবার টুকরো টুকরো লাশ

সযত্নে রেখেছে ঢেকে সে তার চোখের পল্লবে

শবে-বরাতের জোছনায় যে সব কিশোর

খেলতে গিয়েছিল বালুর মাঠে

কে তাদের বাবা-মাকে দিয়েছিলো লাশের উপহার

তোমরা কি ভুলে গেছ ত্বকির নিষ্পাপ মুখ

(কাব্যসমুচ্চয়, ‘রাজন’)

কবি মজিদ মাহমুদের কবিতায় সামাজিক বিষয় যেমন স্থান পায়, তেমন স্থান পায় ইতিহাস চেতনা, পুরাণ-প্রসঙ্গ প্রভৃতি। এসবের প্রত্যেকটি বিষয়ের সঙ্গে আছে কবির সামাজিক দায়বদ্ধতা। এই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই কবি সমকালকে এড়িয়ে যেতে পারেন না। তিনি ব্যঙ্গ করেন সমকালের নীতি-বহির্ভূত কবিদের। যেসব কবি শুধু পুরস্কারের আশায় কবিতা রচনা করেন, তাদের প্রতি আছে মজিদ মাহমুদের ধিক্কার। যারা তাদের কবিতায় সমকালের সত্যকে তুলে ধরেন না, এড়িয়ে চলেন চরম সত্যবচন, অসহায় মানুষের পক্ষ হয়ে কথা বলেন না; কথা বলেন না স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, তাদের এসব কবিতা মজিদ মাহমুদের কাছে বাজারের ফর্দের মতো অথবা শেয়ালের হুক্কাহুয়ার মতো। এসব দেখে যারা প্রকৃত কবি তাঁরাও কবির মতোই কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁরাও যেন কাটাপড়া মানুষ। নগরের ইট, বালি, সুরকির মতো তারা প্রতিনিয়ত খসে পড়ছে ক্ষোভে, রাগে অথবা অভিমানে। কেননা কবি এই বাস্তব সত্যকে, সমকালীন সময় ও সমাজকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করেন। কবিতাতে প্রতিবাদের সুযোগ পান না মোটেও। কবির ভাষায়:

আর আমার মতো যারা লেখা দিয়েছেন ছেড়ে

তারা কাটাপড়া মানুষ-

তাদের জিভ নেই, তর্জনী ও মধ্যমা নেই

মিলিত হওয়ার লিঙ্গ নেই

বালি ও সুরকির মতো পুরনো দালান থেকে

তারা প্রতিদিন খসে পড়ে।

(কাব্যসমুচ্চয়, ‘কাটাপড়া মানুষ’)

মজিদ মাহমুদের কবিতায় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিফলিত হয় কি না, তা দেখা যেতে পারে। কবির সমকালীন রাজনীতিতে বেড়ে চলা দুর্বৃত্তায়ন, অধঃপতন, হীনস্বার্থ চরিতার্থ, অন্যায় মেনে নেওয়ার প্রবণতা, রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ সম্পর্কসূত্র, ক্ষমতার মোহ প্রভৃতি কবির দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। অপরদিকে, সমাজের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের এক বার রেকর্ড করে রাখা বক্তৃতা বার বার চালিয়ে দেওয়া; কবিদের একই বই শুধু তারিখ বদলে বার বার প্রকাশিত হওয়া কোনো স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না। সবকালের এইসব ঘটনার উল্লেখ করতে গিয়ে কবি মজিদ মাহমুদ মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন শাসন আমল হতে বর্তমান অবধি অপসংস্কৃতির একটি চিত্র উপস্থাপন করেন। এই চিত্রে মিশে থাকে কবির বেদনার রং:

পিতা কিংবা ভাই সবার জন্য একই রীতি

ক্ষমতা হলো একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যাপার

ক্ষমতা কারো ভাই নয়

পিতা কিংবা সন্তান নয়

ক্ষমতা একটি মডার্ন মেশিন।

(কাব্যসমুচ্চয়, ‘রাজা’)

