Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • রবিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫
  • ||

আত্মহত্যার আগে আকাশ নির্দয়ভাবে পিটিয়ে মিতুকে রক্তাক্ত করে জবানবন্দি নেয়

প্রকাশ:  ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৪১ | আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২৩:২৬
আফসানা হক চৌধুরী
প্রিন্ট icon

তানজিলা হক চৌধুরী মিতু কিছু ফটোশপড (photoshopped) স্ক্রিণশট দিয়েই কি একটা কাহিনীর সবদিক বুঝা যায়, একটা ৯ বছরের সম্পর্ক কি একটা সুইসাইড নোট দিয়েই বর্ণনা করা যায়?

কাহিনীটা শুরু করি মিতুকে দিয়েই। মিতু স্কুল-কলেজের উজ্জ্বল শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বন্ধু-বান্ধব ক্লাসমেট সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। একজন চিকিৎসক যার স্বপ্ন দেশের দরিদ্র মানুষের সেবা করে যাওয়া। সহজ-সরল, চঞ্চল, খুব সহজেই সবার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ফেলতে পারে, মনের কথা যাই থাকে মুখে তাই-ই বলে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের পরিবারের সবার কাছে একজন আইডল। সে হয়ত জানতোনা, তার এই সহজ-সরল স্বভাবই একসময় তার ও তার স্বামীর মধ্যেই দেয়াল তৈরি করবে। সরল মনা মিতু কখনো ভাবতে পারেনাই, যে এই বন্ধুবৎসল মনোভাবই তার স্বামীর মনে সন্দেহের বীজ বপন করবে।

২০১০ সালে আকাশের সাথে সম্পর্ক শুরু, কিন্তু কিছুদিন পরেই আকাশের মেজাজের সাথে যখন মিতুর চঞ্চল স্বভাবের সাথে মিলে উঠতে পারছিলনা, তখন মিতু অনেকবারই চেয়েছে সম্পর্ক টা শেষ করার। কিন্তু আকাশ তার মান-সম্মান নষ্ট হবে, মানুষ কি বলবে, সেটা ভেবে মিতুকে যেতে দিলনা। প্রতিবারই ভুলিয়ে-ভালিয়ে মিতুকে আটকে রাখতো। সম্পর্কের ৬ বছর হয়ে গেল, সাথে ঘটল অনেক সন্দেহের খেলা, তবুও ২০১৬ সালে বিয়ে হল, কিন্তু বিয়ের কিছুদিন আগেও মিতু সম্পর্ক রাখতে চায়নি। কারণ সে বুঝেছিল, যে আকাশের সাথে তার মনের মিল হচ্ছিলনা। সে এইটাকে খারাপ কিছু কখনো মনে করেনি, কারণ সে জানত যে দুইজন মানুষের মনে অমিল থাকতেই পারে। কিন্তু আকাশ এই মনের অমিলকেও সন্দেহের আওতায় ফেলল, এবং আবারও নিজের চট্টগ্রামের শিক্ষক হিসেবে মান-সম্মানের জন্য মিতুকে আটকে রাখল।

বিয়ে হল, আকাশ হয়ে গেল মিতুর পরিবারের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। মিতুর বাবা-মা কখনোই আকাশকে নিজের ছেলের থেকে কম কিছু হিসেবে দেখেননি। মিতুর দুই বোন আকাশকে ভাইয়ের থেকেও বড় চোখে দেখত। আকাশের প্রতিটা সাফল্যে তাদের কি গর্ব ছিল সেই ব্যাপারে আশেপাশের মানুষ ভালভাবেই জানত। আকাশও কখনো কোন কিছুতে কমতি রাখতনা, নিজের বাবা-মা আর আপন বোনের মতই দেখত। মিতু আর আকাশের ভালবাসার কমতি ছিলনা . ফেসবুকে ওদের পোস্ট দেখলে সেটা যে কেউ ভালভাবেই বুঝবে। কিন্তু আকাশের বদমেজাজের কারণে মিতুর হাতে, গালে কখনো যে দাগ পড়ত, সেটা কাউকে বুঝতে দিতনা। সে ভাবত, হাজার হোক ভালবাসার মানুষ, কিছুদিন পরে ঠিক হয়েই তো যাবে। ঠিক হয়ে যেত, কিন্তু আবার যে একই চক্র শুরু হত, সেটাও মিতু কাউকে বুঝতে দিত না।

মিতুর পরিবার ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসে। মিতু কুমিল্লা মেডিকেলে পড়াশুনা, এবং চট্টগ্রাম মেডিকেলে ইন্টার্নশীপ শেষ না করা পর্যন্ত পরিবার থেকে আলাদাই থেকেছে, শুধুমাত্র এইটা ভেবে যে, সে যদি চিকিৎসক হয়, তাহলে দেশের অল্প কিছু হলেও দরিদ্র মানুষকে সে সাহায্য করতে পারবে। আকাশের সাথে বিয়ে হবার পরও সে যুক্তরাষ্ট্রে অল্প কিছুদিনের জন্যে যাওয়া-আসা করত। আকাশের ইমিগ্রেশন প্রসেসিং চলছিল, যেটা এই বছরের ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হবার কথা। মিতু ইউএসএমএলির জন্যে প্রাণপণ পড়ছিল, এবং পাশাপাশি ভালবাসার মানুষ আকাশের সাথেও থাকতে চাচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে আসার দুই দিন পরেই যে সে আকাশের কাছে ফেরত যেতে চাচ্ছিল - আকাশ একলা থাকছে, আকাশ ওকে মিস করছে - সে এইসবের কারণে বার বার দেশে চলে যেত। এইভাবে আসা-যাওয়ার কারণে তার পড়াশুনার মধ্যে গ্যাপ পড়ে যেত, ইউএসএমএলির জন্যে প্রস্তুতিও পিছিয়ে যেত। কিন্তু এসবকে আকাশ কেন যেন মিতুর ব্যর্থতা হিসেবেই প্রমাণ করতে চাইত।

এই বছরের জানুয়ারির শুরু থেকেই আকাশের মাথায় নতুন একটি সন্দেহের বীজ বপন হয়, এবং মিতু যখন ইউএসএমএলির জন্যে মোটামুটি প্রস্তুত, তখন সে মিতুকে জোরপূর্বক দেশে ফিরতে বলে। মিতুও বাধ্য স্ত্রীর মত, একটুও শব্দ না করে স্বামীর কথা মেনে দেশে চলে গেল এই আশায় যে, স্বামীর মাথা থেকে সন্দেহের বীজটা ঝরিয়ে ফেলতে পারবে। কিন্তু মিতু কখনো ভাবেনি সে আকাশের এমন রূপ দেখবে, যেটা সে গত ৯ বছরে দেখেনি। মানসিক অত্যাচার মেয়েটাকে যে একটু একটু করে ক্ষয়ে দিচ্ছিল, সেটা তার পরিবার একটু একটু করে আঁচ করা শুরু করল। মিতু আর আকাশের কলহ এমন পর্যায়ে চলে গেল, যখন মিতু বুঝতে পারছিল যে সম্পর্ক নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

মিতু আকাশকে বলেছিল, যে দেশে থেকে স্পষ্ট হচ্ছিল যে সম্পর্কের অবনতিই কেবল হচ্ছে, তাই সে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত যাক, বিশেষত যেখানে আকাশের যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন প্রসেসিং এর কাজ পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আকাশ মিতুর পাসপোর্ট এবং গ্রিন কার্ড লুকিয়ে ফেলল। মিতু তাও কিছু বললনা, ভাবল একটু সময় দিলেই হয়ত সব ঠিক হয়ে যাবে। এসব ঝগড়া চলার সময় আকাশ আর মিতু বেশিরভাগ সময় মিতুর বাসাতেই থাকত। জানুয়ারির ৩০ তারিখ সন্ধ্যায় আকাশের মা যখন আসলেন মিতুকে বাসায় নিয়ে যেতে, তখন মিতুর মা-বাবা ভাবলেন যে সব হয়তো এখন ঠিক হয়েই যাবে। কিন্তু এসবের মধ্যে তারা আকাশের বদমেজাজের কথা ভুলেই বসছিল।

৩০ জানুয়ারির মধ্যরাত আকাশ মিতু কে পেটাচ্ছে, বেদম পেটাচ্ছে, মিতুর ঠোঁট ফেটে গেল, আকাশ মিতুকে লাথি মেরে তার শরীর থেতলা করে দিল, এরপরে ছুরি দেখিয়ে, মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে এমন বক্তব্য নিল, যেটা সবাই "আত্মসমর্পণ" হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া তে শেয়ার করে যাচ্ছে।

আকাশ মিতুর হাত কেটে ফেলতে চেয়েছিল। আকাশ রাত ৩টায় মিতুর বাবা কে ফোন করে রক্তাক্ত মিতুকে নিয়ে যেতে বলল। মেয়েকে বাবার হাতে তুলে দেয়ার আগে শ্বাশুরির খুব যত্ন নিয়ে রক্তগুলা মুছে দিলেন। মিতুর বাবা মিতুকে নিয়ে চলে গেলেন, এবং আকাশের সাথে এই কথা হল, যে পরদিন আকাশের সাথে ডিভোর্সের কাগজপত্র সব ঠিক করা হবে। আকাশ দেখল, তার এতদিনের যে ভয়, সেটা সত্য হতে যাচ্ছে। সে বলত, তার পরিবারের কাছে সে আইডল, তার যদি এতদিনের সম্পর্ক ভাঙ্গে, তাহলে এইটা নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে। তার উপরে যোগ হল মিতুকে রক্তাক্ত করার অপমানবোধ।

