• শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
  • ||

নির্বাচন বনাম অনির্বাচিত সরকার

প্রকাশ:  ১৭ নভেম্বর ২০২৩, ২৩:৫৯
সৈয়দ বোরহান কবীর

গত ১৫ নভেম্বর বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন। আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি ভোটের দিন। এবার জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করা হলো এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে। তফসিলের দিন বিএনপি অবরোধ ডেকেছিল। তফসিল ঘোষণার পরদিন ১৬ নভেম্বর কয়েকটি বাম দল হরতাল ডাকে। যদিও এসব অবরোধ এবং হরতাল এখন আর কেউ মানে না, কিন্তু জনমনে কিছুটা হলেও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। বিএনপি নির্বাচনের তফসিল প্রত্যাখান করেছে। বিএনপির সাথে সুর মিলিয়ে কিছু সাইনবোর্ড সর্বস্ব দলও এই নির্বাচনী তফসিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে তফসিল ঘোষণার পরপরই আওয়ামী লীগ দেশের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিল করেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনী তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছেন।

গত ২৮ অক্টোবর থেকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সহিংস আন্দোলন করেছে বিএনপি। ২৮ অক্টোবর থেকেই পুরনো রূপে ফিরে গেছে দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি। পুলিশ কনস্টেবলকে পিটিয়ে হত্যা করা, হাসপাতাল হামলা, প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা কোন রাজনৈতিক দলের কাজ নয়। কিন্তু বিএনপি এরকম সন্ত্রাসী তৎপরতাই বেছে নিয়েছে দাবি আদায়ের জন্য। কিন্তু এপথে যে দাবি আদায় বা সরকারের পতন হবে না এটি বোঝার জন্য পন্ডিত হবার দরকার নেই। শুরুতেই বিএনপির আন্দোলন মুখ থুবড়ে পরেছে। বলা হচ্ছিল তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে বিএনপি চমক দেখাবে। সারাদেশ অচল করে দেবে। কোন কোন গণমাধ্যমে বিএনপি অসহযোগ আন্দোলনের যেতে পারে বলেও খবর দিচ্ছিল। কিন্তু জনগণ সমর্থন না দিলে কঠোর আন্দোলন যে নির্মম কৌতুকে পরিণত হয়, বিএনপির এবারের আন্দোলন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বিএনপি অবশ্য নিজেদের শক্তিতে কিংবা জনগণের সমর্থনে সরকার পতনের খোয়াব দেখেনি। বরং তারা মনে করতো কোন ম্যাজিক হবে। সাত-সমুদ্দুরের ওপার থেকে কোন দেবদূত আওয়ামী লীগের কল্লা ছিঁড়ে খাবে। গত দুবছর ধরেই এমন আলামত দেখা যাচ্ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উপর নাখোশ এমন একটি মনোভাব গত দুবছর ধরেই গুঞ্জারিত হচ্ছিল আকাশে-বাতাসে।

গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র। র‌্যাবের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বাংলাদেশে নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষণা করেছে ভিসানীতি। গত সেপ্টেম্বরে এই ভিসানীতি কার্যকর হয়েছে বলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হয়। এই সময়ে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে ঢাকায় এসেছেন একাধিক মার্কিন প্রতিনিধি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতি আগ্রহে আওয়ামী লীগ উৎকণ্ঠিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি সহ একাধিক নেতা বিরক্তি প্রকাশ করতেও কার্পণ্য করেননি। অনেকেই মনে করেন, এবার যুক্তরাষ্ট্র দেখে নেবে। ২০১৪ কিংবা ২০১৮’র মতো কোন নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কত প্রকার ও কি কি নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে তার তালিকা বুক পকেটে নিয়ে অনেকে টকশোতে তোলপাড় করেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কেউ কেউ বাংলাদেশে একটি অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে চায়। এই যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা তখন তাদের একান্ত অনুগত সুশীল এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। তারা তো আরেকটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসছে এই খুশীতে আত্মহারা হয়ে উঠেছিলেন। সুশীলদের কেউ কেউ নতুন স্যুট টাই পর্যন্ত কিনে ফেলেছিলেন। কিন্তু এতো আয়োজন, এতো মহড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে কিংবা আরো নির্দিষ্ট করে বললে শেখ হাসিনাকে টলাতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সংবিধান সম্মত ভাবে নির্বাচনের প্রশ্নে অটল থেকেছে। নানা প্রলোভন হুমকি উপেক্ষা করেছে। শেখ হাসিনা যদি এরকম দৃঢ় এবং আত্মপ্রত্যয়ী না থাকতেন, তাহলে হয়তো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাই হতো না। দেশ এক অনিশ্চয়তার অন্ধকার টানেলে প্রবেশ করতো। বিশেষ করে নির্বাচন তফসিল ঘোষণার আগে পিটার হাসের তৎপরতায় অনেকে শঙ্কিত হয়েছিলেন। ডোনাল্ড লু এর চিঠি নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত তফসিল ঘোষণার দিন সকালেও গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের অফিসে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল সংলাপ না তফসিল কোনটা আগে। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন এবং সরকার জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা সুখের নয়। নির্বাচনের তফসিল পেছানো, তফসিল ঘোষণার পরও নির্বাচন না হওয়া বাংলাদেশে নতুন নয়।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারিও একটি জাতীয় নির্বাচন হবার কথা ছিলো। কিন্তু নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা দখল করে। নির্বাচন পিছিয়ে যায় দুই বছর। কাজেই তফসিল ঘোষণা মানেই নির্বাচন হয়ে যাবে, এমন ভাবার কোন কারণ নেই। আগামী ৫০ দিন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খেলা শেষ হয়ে গেছে বলে যদি কেউ মনে করেন তাহলে ভুল করবেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আসলে খেলা শুরু হলো। আগামী ৫০ দিন এদেশে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। বিএনপির হরতাল অবরোধ কেউ মানছে না, তাই তারা হাল ছেড়ে দেবে— এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। ইতোমধ্যেই তারা আন্দোলনকে সন্ত্রাসের চোরাগলিতে নিয়ে গেছে। সামনে তারা চোরাগুপ্তা হামলা, টার্গেট কিলিং বাড়াবে, এটা নিশ্চিত। তাদের অনেক ক্যাডাররাই ঘাপটি মেরে বসে আছে বলে খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে, দীর্ঘ ৫ বছর পর বিএনপি-জামায়াতের প্রকাশ্য প্রেম নতুন শঙ্কা তৈরী করেছে। জামায়াত একটি সশস্ত্র ক্যাডার ভিত্তিক সংগঠন। এই সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক গুলো জঙ্গি সংগঠনের জন্ম হয়েছে। এরা যে মাঠে নামবে না, তা কে নিশ্চিত করে বলতে পারে। নির্বাচনের আগে বড় ধরনের নাশকতা করে বিএনপি-জামায়াত যে গণতন্ত্রকে বিপন্ন করতে পারে, এই আশঙ্কা অমূলক নয়। জনগণের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা হবে। ভয়ে এবং অনাগ্রহে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যাবে না। নির্বাচন হবে প্রশ্নবিদ্ধ। তখনই পশ্চিমারা হৈ চৈ শুরু করবে। নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেবে না। সৃষ্টি হবে গ্রহণযোগ্যতার সংকট। এমন পরিকল্পনার কথাও কান পাতলেই শোনা যায়। জাতীয় পার্টি যদি নির্বাচন প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত বিভক্ত হয়, তাহলে ভোট উৎসব আরো বিবর্ণ হবে। যারা বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, তাদের টার্গেট ভোটকে তামাশা বানানো। এই নির্বাচনে এরকম এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা হবে। এরকম ঘটনা ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক মহলকে তারা হস্তক্ষেপে প্ররোচিত করবে তারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও কি এতো সহজে হাল ছেড়ে দেবে? বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নির্বাচন হবে আর যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেবে? যুক্তরাষ্ট্র চুপ-চাপ থাকাও অনেক সময় বিপদজ্জনক।

গত ১০ নভেম্বর দিল্লীতে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠক হয়েছে। সেখানে দুই প্রভাবশালী দেশ একমত হয়নি। তাই তফসিল ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতার ভয়ঙ্কর অর্থও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র কি করবে, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে আগামী নির্বাচন শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে হওয়া না হওয়া অনেকটাই নির্ভর করবে মার্কিন মনোভাবের উপর। বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন কৌশলের উপর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে আশার কথা হলো বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংগ্রাম এখন আমাদের একার নয়। ৭১ এর বন্ধুরাও আছে বাংলাদেশের সঙ্গে। এই লড়াইয়ে কে জেতে তা জানার জন্য অপেক্ষা কতে হবে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। এখন যুদ্ধটা খুব স্পষ্ট। কিন্তু এই যুদ্ধে আওয়ামী লীগকে সতর্ক থাকতে হবে। অতি উৎসাহীরা যেন ভোট কারচুপি বা বিনা ভোটে এমপি হবার আত্মঘাতী চেষ্টা না করেন, সেজন্য সজাগ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন নিয়ে দেশ দুই ভাগে বিভক্ত। একপক্ষ চায় অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় আনতে। আবার অসাংবিধানিক যুগে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে। এজন্য তারা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবে। অন্যপক্ষ চায়, গণতন্ত্র এবং সংবিধান সুরক্ষা করতে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচন এখন আর কোন দলের জয় পরাজয়ের বিষয় নয়। গণতন্ত্র থাকা না থাকার নির্বাচন।

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

সূত্র: বাংলা ইনসাইডার

সরকার,নির্বাচন,সৈয়দ বোরহান কবীর
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close