Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ৬ বৈশাখ ১৪২৬
  • ||

ভাবনাটা বদলানো দরকার

প্রকাশ:  ২২ মার্চ ২০১৯, ১৭:৩৭
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
প্রিন্ট icon

মানুষের জীবন যেন মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। সময় মানুষকে আনন্দিত করে আবার সময় মানুষকে বেদনার্ত করে। সব দোষ যেন সময়ের। সময়ের ঘাড়ে দোষ চাপানো মানুষের স্বভাব। এই দোষ চাপানোটা এখন আমাদের এক ধরণের কালচার হয়ে গেছে। ভাবটা সবার এরকম আমি একমাত্র পৃথিবীতে মহাপুরুষ, নীতিবান আর সাধু। আর দুনিয়ার সবাই বিপথগামী। আমরা যখন একটা ভুল করে ফেলি তখন একটাই চিন্তা, কিভাবে এই দোষটা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে বিপদমুক্ত রাখা যায়। কোনো ভালো কিছুর ক্রেডিট নিতে আমাদের মতো ওস্তাদ আর দুনিয়াতে নেই। কিন্তু কাজটা যখন খারাপ হয় তখন একে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে বেমালুম বিষয়টা থেকে সটকে পড়া আমাদের চিরায়ত স্বভাব। ভালো কাজের ক্রেডিট নিবো আর মন্দ হলে নিজেকে সাধু বানিয়ে অন্যকে চোর বানাবো সেটা তো হয়না। ভালো কাজ করলে বিনীত হতে হয় আর মন্দ কাজ করলে সেটার দায়িত্ব নেবার সাহস থাকতে হয়। কিন্তু সেখানেই আমাদের সাহসের কোনো চিহ্ন নেই বরং এ জাগাটাতে আমরা সবাই একেক জন কাপুরুষ। ভারতের একজন রেলমন্ত্রী ছিলেন। নামটা হয়তো সবাই জানেন। উনার নাম লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। কি মনে পড়েছে তো? আপনি তো বলছেন উনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভুল ভাবেননি একদম ঠিক ভেবেছেন। কিন্তু তিনি কি এতো সহজেই প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছেন? না, এতো সহজ না। উনি যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন তখন রেল দুর্ঘটনার দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। উনি রেলমন্ত্রী, উনি রেল নিয়ে পরিকল্পনা আর উন্নয়ন করবেন। উনি তো রেলগাড়ি চালাবেন না। একদম ঠিক উনি রেল চালাননি। কিন্তু দুর্ঘটনার দায়ভার নেবার সাহস দেখিয়েছেন। যেটা সবাই ভীরুরা পারেনা, বীররাই পারে। মানে নিজে বিনীত হয়েছেন। এতে উনার সুনাম বেড়েছে। সব মানুষের আস্থা আর গ্রহণযোগ্যতার জায়গায় পরিণত হয়েছেন। তার প্রতিদানে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সেই মহতী কথাটা মনে পড়ে গেলো “মহাঅর্জনের জন্য মহত্যাগ দরকার” তার প্রমান লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। কেউ ভালো করলে আমরা নাক সিঁটকাই। কিভাবে সেখান থেকে খুঁত বের করে সমালোচনা করা যায় সেটাই যেন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অর্জনটা বিসর্জন হয় আর সমালোচনাটা মানুষের সময় নষ্টের একটা উপাদান হয়ে যায়। ফলে সেখান থেকে শোরগোল আর শোরগোল থেকে গন্ডগোল শুরু হয়। ভালোও করা যাবেনা খারাপও করা যাবেনা। তাহলে মানুষ কি করবে। মোদ্দা কথা কোনোকিছু না করে কিভাবে একজনের অনুপস্থিতিতে তার দুর্নামের বেলুন ফুলিয়ে সেটাকে সবাই মিলে ফাটানো যায় সেটাই যেন মহানন্দের বিষয় হয়ে থমকে যায়। আরেকটা জিনিস মানুষ খুব পারে সেটা হলো নিজেকে বিদ্বান বানিয়ে অন্যকে কিভাবে হেয় করা যায়। যেন দুনিয়ার সব একাই সে বুঝে আর বাকি সবাই অপদার্থ আর মহামূর্খের দল। তার জাদুকরী চতুর কথায় রথী মহারথীরা পর্যন্ত বিভ্রান্ত হয়। মহারথীরা ভাবে একটা হীরকখন্ড তার হাতে এসেছে। এই পরশ পাথর দিয়ে তারা দুনিয়া পাল্টে ফেলবে। না মশাই, এমনটা না ভাবাই ভালো। বরং উল্টোটা হবার সম্ভাবনায় বেশি। কারণ যত গর্জে ততো বর্ষেণা। মানুষকে সম্মান করতে শিখুন। যাকে যতটুকু মর্যাদা দেবার দরকার সেটা দিন। এটাতে কোনো পরাজয় বা গ্লানি নেই বরং আনন্দ আছে। ডক্টর ভীমরাও রামজি আম্বেডকরকে চিনেন। উনি ভারতের সংবিধান প্রণেতা ছিলেন। আরও অনেক কিছু ছিলেন তিনি। যেমন-রাজনৈতিক নেতা, দার্শনিক, চিন্তাবিদ, নৃতত্ত্ববিদ, ঐতিহাসিক, বাগ্মী, বিশিষ্ট লেখক, অর্থনীতিবিদ, পণ্ডিত, সম্পাদক। এ মানুষটাকে একদিন অভিজাত বংশের মানুষেরা অবজ্ঞা করেছিল। মানুষটা যে খুব নিচু বংশের ছিল এজন্য। কিন্তু লেখাপড়ার প্রবল আগ্রহ ছিল। অনেক বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে একটা ইস্কুলে পড়ার সুযোগ পেলেন। কিন্তু বড় বংশের মানুষেরা এই নিচু বংশের মানুষটার সাথে বসবেনা। ফলে ইস্কুলের দরজার বাইরে মাটিতে বসে তাকে ক্লাস করতে হতো। পানি পিপাসা যখন লাগতো, কে দেবে তাকে পানি। তাকে পানি দিতে গিয়ে গায়ে যদি ছোয়া লাগে তাহলে তো জাত চলে যাবে। দেখুন, এর সাথে ভাবুনও যে মানুষটাকে সবাই অবহেলা করেছে, সেই মানুষটাই আসল মানুষে পরিণত হয়েছে। ২০১২ সালে হিস্ট্রি টি.ভি. ১৮ আয়োাজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারতীয়দের ভোটের দ্বারা এই লোকটাই শ্রেষ্ঠ ভারতীয় নির্বাচিত হন। আর যারা অবহেলা করেছিল মানুষটাকে তাদের কিন্তু পৃথিবী মনে রাখেনি। এটাই হয়তো প্রকৃতির বিচার। তাহলে মশাই, মানুষকে কখনো অহংকার ধরে রাখার জন্য অবহেলা করবেন না। বরং বিনীত হন মানুষ হিসেবে মানুষকে স্বীকৃতি আর মর্যাদা দিন। কারণ বড় যদি হতে চান ছোট হন তবে। এতেই মঙ্গল। এটাই ইতিবাচক মানসিকতা। এজন্য আমি সব সময় বলি আমাদের নিজেদের পাল্টানো দরকার। যদি নিজেরা না পাল্টায় তবে সমাজ পাল্টাবে না। আর আমরা নিজেদের মানুষ বলার দাবীটুকুও হারাবো।

২. আমরা বাঙালি ইতিহাস জীবন্ত কাব্যের মতো। এটা আমাদের অহংকার। কিন্তু অহংকারের জায়গাটাতে এখন আগাছা আর পরগাছা জন্মেছে। আত্মত্যাগ যে জাতির মানসিকতায় থাকার কথা ছিল সেখানে কেমন করে যেন ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিকতা শক্ত শেকড় গেড়ে বসেছে। আমরা আমাদের নিজেকে নিয়ে যতটা ভাবি দেশকে নিয়ে ততটা কি কখনো ভাবি। মনে হয়না কিন্তু বিষয়টা উল্টো হবার কথা ছিল। আমরা যদি মন প্রাণ দিয়ে দেশকে নিয়ে ভাবতাম তবে দেশ এগিয়ে যেত। দেশ এগুনো মানেই তো মানুষ এগুনো না, সেখানেই আমাদের সমস্যা। এটা চাই, ওটা চাই, এটা আমাকে পেতেই হবে, কিভাবে অন্যকে টপকে নিজের ফায়দাটা লুটে নেওয়া যায়, এগুলোই যেন এখন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু এমনটা তো আমরা কখনো কেউ আশা করিনি। এখন আমাদের মনে চিড় ধরেছে, বিশ্বাসে চিড় ধরেছে, মানবিক আচরণে চিড় ধরেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে জায়গাটায় আমাদের চিড় ধরেছে সেটি হলো দেশপ্রেম। কেবল কথায় দেশপ্রেম, কাজে নেই। আবার নিজের ভিতরের হতাশা ও অক্ষমতা এড়িয়ে গিয়ে দেশটার উপর কিভাবে দোষ চাপিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচা যায় এটাই যেন এখন আমাদের কালচার হয়ে গেছে। সত্য করে বলুনতো একবার কি আমরা স্বার্থ ছাড়া দেশ গঠনের কথা ভেবেছি? মনে হয় না। যেমন ধরুন যে ছেলেটা চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছে কিন্তু পাচ্ছেনা। সে দোষারোপ করছে দেশকে কিন্তু নিজের দোষটা খুঁজে বের করছে না। ধরলাম নিজের দোষ নেই। খুব ভালো কথা। চাকরিই কি মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য নাকি আরো অনেক সুযোগ ও বিকল্প যে আছে সেটা বের করে নিজেকে বড় করে তোলায় মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। ছোটখাটো গড়নের চীনা মানুষটি এখন প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের কোম্পানি আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়তে খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন নেই। এ ধরনের আরেকটি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জেফ বেজসের অ্যামাজন। একজন তরুণ ঘরে বসেই এ ধরনের অনলাইন শপিং খুলে বসে কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারে। এর সঙ্গে আউটসোর্সিংয়ের মতো কাজ করেও তরুণরা তাদের জীবন বদলে ফেলতে পারে। আমাদের দেশের গবেষকরা, বড় বড় বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষকরা অনেক সময় এদেশে গবেষণার পরিবেশ নেই বলে হাত পা ছেড়ে বসে থাকে। দোষটা যে দেশের নয় নিজের মানসিকতার সেটা বুঝতে চায়না। তারপরও যত দোষ নন্দ ঘোষ। এ কথাটা বলার অনেক যুক্তি আছে । এদেশেই বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, ড. মাকসুদুল আলম, ড.কুদরাত-এ-খুদা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, ড. এম এ ওয়াজদে মযি়া সহ আরও অনেকেই বিশ্বমানের গবেষণা করেছেন । এখনও অনেকে করে চলেছেন । কাজেই কোনো ধরণের খোঁড়াযুক্তি দেবার সুযোগ নেই । আমরা নিজেদের মানসিকতা পরিবর্তন করে দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে সবাই কাজ করি । তবেই মানুষ ও দেশ গড়ে উঠবে ।


লেখক: শিক্ষাবিদ, কলামিষ্ট ও লেখক ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।


/পিবিডি/একে

apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত