• বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
  • ||

আওয়ামী লীগে ইল্যুশন

প্রকাশ:  ১৮ আগস্ট ২০২৩, ২৩:৫০
সৈয়দ বোরহান কবীর

ইল্যুশন হলো ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণ। একটা জিনিস যেভাবে আছে, সেভাবে না দেখে অন্যভাবে দেখা। আপনার সামনে একটা সাপ আছে। কিন্তু ইল্যুশনের কারণে আপনি তাকে দড়ি মনে করছেন। আবার আপনাকে যা বলা হচ্ছে, আপনি তা না শুনে শুনছেন অন্যকিছু। আরো সহজ করে বলতে হয়, মানুষ তার চোখ, কান, নাক কিংবা ত্বকের মতো মানব ইন্দ্রিয় থেকে সংবেদন বা SENSATION পায়। মস্তিস্ক যখন ঐ সংবেদন সঠিক ভাবে প্রক্রিয়াজাত বা PROCESS করতে পারে না তখন আমরা দেখি একরকম আর মস্তিস্ক আমাদের বুঝায় অন্যরকম। আমরা ঘ্রাণ পাই একরকম কিন্তু বুঝি অন্যকিছু। আমরা শুনি এক আর বুঝি আরেক। আমরা স্পর্শ পাই এক জিনিসের আর মস্তিস্ক বোঝে অন্যজিনিস। এটাই হচ্ছে ইল্যুশন।

ইদানিং আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে তাতে আমার মনে হয় দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে দলটি কি ইল্যুশনে আক্রান্ত?

চারপাশে যা ঘটছে আওয়ামী লীগের মস্তিস্ক কি তা ঠিকঠাক মতো দেখতে পাচ্ছে? অনুভব করছে? সত্যি সত্যি চারপাশের সবকিছু যদি সরকার সঠিক দেখতো তা হলে তো এতো নির্লিপ্ত থাকার কথা না। সব বাস্তবতাকে এভাবে উপেক্ষা করারও কথা না। এই যেমন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কথাই ধরা যাক। পালা করে একেক মাসে একেক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নতুন রেকর্ড করেই যাচ্ছে। কখনো চিনি, কখনো পিয়াঁজ, কিংবা কাঁচামরিচ। এখন ডিম নিয়ে অস্থিরতা চলছে। বাজারে ডিমের সংকট নেই কিন্তু হু হু করে ডিমের দাম বাড়ছে। ডিম নিয়ে এখন রঙ্গতামাশা শুরু হয়েছে। আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী যেন সিন্ডিকেটের ‘পোষাপাখী’। যেকোন পণ্যের দাম যখন বাড়ে তখন গণমাধ্যম সহ অংশীজনরা সিন্ডিকেটের দিকে আঙ্গুল তোলেন। সবাই বুঝতে পারে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মুষ্টিমেয় একটি চক্রের কারসাজি। বাণিজ্যমন্ত্রী বোকা বোকা চেহারায় সিন্ডিকেটের কথা স্বীকার করেন। কিন্তু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বললেই বাণিজ্যমন্ত্রী অস্থির হয়ে ওঠেন। রক্তিম আভা মুখে ছড়িয়ে বলেন ‘না, না সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’ সিন্ডিকেট যেন সরকারের চেয়েও শক্তিশালী। মন্ত্রীর অভয়বাণীতে আত্নহারা সিন্ডিকেট দূর্বৃত্তরা একেক সময় একেক পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এদের বিরুদ্ধে বলার কেউ নেই। বাণিজ্য মন্ত্রী ইল্যুশনে। এজন্য সিন্ডিকেটে জড়িতদের তিনি শত্রু মনে করছেন না। ভাবছেন আপনজন। আপনজনের বিরুদ্ধে কিভাবে কঠোর হওয়া যায়?

অর্থপাচার করে দেশের অর্থনীতির সর্বনাশ করছে কিছু দূর্বৃত্ত। প্রতিদিন সংবাদপত্রে এদের লুটতরাজের খবর দেখি। কে কিভাবে আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছে, তার খবর আজকাল আমাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে মাঝেমধ্যে শিহরণ জাগায়। এদের কেউ কেউ আবার সরকারের ঘনিষ্টজন। প্রায়ই এদের চেহারা রঙ্গিন টেলিভিশনে ভেসে ওঠে। সাধারণ মানুষ এসব লুটেরাদের চেহারা দেখলেই নানা রকম বিশ্রী মন্তব্য করে। কেউ কেউ বলেন, আওয়ামী লীগ বা সরকারের বৈঠকে এদের চেহারা দেখলেই আওয়ামী লীগের ভোট কমে। দেশের সব মানুষের চোখে এরা লুটেরা, দেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু আওয়ামী লীগের কারো কারো কাছে এরা সফেদ মানুষ, আওয়ামী লীগের আপনজন। এটাই ইল্যুশন।

ডেঙ্গু ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পর্যন্ত বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয় পরিস্থিতিকে নিশ্চয়ই স্বাভাবিক দেখছে। না হলে তাদের কোন উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নেই কেন? খারাপ পরিস্থিতিকে ভালো দেখা একটি চমৎকার গুণ যদিও তা ইল্যুশন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ‘মিউজিক্যাল পিলোর’ খেলার মতো দায় চাপিয়ে দিচ্ছে সিটি কর্পোরেশনের উপর। সাফ বলছে, মশা মারা আমাদের কাজ না। তাইতো, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় কি মশা মারা কেরানী হবেন নাকি?

ঢাকায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য দুই সিটি কর্পোরেশন করা হয়েছে। নাগরিক সুযোগ সুবিধা অবশ্য বাড়েনি। তবে দূর্নীতির প্রতিযোগিতা বেড়েছে। দুই সিটির দুই নগর পিতা মশা দেখেন না। ইল্যুশনে মশার বদলে তারা টাকা দেখেন কিনা আমি জানিনা। ইল্যুশনে দুই মেয়র মশার বদলে টাকা দেখুন না দেখুন, সিটি কর্পোরেশনকে তারা মোটামুটি টাকা বানানোর মেশিন বানিয়ে ফেলেছেন। মশা মারতে ব্যাকটেরিয়া আমদানীতে নজিরবিহীন জালিয়াতির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের কথা বলে ব্যাকটেরিয়া আমদানী করা হয়েছে চীন থেকে। ইল্যুশনে কি ঢাকা উত্তরের মেয়র মহোদয় চীনকেই সিঙ্গাপুর দেখেছেন? হতে পারে। না হলে এরকম প্রতারণা কিভাবে সম্ভব? দুই মেয়র জনগণকে মানুষ মনে করেন কিনা জানিনা। কিন্তু তারা মাঝে মধ্যে যেসব কথাবার্তা বলেন, যেভাবে ডেঙ্গু মশা দেখতে বাসাবাড়ীতে গিয়ে সাধারণ নিরীহ মানুষকে অপমান করেন, তাতে মনে হয় ইল্যুশনের জন্য তারা মানুষের বদলে গাধা দেখেন। গাধাকে তো যা ইচ্ছা তাই বলা যায়। সবই ইল্যুশনের খেলা।

আঠারো হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল সংযোগ। ওমা, একি কান্ড শেষ হবার আগেই রেললাইন বেঁকে গেছে। এখন বলা হচ্ছে পরিকল্পনায় ভুল, নকশায় ত্রুটি। তাহলে ভুল পরিকল্পনা করলেন কারা, ভুল নকশার দায় কার? কারো না। সব ইল্যুশন।

ইল্যুশনে আওয়ামী লীগ সরকার এখন বাস্তবে যা, তা দেখছে না , দেখছে অন্যকিছু। ফলে, গত ১৫ বছরের উন্নয়ন অভিযাত্রা আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এক গ্লাস দুধ নষ্ট করার জন্য যেমন এক চিমটি চুনই যথেষ্ট, তেমনি সরকারের ভালো কাজ, বড় অর্জন গুলোকে নষ্ট করছে কিছু বেপরোয়া দূর্নীতি। হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তি দূর্নীতির উৎসবে মেতেছেন। এই কয়েকজনকে সরকারের ভেতর থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেই জনগণ শান্তি পেত। সরকারের উপর আস্থা ও বিশ্বাস বাড়তো। কিন্তু এই দূর্বৃত্তদের আওয়ামী লীগ সরকার বন্ধু মনে করছে। ভাবখানা এমন যে তাদের ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার অচল। ইল্যুশন।

বাজারে ঊর্ধ্বগতি, উন্নয়নের নামে লুটপাট-দূর্নীতি, জনজীবনে সৃষ্টি করেছে শঙ্কা এবং অস্বস্তি। এসময় সরকারের কাজ হলো, সমস্যার দিকে তাকানো, সমস্যার শেকড়ে গিয়ে তার মূল উৎপাটন করা। কিন্তু সরকারের একটি অংশ যেন ইল্যুশনে। তারা সমস্যা দেখছে না। তারা দূর্নীতি দেখছে না। তাদের ‘ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণে’ আওয়ামী লীগে তৃপ্তির ঢেকুর।

গত ১৫ বছর টানা ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন। বিশেষ করে প্রথম এক দশকে বাংলাদেশ সত্যি বদলে গেছে। মানুষ আস্তে আস্তে স্বপ্ন দেখতে শিখেছে। বড় হয়েছে স্বপ্নের সীমানা। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগে শুরু হয় ইল্যুশন। লুটেরারা মাঠে নামে। বাংলাদেশের উন্নয়নের তরতাজা চেহারাটা এখন রোগাক্রান্ত, বিবর্ণ। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের অনেকেই তা দেখছেন না। ইল্যুশন।

২০১৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের মধ্যে একলা চলো নীতি লক্ষ্য করা যায়। আওয়ামী লীগের অহংকার বেড়ে যায়। কোন কোন নেতা জনগণকে ক্রীতদাস ভাবতে শুরু করেন। আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের মধ্যে এরকম ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের কোন দরকার নেই। পুলিশ আমাদের, আমলা আমাদের, আর কি চাই। জনগণ কোন ছাই? আওয়ামী লীগের মধ্যে এই ব্যাধি এখন পল্লবিত হয়েছে তৃণমুলেও। জনগণের সাথে খারাপ ব্যবহার, জনবিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি নয়। কিন্তু ইদানিং আওয়ামী লীগের অনেকের মধ্যে এই প্রবণতা মহামারীর মতো ছড়িয়ে পরেছে। এক শ্রেণীর আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধি যেন ইল্যুশনে। তারা জনগণের বদলে গরু-ছাগল দেখছেন।

আওয়ামী লীগের ভালো চেয়ে যারা সরকার এবং দলের ভুলত্রুটি গুলো ধরিয়ে দেন, তারা এখন আওয়ামী লীগ এবং কতিপয় ব্যক্তির চক্ষুশূল। তাদের শুভাকাঙ্খী হিসেবে দেখা হয় না। দেখা হয় শত্রু হিসেবে। সেই ইল্যুশন।

গনতন্ত্র এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে দেশে বিদেশে চলছে নানা ষড়যন্ত্র। নির্বাচন বানচালে তৎপর একটি মহল। সংকট ক্রমশ: ঘনীভূত হচ্ছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের কারো কারো মধ্যে সংকট উপেক্ষার তীব্র প্রবণতা। কিছু হবে না, এমন একটা ভাব করো কারো মধ্যে। কেউ কেউ মনে করছেন, কারো কোন দায়িত্ব নেই। শেখ হাসিনা সব ঠিক করে দেবে। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা-কর্মীদের মধ্যে এখন দ্বৈতস্বর্তা। একান্তে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় তাদের হা-হুতাশ রীতিমতো যেন আর্তনাদ। আবার বাইরে তারা হুংকার দিচ্ছেন। আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে, কেউ ঠেকাতে পারবেনা-এমন প্রকাশ্যে উচ্চারণ আওয়ামী লীগের নেতারা এখন ঘটা করে দিচ্ছেন। কেউ সত্যের মুখোমুখি হচ্ছেন না। কেউ যেন প্রকৃত পরিস্থিতি উপলব্ধি করছেন না। কিছু ত্যাগী পরীক্ষিত নেতা কর্মী ছাড়া সবাই যেন এক ভ্রান্তির মধ্যে।

আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগই। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। জাতীয় শোকদিবসে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের উপর চড়াও হয়েছে। কোথাও কোথাও ঘটেছে সহিংসতা। সর্বশেষ কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি, দলের নেতা-কর্মীদের আসল রোগ চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, একে অন্যের বিরুদ্ধে কথা বলবে, কুৎসা রটালে মনোনয়ন দেয় হবে না। বিএনপি কিংবা জামায়াতকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবেলার সময় কই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের? সবাই ব্যস্ত প্রতিপক্ষ মনোনয়ন প্রত্যাশীকে ঘায়েল করতে। ইল্যুশনে আওয়ামী লীগের এমপি প্রত্যাশীরাও। তারা জামায়াত-বিএনপিকে শত্রু হিসেবে দেখেন না, শত্রু হিসেবে দেখছেন নিজ দলের রাজনৈতিক সহকর্মীকে। এভাবেই চলছে সব কিছু। অন্ধকারে ভয়ার্ত নৈশ প্রহরীর মতো আওয়ামী লীগের নেতারা চিৎকার করে বলছেন ‘হুশিয়ার, সাবধান।’ কিন্তু তারা ভালো করেই জানেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই ত্যাগী, লড়াকু কর্মীরা এখন আর নেই। আওয়ামী লীগের ইদানিং কর্মীরা কেতাদূরস্থ, ধবধপে পাঞ্জাবী পরে তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় চলাচল করেন। মাঝে মধ্যে মিছিল-মিটিং বেরুলে তাদের সান ব্লক লাগাতে হয়। রাস্তায় লড়াই করার দম নেই তাদের। এরা আবার স্বপ্ন দেখছে, ক্ষমতায় আসার। কিন্তু আগামী চার মাস আওয়ামী লীগ সরকারকে যে দূর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে, তা অনেকে চিন্তাও করতে পারছে না। আওয়ামী লীগকে সবার প্রথম তাই ইল্যুশন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সাদাকে যদি সাদা না দেখে, তাহলে রঙীন খোয়াবে হাবুডুবু খেয়েই বিপর্যয়ের শেষ সীমা স্পর্শ করবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলটি।

লেখক- নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত ই-মেইল: [email protected]

সৈয়দ বোরহান কবীর
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close