Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৯, ১২ চৈত্র ১৪২৫
  • ||

মহানায়কের অনুপ্রেরণাদায়িনী ফজিলাতুন্নেছা

প্রকাশ:  ০৮ আগস্ট ২০১৮, ১৫:২১
শফী আহমেদ
প্রিন্ট icon

৮ আগস্ট বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৯ তম জন্মদিন। বাঙালি জাতির জন্য একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম সূচিত হয়েছিল মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, সেই আন্দোলন কাল পর্বে সংগ্রামের ধারায় শেষ পর্যন্ত বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে যায় চূড়ান্ত সংগ্রামে। যার ফলশ্রুতিতে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করি কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন বাংলাদেশ।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ম শেখ হাসিনার গর্ভধারিনী মা। বেগম মুজিবের শুভ জন্মদিনে তাঁকে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।

বায়ান্ন থেকে একাত্তর অবধি যে সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল, সেই সংগ্রামে বেগম মুজিব, বঙ্গবন্ধু মুজিবের পিছনে ছায়ার মত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বেগম মুজিবের অনানুষ্ঠানিকভাবে যখন বিয়ে হয় তখন তাঁর বয়স ছিল ৩ বছর, আর বঙ্গবন্ধুর বয়স ছিল ১০ বছর। পৃথিবী তখনো বর্তমান সভ্যতার আলোকিত পর্বে উদ্ভাসিত হয়নি। তবুও শৈশব থেকে চির সংগ্রামী মুজিবকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যিনি আগলে রেখেছিলেন অপার মমতা ও ভালবাসা দিয়ে, সংগ্রামের সাহস দিয়ে, তিনি হচ্ছেন বেগম মুজিব। যাঁর ছিল না কোন লোভ, মোহ, যিনি চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু মজিব আপোষহীন দৃঢ়তায় এক মহান জাতীয়তাবাদী নেতার নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের যে নবধারা সূচিত হয়, সেই থেকে শুরু করে ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অবধি বেগম মুজিব এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা একে একে সেই ঘটনাবালির কিছু কিছু আলোকপাত করি। বাঙালি জাতির একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল বাহন ছিল বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াস ঘটিত হয়েছিল, এ নিউক্লিয়াসের যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা বঙ্গবন্ধুর অনুমোদনক্রমে সংগঠন, আন্দোলন এবং সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে আপোষহীন ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই ছাত্র তরুণ সমাজের প্রধান এবং সর্বাত্মক প্রেরণার উৎসস্থল ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে নেতৃত্বের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের মধ্যে যখনেই কোনো সংকটের কাল ছায়া ঘনিভূত হয়েছে, বেগম মুজিব সেই কাল ছায়া দূর করার জন্য পর্দার অন্তরালে থেকে দৃঢ়, কৌশলী এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন।

এ আমার কথা নয়, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যাঁরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তাঁদের সঙ্গে ঘরোয়া আলাপচারিতায় এ সত্য এবং বস্তুনিষ্ঠ কথাগুলো বারবার উঠে এসেছে। কিন্তু ইতিহাস তা লিপিবদ্ধ করেনি। উত্তরাধিকার সূত্রে বেগম মুজিব যতটুকু অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছিলেন তার পুরোটাই তিনি ব্যয় করেছেন নিঃস্বার্থভাবে সংসার এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত রাজনীতির পিছনে। তিনি একদিকে কিছু কিছু টাকা জমিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য যে প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ দেওয়া হত সেই প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে পরিবারের জন্য বঙ্গবন্ধু ভবন খ্যাত ৩২ নম্বর বাড়িটির কাজ সুসম্পন্ন করেন।

পুত্রসম ভাগ্নে শহীদ শেখ ফজলুল হক মনি নিজ পুত্র শহীদ শেখ কামাল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, শহীদ শেখ জামাল এবং কনিষ্টপুত্র শেখ রাসেলের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার সব দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করেছেন। আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের পিছনে যতটুকু আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল, তাও তিনি করেছেন। ছাত্র এবং তরুণদের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি নিয়ে কখনো কখনো বিভেদ মাথাচারা দিয়ে উঠেছিল। সেই বিভেদও তিনি একজন দক্ষ সংগঠক ও নেতা যেমনভাবে সমাধান করে ঠিক তেমনভাবে সমাধান করেছিলেন। এটিও ইতিহাসের এক অনুল্লিখিত অধ্যায়।

১৯৬২ সালের সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যখন অন্দোলন শুরু হয় তার কিছুদিন পরেই বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। সেই সময়ে আন্দোলন পরিচালনা ও নির্দেশনা দিতেন বঙ্গবন্ধু প্রেরিত বার্তা মোতাবেক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বেগম মুজিব। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করেন, তখন সেই ৬ দফার আলোকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা রাখে সেই নেতৃবৃন্দের পেছনেও বেগম মুজিব ছিলেন ছায়ার মত।