মিতু নারী নির্যাতন মামলা করবে, আকাশকে জেলে নিয়ে যাওয়া হবে, এই ভয় আকাশ সহ্য করতে পারছিলনা। যদিও মিতু বলেছে যে সে নারী নির্যাতন মামলা করবেনা, কারণ "আকাশের মেজাজ গরম ছিল বলে এমন করছে, কিছুদিন পরে ঠিক হয়ে যাবে"। কিন্তু আকাশের কাছে যে তার জেদ অনেক বড় জিনিস, সেটা মিতু ভুলে গিয়েছিল। মিতু তার বাসায় চলে আসার ঘন্টাখানেক পর জানতে পারল আকাশ আত্মহত্যার চেষ্টা করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছে। মিতু কথাটা বিশ্বাস করতে পারছিলনা। সে মিলাতে পারছিলনা, তার আকাশ এমন কিভাবে করতে পারে। তার কিছুক্ষণ পরে খবর আসল, আকাশ আর নেই। মিতুর উপরে আকাশটা ভেঙ্গে পড়ল, এবং সাথে সাথে শুরু হল হুমকি।

মিতু এবং মিতুর বাবাকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল, যে তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। একটি মেয়ে যে তার ভালবাসার মানুষকে একটু আগেই হারিয়েছে, সে কি সেই শোক সামলাবে, নাকি তার এবং তার বাবার জীবন বাঁচাবে, এসবের মধ্যে মিতুর মাথা কোনভাবেই হিসাব মিলাতে পারছিলনা। হুমকি এত বেড়ে গেল, নিজ বাসা ছেড়ে চলে যেতে হল। আকাশকে শেষবার দেখার জন্য মিতু এবং মিতুর বাবার বুক ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু তাদেরকে দেখলেই যে খুন করে ফেলা হবে।

"আকাশ, আকাশ, আকাশ, আকাশ, ..." মিতুর বিলাপ যেন শেষই হচ্ছিল না। এর মধ্যে শুরু হল ফেসবুকের ঝড়। বাঙ্গালী জাতি আমরা, একটা মেয়ের সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে মুখে একবারও যেন বাঁধেনা। কিন্তু মিতুর এইসব বুঝার ক্ষমতা ছিলনা। একে তো শারীরিক নির্যাতনের কারণে তার শরীরে ব্যাথা, মুখ হাঁ করতে পারছেনা পানি পর্যন্ত খেতে, এবং ভালবাসার মানুষটিকে হারানোর জন্যে মনের ব্যাথা, সব মিলিয়ে মিতুর শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে আসছিল। কিন্তু মিতুর পরিবার-পরিজন তো জানে মিতু কেমন। যখন জানতে পারল যে আকাশের পরিবার মিতুর নামে মিথ্যা মামলা করেছে, তখন মিতুর উপরে শারীরিক নির্যাতনের জন্য একটি জিডি করা হল। কিন্তু ফেসবুকে শেয়ারের বন্যায় সত্যটা তো কারও চোখেই পড়ছিলনা।

মিতুকে থানায় নিয়ে যাওয়া হল। মিতু এখন কেমন আছে কেউই জানিনা। হয়ত নিরাপদেই আছে, কারণ অন্য কোন জায়গায় নেয়া হলে তাকে মেরেই ফেলা হত। এবং তার দোষ কি? সে আকাশকে প্রচন্ড ভালবাসত, এবং ভাবত সময়ই সবকিছু ঠিক করে দিবে। আকাশও মিতুকে প্রচন্ড ভালবাসত, কিন্তু তার বদমেজাজ এবং জিদ তাকে দিয়ে যে কাজটা করালো, সেটা যে কোনভাবেই, কোনকিছুর সমাধান না, সে বুঝতে পারল না.

এসবের কারণে মিতুর যদি কিছু হয়, তার দায় কে নেবে?

আকাশ যে পথটি বেছে নিয়েছে, সেটা কোনভাবেই কোন কিছুর সমাধান ছিলনা। কিন্তু মিতুর সাথে যদি কোন রকম অবিচার করা হয়, তাহলে সেটা কিসের সমাধান হবে? ফেসবুকে হাজার হাজার কমেন্ট, হাজার হাজার শেয়ার যদি মিতুর মুখের পাঁচটা সেলাই, এবং শরীরের নির্যাতনের দাগগুলোর চেয়ে বেশি ভারী হয়, তাহলে আমাদের সমাজে একটি নারীর মর্যাদা কোথায় সেটা ভালভাবেই বুঝা যায়। শুধু এতটুকুই অনুরোধ, ঘটনা জানলে পুরোটা জানবেন। বুঝতে চাইলে দুটো মানুষকেই বুঝতে চাইবেন। তাহলে হয়ত মিতু নামের একটি ভালবাসার এবং কম্প্রোমাইজ করা মেয়ের এবং তার পরিবারের জীবনটা সামলে উঠবে।

লেখক: তানজিলা হক চৌধুরী মিতুর বোন

(লেখকের ফেসুবক থেকে নেওয়া)

apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত