• সোমবার, ২২ জুলাই ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১
  • ||

ছাঁটাই মন্ত্রী, ফেল করা এমপি এবং জনগণের স্বস্তি

প্রকাশ:  ১৩ জানুয়ারি ২০২৪, ০২:২৫
সৈয়দ বোরহান কবীর

১০ জানুয়ারি রাত সাড়ে আটটার কিছু পর জরুরী কাজে একটি দোকানে গেছি। ঔষধের দোকানে ছোট একটা টিভি। বেশ ক’জন দর্শক জটলা করে গভীর মনোযোগ দিয়ে টেলিভিশন দেখছেন। মন্ত্রী পরিষদ সচিবের প্রেস ব্রিফিং লাইভ সম্প্রচার হচ্ছে। নতুন মন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করছিলেন শীর্ষ এই আমলা। দর্শকদের মধ্যে একজন উল্লসিত হয়ে বললেন, ‘পিঁয়াজ মন্ত্রীরে বাদ দিছে আলহামদুলিল্লাহ।’ আরেকজন বললেন ‘পদ্মরেও বাদ দিছে, এইবার অর্থনীতিটি যদি ঠিক হয়।’ এভাবে নানা মন্তব্য কানে আসতে থাকলো। লক্ষ্য করলাম, মন্ত্রিসভায় কারা এলেন তার চেয়েও মানুষের আগ্রহ কারা বাদ গেলেন। বিশেষ করে অযোগ্য, অর্থব, বিতর্কিত মন্ত্রীদের বাদ পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে রীতিমতো উল্লাস। পারলে এখনই বিজয় মিছিল বের করে।

গত ৫ বছর ধরে কিছু মন্ত্রীর দায়িত্ব জ্ঞানহীন কথাবার্তা এবং কর্মকাণ্ডে মানুষের বিরক্তি চরম সীমায় পৌঁছেছিল। গত ১১ জানুয়ারি গঠিত মন্ত্রিসভায় এদের বেশীর ভাগকেই বাদ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যেন মানুষের হৃদয়ের কথা শুনেছেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করেছেন। এটাই শেখ হাসিনার ম্যাজিক। অযোগ্য এবং ব্যর্থদের দায়িত্ব কেন শেখ হাসিনা নেবেন, কেন আওয়ামী লীগ নেবে, কেন বাংলাদেশ এদের ভার বহন করবে? কিছু কিছু মন্ত্রীর বাদ যাওয়ার ঘটনায় জনপ্রতিক্রিয়াই প্রমাণ করেছে এরা কত ধিকৃত ছিলেন, এটা কি পরিমাণ জনবিরক্তি সৃষ্টি করেছিলেন।

বিদায়ী বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির কথাই ধরা যাক। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান এই ব্যবসায়ী। অনেকেই আশা করেছিলেন, দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সুশৃঙ্খল ভাবে মন্ত্রণালয় চালাবেন টিপু মুনশি। কিন্তু গত ৫ বছরে একের পর বিতর্ক সৃষ্টি করে তিনি ব্যর্থতার নতুন রেকর্ড গড়েছেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অযোগ্যতা ঢাকতে তিনি সিন্ডিকেটের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। আবার সময় সুযোগ মতো নিজের বক্তব্যই অস্বীকার করেছেন। দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষ তাকেই সিন্ডিকেটের হোতা মনে করেছেন। এই ব্যক্তি যদি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেতেন তাহলেই জনগণ সবচেয়ে খুশী হতো। তবে তার মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়াটাকে অনেকেই একটা বিজয় হিসেবে মনে করছেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে, বাণিজ্যমন্ত্রীর পতনে জনগণ কেন উল্লসিত? এর প্রধান কারণ হলো, পাঁচ বছরে এই মন্ত্রী জনগণের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। তার প্রায় সব কাজই ছিলো জনগণের বিরুদ্ধে।

একই রকম অবস্থা হয়েছিল সদ্য সাবেক অর্থমন্ত্রী আ. হ. ম মোস্তফা কামালের ক্ষেত্রেও। গত ৫ বছর দেশবাসী বুঝতেই পারেনি দেশে একজন অর্থমন্ত্রী আছেন। তার দেখা পাওয়াটাই যেন ছিলো এক বিরাট খবর। বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে স্বাধীনতার পর তাজউদ্দিন আহমেদ থেকে শুরু করে আবুল মাল আবদুল মুহিত পর্যন্ত যারাই অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন তাদের প্রত্যেকের বিচক্ষণতা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু বিগত অর্থমন্ত্রী এক্ষেত্রে ছিলেন আশ্চর্য ব্যতিক্রম। দেশের অর্থনীতির দায়িত্ব আমলাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে পাঁচ বছর তিনি বিশ্রামে ছিলেন। অর্থপাচার, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম এবং বিশৃঙ্খলার অবস্থা জাতীয় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। খেলাপী ঋণ সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে সাবেক অর্থমন্ত্রীর জামানায়। অর্থমন্ত্রী কীভাবে স্বপদে বহাল আছেন, এটি ছিলো জাতীয় প্রশ্ন। দেশ, জনগণ এবং দলের প্রতি নূন্যতম দায়িত্ববোধ থাকলে আ. হ. ম মোস্তফা কামাল বহু আগেই পদত্যাগ করতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। আমি আশা করেছিলাম, নিজের অবস্থা বিবেচনা করে তিনি নির্বাচনে দাঁড়াবেন না। নতুনদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেবেন। কিন্তু দুভাগ্য যে, অধিকাংশ মানুষই জানে না কোথায় থামতে হয়। লোটাস কামালও সেই দলে। নতুন মন্ত্রিসভা থেকে তার ছাঁটাই ছিলো রীতিমতো গণদাবী।

শেখ হাসিনা জনগণের দাবী মেনে নিয়েছেন। কিন্তু জাহিদ মালেক জনগণকে বিব্রত করাতে এতটুক ক্লান্ত হননি। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে নিয়ে আমি বহু লিখেছি। লিখতে লিখতে আমি নিজেই ক্লান্ত হয়ে গেছি। ডেঙ্গুর প্রকোপের সময়ে মালয়েশিয়ায় গিয়ে মানিকগঞ্জ আছেন বলে অসত্য তথ্য প্রদান, করোনার সময় সীমাহীন ব্যর্থতা। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ে নজীর বিহীন দুর্নীতি অনিয়ম সকলকে বিস্মিত এবং হতবাক করেছে। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, এসব সমালোচনাকে আমলেই নেননি সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বরং বুক ফুলিয়ে নিজেকে সফল মন্ত্রী হিসেবে দাবী করেছেন। রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে নিজেই নিজেকে সম্বর্ধনাও দিয়েছেন। সত্যি কি বিচিত্র সেলুকাস। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং তার পুত্রের নানা কেচ্ছাকাহিনী গণমাধ্যম প্রকাশিত হয়েছিল নানা সময়ে । তবুও বিভিন্ন সময় শুনতাম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বহাল থাকবেন। শেষ পর্যন্ত জাহিদ মালেক ফেল করেছেন। শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে গোটা জাতি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে।

মন্ত্রিসভা থেকে যে ৩০ জন মন্ত্রী বাদ পড়েছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ.কে আবদুল মোমেন। সত্যি বলতে কি গত পাঁচ বছর সরকার নিয়ে সবচেয়ে বড় ধাঁধাঁ ছিলো কোন যোগ্যতায় মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি কথা বলতেন, পানের দোকানের বাঁচাল বেকারদের মতো। যার কোন কাজ নেই। সারাক্ষণ শুধু বকবক করে। একটা বিষয় আমি লক্ষ্য করেছি যখনই সরকার একটা স্বস্তির অবস্থায় থাকতো তখনই সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটা করে শব্দ বোমা ফাটাতেন। তার বেসামাল কথা বার্তা শেষ দিকে জন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার ইতিহাসে তার মতো অতিকথনের দোষে দুষ্ট কোন মন্ত্রী ছিলেন কিনা আমার জানা নেই।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক কেন বড় নেতা তা আমার কাছে এক রহস্যময় প্রশ্ন। ৯৬ থেকে ২০০১ সালে তিনি সরকারী চাকুরে ছিলেন। এরপর চাকরী ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। টাঙ্গাইলে আবুল হাসান চৌধুরী দ্বৈত নাগরিকত্বের জন্য নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। ঐ আসনে নির্বাচনের মাধ্যমে ড. রাজ্জাক আওয়ামী লীগের এমপি হয়েছিলেন প্রথমবার। এরপর এলাম, দেখলাম জয় করলাম এর মতো তরতর করে এগিয়ে যায় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী কি হননি গত ১৫ বছরে ড. আবদুর রাজ্জাক! বিনিময়ে আওয়ামী লীগের জন্য তিনি কি করেছেন—সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে একটি বেসরকারী টেলিভিশনে দেয়া তার বক্তব্য গোটা জাতিকে হতবাক করেছে। একাই তিনি সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। এরপরও অনেকে বলছিলেন, ড. আবদুর রাজ্জাক আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারক। তাই মন্ত্রিসভায় তার থাকাটা অবধারিত। কিন্তু শেখ হাসিনা প্রমাণ করলেন, জনগণ ছাড়া কেউই তার কাছে অপরিহার্য নয়।

জনগণের হৃদস্পন্দন বোঝেন জন্যই শেখ হাসিনা এখনও জনপ্রিয়। তার কোন বিকল্প নেই। দেশের জনগণ ব্যর্থ, অযোগ্য, মতলববাজ, সুবিধাবাদী আদর্শহীনদের নেতা, জনপ্রতিনিধি কিংবা মন্ত্রীদের পদে দেখতে চান না। একারণেই মন্ত্রিসভা থেকে অযোগ্যদের ছাঁটাইয়ে তারা উল্লসিত।

মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারাধীন বিষয়। কিন্তু নির্বাচন জনগণের পছন্দের বিষয়। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনেও জনগণের এই মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে। হাসানুল হক ইনু, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু কিংবা আবদুস সোবহান গোলাপের পরাজয় যেন জনগণের বিজয়। নির্বাচনের পর এক আড্ডায় এক তরুণ বলছিলেন, আরও দু’চারটা হেরে গেলে খুশী হতাম। আমি পাল্টা প্রশ্ন করি, কেন? উত্তরে ঐ তরুণ বললো, এরা রাজনীতি করে নিজের আখের গোছানোর জন্য, জনগণের জন্য নয়। কথাটা খুব একটা মিথ্যা না। জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনুর কথাই ধারা যাক। নিজের দল নেই। পরগাছার মতো আওয়ামী লীগের সঙ্গে লেপ্টে আছেন। নৌকা ধার নিয়ে এমপি হয়েছেন তিনবার। কিন্তু তারপরও আওয়ামী লীগের প্রতি কোন কৃতজ্ঞতা নেই। সুযোগ পেলেই আওয়ামী লীগকে চেঁপে ধরেন। এবার নির্বাচনের আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে যা করেছেন তা রীতিমতো ব্লাকমেইলিং। পাঁচ বছরের বেশী সময় মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু নিজের জনপ্রিয়তায় এমপি হবার যোগ্যতা টুুকু নেই। ইনুর কথাবার্তা ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, তাকে জেতানোটা আওয়ামী লীগের ‘মহান দায়িত্ব’। জনবিচ্ছিন্ন এসব পরগাছা নেতারা দেশ এবং জোটের জন্য বিপদজ্জনক। ভোটাররা রায় দিয়ে তাকে প্রত্যাখান করেছেন।

এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আবদুস সোবহান গোলাপ পরাজিত হয়েছেন। পরাজয়ের পর তিনি বলেছেন, ‘অলৌকিক’ ভাবে তাকে হারানো হয়েছে। কিন্তু তিনি এটা বলেননি যে আওয়ামী লীগের মতো সংগঠনের নেতা হয়েছেন ‘অলৌকিক’ ভাবেই। আওয়ামী লীগের এবং তার জোটের এই সব অলৌকিক নেতাদের বিরুদ্ধে যে জনগণের যে ক্ষোভ তার এক চিলতে প্রকাশ ঘটেছে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে। ব্যারিস্টার সুমন বা নিক্সন চৌধুরীর বিজয়ে সাধারণ মানুষ যতো খুশী হয়েছে, তার চেয়েও আনন্দিত হয়েছে ইনু-মঞ্জু- গোলাপের ভরাডুবিতে।মন্ত্রিসভা থেকে ব্যর্থদের ছাঁটাই, নির্বাচনে কিছু ব্যক্তির পরাজয়ে সাধারণের আনন্দের কারণ হলো ক্ষোভ এবং বঞ্চনা। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে ক্ষমতাসীনদের প্রতি মানুষের মধ্যে এক ধরনের অরুচি তৈরী হয়। টানা ক্ষমতায় থাকার ফলে অনেকে ক্ষমতার দাপট দেখান ব্যাপক ভাবে। জনগণকে ক্রীতদাস মনে করেন। মন্ত্রী এমপি হওয়াটা তাদের কাছে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের বিষয়। জনসেবা নয়। এরা বিগত দিনগুলোতে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন যথেচ্ছ ভাবে। জনগণের সমস্যার কথা শোনেননি। জনবিচ্ছিন্ন এসব এমপি-মন্ত্রীকে জনগণ ক্ষমতায় দেখতে চায় না। এজন্যই গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মানুষ পরিবর্তন চায়, নতুন মুখ দেখতে চায়। জনগণ যাদের আপন ভাবে না, তাদের পরাজয় দেখতে চায়। শেখ হাসিনা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের প্রার্থী পছন্দের সুযোগ করে দিয়েছেন। এর ফলে যেখানেই মানুষ বিকল্প পেয়েছে, সেখানেই জনবিচ্ছিন্ন, ক্ষমতার দাপট দেখানো, অযোগ্যদের প্রত্যাখান করেছেন। মন্ত্রিসভা গঠনেও জনগণের সঙ্গে একাত্ম হলেন শেখ হাসিনা। গণতন্ত্রের প্রতি তিনি যে শ্রদ্ধাশীল, তা প্রমাণিত হলো আরেকবার।

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ই-মেইল: [email protected]

সৈয়দ বোরহান কবীর
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close