কবি মজিদ মাহমুদ সমকালের রাজনীতিঘেঁষা কবিদের কেমন দৃষ্টিতে দেখেন? তিনি গভীরভাবে লক্ষ করেন, হাল আমলের কবিতায় নেই মানবতার ছাপ। সংগঠন সর্বস্ব প্রচার সেখানে মুখ্য। একসময়ের মার্কসবাদী তরুণ কবিও পুরস্কারের জন্য দলভুক্ত হয়ে পড়ে। কখনোবা গণতন্ত্রের বাইরে গিয়ে বুলি আওড়ায় এসব সুবিধাবাদী কবি। শাসক ও সময়কাল বুঝে কবিতা লিখতে গিয়ে তারা স্থান-কাল-ব্যক্তিভেদে আমলা, প্রমোশন, সচিবালয়, দল, ক্ষমতা প্রভৃতির সুযোগ-সুবিধার লোভে অবিবেচক হয়ে ওঠে। অথচ একটা সময়ে কবিরা বিবেকের তাড়নায় লিখতেন কবিতা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন কবিতার ভাষায়। এখনকার কবিরা প্রেয়সীর জন্য দারুণ প্রেমের কবিতা লিখলেও অন্যায়ের প্রতিবাদের কবিতা লিখতে সাহস করে না। শিল্পী-সাহিত্যিকদের এমন নির্লিপ্ততায় কবি মজিদ মাহমুদের কবিসত্তা ভীষণ ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হয়ে হঠে। তিনি এজাতীয় কবির চরিত্র উন্মোচন করেন এভাবে :

আমলার সান্নিধ্য পেতে কবিতা মোক্ষম উপায়

প্রমোশন, এমনকি সচিবালয়ের গেট পাসের বদলে

অনেকে দু-চার লাইন কবিতা নিয়ে ঘোরে

দল ও ক্ষমতা বিবেচনায় পাল্টে যায় কবিতার রূপক।

(কাব্যসমুচ্চয়, ‘বিবিধার্থে’)

মজিদ মাহমুদের অন্তর্জগতে আছে প্রেমসত্তা। কিন্তু প্রেমভাবনার অপর পিঠে সমাজের চিত্র ভেসে ওঠে। সামাজিক অনাচারের বিপরীতে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে গেলে প্রেমিকাকে চুমু খাওয়ার অদম্য ইচ্ছা হারিয়ে যেতে পারে। অপরদিকে পৃথিবীর আর দশটি জিনিসের মতোই সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন হচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে মানুষ। সমাজে প্রত্যেক হত্যার পেছনে থাকে আরেকটি হত্যাকাণ্ড। অবস্থা দেখে মনে হতে পারে পরিবর্তনশীল পৃথিবীর মানুষ এসবে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। সাদরে গ্রহণ করছে চারপাশের সব। সমাজের নিরেট অসহায় মানুষগুলো শুধু বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সমাজের এসব নোংরা চিত্র কবির প্রেমসত্তাকে দিন দিন দূরে ঠেলে দিচ্ছে। কবি বলেন:

চারিদিকে এত এত ধর্ষণ ও শিশুহত্যা

আমার প্রেমকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে

এক একটি ঘটনার পর আমি তার থেকে

এক এক মাইল দূরে চলে যাচ্ছি। (কাব্যসমুচ্চয়, ‘অ্যানাটমি’)

পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ আর যুদ্ধ। যুদ্ধ মানেই মানুষের জীবনে অশান্তি। যুদ্ধ মানেই মানুষ মারার উৎসব, যুদ্ধ মানেই মানুষ কাটাকাটির প্রতিযোগিতা। যুদ্ধ মানেই নিরপরাধ নারী আর শিশুহত্যা। যুদ্ধে মানুষের বুকে যেমন গুলি চলে, তেমনি বেয়োনেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয় নারী ও শিশুদেহ। কবিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেন। আবার কখনোবা যুদ্ধের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব লক্ষ করা গেলেও তার পেছনে থাকে কবির প্রতিবাদী ভাষা আর সাম্য প্রতিষ্ঠার অদম্য ইচ্ছা। তাছাড়া ধর্মকে ব্যবহার করে বিশ্ব রাজনীতি ও সমাজ আজ কলুষিত, আতঙ্কিত। নিজ ধর্মের বাইরে অন্য ধর্মের প্রতি নেই সম্মানবোধ। এসব বিষয় ভেবে কবি নিজের সন্তানকে নিয়েও শঙ্কিত। কবি দ্বিধান্বিত; নিজের কাছেই তার প্রশ্ন জাগে কার ধর্ম গ্রহণ করলে পৃথিবীতে নিরাপদ ও শান্তিতে থাকা যাবে?

মজিদ মাহমুদ ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতন একজন কবি। তিনি মানুষ ও জনপদের ইতিহাস লেখেন। ভারতীয় উপমহাদেশ যে নানান বিদেশি জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা বারবার পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলো তা কবি বিস্মৃত হন না। শ্বেতাঙ্গদের বাণিজ্য-কৌশল, লোক ঠকানোর কলাকৌশল, সম্পদ লুটের লোভ-লালসা, শাসন-শোষণ প্রভৃতি কবির কবিতায় স্থান পায় গুরুত্ব সহকারে। কবি ‘নিয়তি’ কবিতায় দেখান কীভাবে জালিয়ান ওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড পুরো ভারতবর্ষে আলোড়ন তুলেছিলো। অপরদিকে পাকিস্তানি দুঃশাসনে জর্জরিত ছিলো বাংলাদেশের আপামর জনতা তথা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। কৃষক বাংলায় উৎপাদিত সোনালি আঁশের ন্যায্যমূল্য হতে বঞ্চিত হতো, পাটের আঁশ হয়ে যায় কৃষকের গলার ফাঁস। কবি এইসব শোষণের কথা বলতে গিয়ে কবিতা লেখেন ‘গিভ আপ ইয়ুর হাঙ্গার স্টাইক’। কবি স্মরণ করেন বিভিন্ন সময়ে শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অগ্রজ কবিদের। সেখানে মজিদ মাহমুদের কবিতায় ফিরে আসেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম অথবা অন্যতম আধুনিক নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের কবি শামসুর রাহমান। কবি উল্লেখ করেন, একসময় কবিরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সমাজের অন্যান্য প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতেন। কখনোবা রবীন্দ্রনাথ এজন্য টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন, শরৎচন্দ্র পথের দাবি বা শেষ প্রশ্নে জেলে বসেই জেলারের বিরুদ্ধে হাতকড়া নাড়তেন অথবা কাজী নজরুল ইসলাম কারাগারে বন্দি হয়ে অনশন করতেন, রাজবন্দীর জবানবন্দি উত্থাপন করেছেন। কখনোবা মজিদ মাহমুদ কারবালা প্রান্তরের ইতিহাস গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক রণাঙ্গনে দুঃশাসন এজিদের অন্যায় জয়ের সত্য ইতিহাস কবি তাঁর কবিতায় তুলে ধরেন। এমন সব ইতিহাস-ঐহিত্য তুলে ধরার মধ্যে কবির ইতিহাস প্রেমও সম্প্রীতির মানসপট খুঁজে পাওয়া যাবে। কবির চিত্তে প্রতিবাদের মানস লক্ষ করা যায়:

তখন জেলে বসেই হাতকড়া নাড়িয়ে

জেলারের বিরুদ্ধে গান গাওয়া যেতো

আদালতে দাঁড়িয়ে জজ সাহেবকে প্রশ্ন করা যেতো

পাঠকরা যেতো রাজবন্দীর জবানবন্দি।

(কাব্যসমুচ্চয়, ‘গিভআপইয়ুর হাঙ্গার স্টাইক’)

মজিদ মাহমুদের কবিতায় পুরাণ-প্রসঙ্গ এসেছে নানা কারণে নানাভাবে। কেনইবা কবি তাঁর কাব্যে পুরাণকে ব্যবহার করেছিলেন তাও ভেবে দেখা যেতে পারে। কবি সমকালীন সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ উপস্থাপনের পিছনে মানুষের বংশ পরম্পরা স্বার্থ সিদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। পরিবর্তনশীল পৃথিবীর পেছনেও স্বার্থ জড়িত থাকে। তবে জীবনের কোনো একটি পর্যায়ে মানুষকে স্থিতি আনতে হয়। এই স্থিতি হলো যার যার ধর্মের প্রতি আত্মসমর্পণ করা। সে হিন্দু বা মুসলমান যেই হউক না কেন। পার্থিব নানা পদে সংযুক্তি থাকলেও জীবনের শেষ বেলায় একটি পদকেই মানুষ বেছে নেয়। এই পদ বলতে কবি স্ব স্ব ধর্মানুযায়ী মসজিদ বা মন্দিরকে বুঝিয়েছেন। অথচ এই মানুষের শক্তি ও ক্ষমতা থাকাকালে সে ধর্মকেই তার স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করেছিলো। পৃথিবীতে মারামারি-হানাহানির মূলেও ধর্মকে পুঁজি করে ক্রমশই হীনস্বার্থকে বৃদ্ধি করা। তিনি কবিতায় এক পর্যায়ে দেখান যে, সব ভদ্দরলোকের বাবাই হয়তো কখনো দস্যু ছিলো। অথচ এই দস্যুবৃত্তিকালেই হয়তো দস্যু পিতারা নিজ নিজ সন্তানকে পৃথিবীতে শান্তিতম স্থানে রেখে যেতে চায়। একসময় তারা বুঝতে পারে যে, পৃথিবীতে অস্ত্রের ঝনঝনানি সর্বদা কার্যকরী নয়। তাদের উত্তরপ্রজন্মও হয়তো পৃথিবীতে একসময় শান্তি কায়েমের কথা প্রচার করবে; হয়তো তা হবে বুদ্ধের মতো, যিশুর মতো, কখনোবা গান্ধীজীর মতো। কিন্তু বড়ই আশ্চর্যের বিষয় হলো, এইসব সন্তানরা নীতিবাক্য প্রচার করলেও তারা কখনোই বলবেন না তাদের পিতাদের লুণ্ঠিত সম্পদ অসহায়দের মাঝে বিলি করতে। মানুষের মধ্যে প্রবহমানকাল ও যাপিত জীবনের বৈচিত্র্য এবং তাদের মধ্যেই আবার চারিত্রিক সমন্বয়হীন তার কথা মজিদ মাহমুদ পৌরাণিক আবহে তুলে ধরেন। যেমন :

তাদের সন্তানেরাও একদিন শান্তি কায়েমের কথা বলবেন

কিন্তু কেউ বলবে না চল

আমাদের পিতাদের কেড়ে নেওয়া সম্পদ

সেই নিঃস্বদের সন্তানের কাছে ফিরিয়ে দেই।

(কাব্যসমুচ্চয়, ‘ভদ্দরলোক’)

কবিতার সাথে কবি মজিদ মাহমুদের জীবনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কবিতা তাঁর কাছে নিত্যদিনের সঙ্গী। কবিতাহীন জীবন কবির কাছে অসম্পূর্ণ। কবিতায় তিনি পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, প্রকৃতি ও যাপিত জীবনকে ধারণ করতে চান। কবিতায় সমকালীন জীবন ও সময়কে তিনি ধরতে চান। কবিতার সঙ্গে চলে তাঁর অভিমান, ঝগড়া। কখনোবা কবিতাও তাঁর থেকে দূরে সরে যায়। এজন্য তাঁর স্ত্রী-কন্যারা খুশি এবং কবিকে তাদের কাছে পাওয়ার অভাবটা মিটে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই কবির উপলব্ধি হলো কবির বুকের সবটা জুড়েই আছে শুধু কবিতা।

মজিদ মাহমুদ গতানুগতিক পথে না হেঁটে বরং নতুন কাব্যে নতুন পথ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। এজন্য তিনি কখনোই মানবজীবন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আনেন না। তাঁর কবিতার বিশেষত্ব হলো তিনি কবিতায় মানবজীবনের অখণ্ড রূপকে ধারণ করতে চেষ্টা করেন। এজন্য কবিতায় কবির গভীর জীবনবোধ ও নান্দনিক ভাষাবোধের শৈল্পিক মিলন ঘটে। তিনি সরল ভাষায় মৌলিক ও অসাধারণ চিত্রকল্প তৈরি করেন। এসব কিছুকে ছাপিয়ে মজিদ মাহমুদের কবিতায় যে রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো কবির মানবতাবাদী চেতনা।

সাহিত্য
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close