৬ দফা কেন্দ্রীক আন্দোলন প্রচার প্রপাগান্ডার মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালি জনগোষ্ঠীকে এক লৌহ কঠিন ঐক্যের কাতারে নিয়ে আসে। তৎকালীন, বর্তমান ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা ছড়িয়ে পরেন শ্রমিক ও শিল্পাঞ্চলে। সেখানেও শ্রমিক আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। প্রচারধর্মী আন্দোলন এক পর্যায়ে রাজপথের আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। এর বিষ্ফোরণ ঘটে ৬ দফার আলোকে আহুত শ্রমিক ধর্মঘটে, যে আন্দোলনে শহীদ হন শ্রমিক নেতা মনু মিয়াসহ অনেক শ্রমিক। আন্দোলন ছড়িয়ে পরে সকল শিল্পঞ্চলে। কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না যে সেই অন্দোলনেও বেগম মুজিবের সূচিন্তিত ও দৃঢ় মনোভাব আন্দোলনকামীদের উৎসাহ যুগিয়েছিল। আন্দোলন দমন করতে না পেরে সামরিক শাসক আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব) দায়ের করে।

বঙ্গবন্ধু প্রেফতার হয়ে আবারো কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। বাঙালির জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের এই কঠিন পর্যায়ে দলের মধ্যে সুবিধাবাদী ও আপোষহীন ধারার বিভাজন রেখা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বেগম মুজিবের অনুপ্রেরণায় তৎকালীন, সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগ নেতারা এই আপোষকামী ধারাকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মোকাবেলা করে আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যায়। ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ছাত্র জনতার পক্ষে ঐতিহাসিক ময়দানে ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ইতিহাসের বরমাল্য ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধীতে ভূষিত করেন। এই বরমাল্য বরণ করে বঙ্গবন্ধু এগিয়ে যান সত্তরের নির্বাচনের দিকে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানের প্রাক্কালে সামরিক জান্তা একের পর এক হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। জান্তার গুলিতে শহীদ হন আগরতলা মামলার আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হক। ছাত্র জনতা রাজপথে নেমে আসে, ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সেই মিছিলে স্লোগান উঠে ‘জহুর জহুর জ্বাল আগুন যায় না যে সহা’। শহীদ হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক শামসুজ্জোহা। আসাদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয় কবি লেখেন ‘আসাদের রক্তমাখা শার্ট আমার পতাকা’। শহীদ হন নব কুমার ইন্সটিটিউটের দশম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর। ছাত্র জনতা অগ্নিসংযোগ করে বিচারপতির বাসভবন এবং তৎকালীন দৈনি পূর্ব পাকিস্তান পত্রিকা অফিসে, ভেসে যায় পাকিস্তানী জান্তার সর্বশেষ দোসরদের ঠিকানা।

ইতিহাসের এই পর্যায়ে বেগম মুজিব এক দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন যা কি না ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখা উচিৎ ছিল। সামরিক জান্তা আইয়ুবের কাছ থেকে প্রস্তাব আসে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে গোল টেবিল আলোচনায় বসার জন্য সেই সময়কার বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন নেতৃত্ব ও ছাত্র তরুণদের দৃঢ়তা বেগম মুজিবের দৃঢ়তার সঙ্গে একিভূত হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের কতিপয় প্রভাবশালী নেতা বঙ্গবন্ধু ভবন ৩২ নাম্বারে বেগম মুজিবের কাছে ছুটে আসেন। প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব মেনে নেওয়ার জন্য। কিন্তু বেগম মুজিব এক অনমনীয় দৃঢ় মনোভাব প্রদর্শন করেন । পরবর্তীতে বেগম মুজিব কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন এবং প্যারোলে মুক্তি না নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। সেই অনুরোধের মধ্যে অসম্ভব দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

সামরিক জান্তা রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিল শেখ মুজিব পেরোলে মুক্তি পাচ্ছেন এবং আলোচনায় যোগ দিচ্ছেন। প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় পাকিস্তানী শাসকের সমস্ত পরিকল্পনা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, কিন্তু পাকিস্তানীরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা শুরু করে। শুরু হয়ে যায় পূর্ববাংলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব। ভেতরে ভেতরে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জাতির উপর ইতিহাসের এক ন্যাক্কারজনক নগ্ন হামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ২৫ মার্চের কাল রাতে সেই হামলার সূচনা হয়।

শুরু হয় চূড়ান্ত মুক্তির সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিমপাকিস্তানে, বেগম মুজিব, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেলকে । বঙ্গবন্ধু পুত্র শহীদ শেখ কামাল ও শেখ জামাল পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নয় মাস রত্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা লাভ করে। আমরা পাই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। বেগম মুজিব পরিবারসহ মুক্ত হন মিত্র বাহিনীর সহায়তায়। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাযজ্ঞের মুহূর্তটি পর্যন্ত বেগম মুজিব তাঁর নির্লোভ ভূমিকার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের যে কাল রাতে স্বাধীনতা বিরোধীরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে সে সময়েও অর্থাৎ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেগম মুজিব ছিলেন ইতিহাসের কালজয়ী এক মহানায়কের অনুপ্রেরণাদায়িনী হিসেবে। বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে ধাপে বেগম মুজিবের অবদান বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রীর মাতা হিসেবে নয়; একজন নীরব দক্ষ সংগঠক যিনি ধূপের মতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে হিমালয় সম আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। ইতিহাসে বেগম মুজিবের এই অবদান যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে লিপিবদ্ধ হওয়া উচিত।

পুনশ্চ: বেগম মুজিবের জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইল সশ্রদ্ধ সালাম।

লেখক: কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতা।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব,জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী,শেখ হাসিনার গর্ভধারিনী মা,বেগম মুজিব,জন্মদিন
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত