• শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
  • ||

ঝালকাঠিতে এখনও অরক্ষিত বেড়িবাঁধ, ভাঙনের কবলে দুই লাখ মানুষ

প্রকাশ:  ১৫ নভেম্বর ২০২৩, ১৭:০২
পূর্ব পশ্চিম ডেস্ক

সুপার সাইক্লোন ঘূর্ণিঝড় সিডরের ১৬ বছর পার হলেও অরক্ষিত আছে দক্ষিণের উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির বেড়িবাঁধগুলো। এ ছাড়াও, যুগ যুগ ধরে ভাঙছে নদী। ঝালকাঠির নদীতীরের লাখ মানুষ বন্যা-ঝড়ে ভাসে। প্রতি বছরই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নিঃস্ব হচ্ছে শত শত পরিবার। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ভাঙন রোধ আর জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ কার্যকারী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সম্পর্কিত খবর

    একে তো সমুদ্রের উপকূলে, তারওপর চারদিকে নদীবেষ্টিত হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ জেলা ঝালকাঠি। সিডর, আইলা, মহাসেন, বুলবুল আর সিত্রাং-সহ গত এক যুগে বন্যা-ঝড়ে প্রাণহানি ও সম্পদ হারিয়ে দুর্যোগে তাণ্ডবের সাক্ষী এ জেলার মানুষ। কিন্তু দুর্যোগ মোকাবিলায় নদীতীরের মানুষের জন্য টেকসই ব্যবস্থা নেই মোটেও। বিশেষ করে বাঁধ না থাকায় কাঁঠালিয়া উপজেলায় যুগ যুগ ধরে বন্যা-ঝড়ে ভাসছে অসংখ্য মানুষ। আর জেলা সদর, রাজাপুর এবং নলছিটি উপজেলায় নদীতীরের বেড়িবাঁধ ভেঙে জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। ভেসে যাচ্ছে ফসলের ক্ষেত। জেলার সুগন্ধা, বিষখালী, আর গাবখান নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে ভাঙনে বিলীন হচ্ছে জনপদ। নদীর ভয়ানক গ্রাসে নিঃস্ব হয়েছে শত শত পরিবার।

    প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আর জলোচ্ছ্বাসে লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনোপ্রকার কার্যকারী পদক্ষেপ নেই বলে এলাকাবাসীর তীব্র ক্ষোভ। উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠিতে মোট লোক সংখ্যা সাত লাখ। এর মধ্যে নদী নিকটবর্তী এলাকায় দুই লাখ মানুষের বসবাস। আকাশে মেঘ দেখলেই নদীতীরের মানুষের মধ্যে বন্যাআতঙ্ক বিরাজ করে। এই আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন নদীতীরের বাসিন্দারা।

    ইতোমধ্যে সুগন্ধা ও বিষখালীর ভাঙনে জেলার কয়েক শ’ একর ফসলি জমি, গাছপালা, বাড়ি-ঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। মাত্র পাঁচ বছর আগে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেউরি সাইক্লোন সেল্টার কাম প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি এখন বিষখালীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনে ঝালকাঠি সদরের চরকাঠি, ভাটারাকান্দা, কৃষ্ণকাঠি, দেউরী, দিয়াকুল; নলছিটি উপজেলার আমিররাবাদ, বহরমপুর, ষাইটপাকিয়া, মল্লিকপুর, কাজিপাড়া, তিমিরকাঠি, হদুয়া ও রাজাপুরের মঠবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, লঞ্চঘাট, বাদুরতলা, কাচারিবাড়ী বাজার, চল্লিশকাহনিয়া, মানকি সুন্দর সাইক্লোন সেল্টারসহ এসব এলাকার ফসলি জমি, বসতঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় এসব এলাকায় জনমনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। ভাঙনের মুখে রয়েছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা, ঈদগাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙনের শিকার নদীতীরের বাসিন্দারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যে কোনো সময় এসব এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে বলে হুমকির মুখে থাকা বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

    ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সুগন্ধা ও বিষখালী নদীর ২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভাঙনের কবলে পড়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ১১ কিলোমিটার গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ভাঙন রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এজন্য মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প করে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

    নদীতীরের বাসিন্দা কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, এখন আর আগের মতো জমিতে ফসল ফলাতে পারি না। বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রন্ত হচ্ছি আমরা। আমাদের এলাকায় ভাঙন রোধে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।

    রাজাপুরের বিষখালী নদীর তীরের বাসিন্দা জামাল হোসেন বলেন, বিষখালী নদীতে কোনওরকমের বেড়িবাঁধ ছিল। ঘূর্ণিঝড় সিডরে সেই বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এরপর আর মেরামত বা নতুন করে নির্মাণ হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় এলাকা পরিদর্শন করে চলে যান। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নিতে দেখিনি। ফলে আমাদের বাড়ি-ঘর দফায় দফায় ভেঙে নদীতে বিলীন হচ্ছে। এখন নদীর পানিতে ফসল তলিয়েও ক্ষতি হচ্ছে।

    কাঁঠালিয়ার বিষখালী নদীতীরের জয়খালী এলাকার বাসিন্দা মজিবুর রহমান বলেন, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কাঁঠালিয়ায় বাসিন্দারা। নদী যেমন ভাঙছে, তেমন পানিতে ফসলের ক্ষেত তলিয়ে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। আমাদের বাড়ি-ঘর অনেকবার সরিয়ে নিতে হয়েছে নদী ভাঙনের কারণে। লঞ্চঘাট এলাকায় নতুন করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগ এলাকাই অরক্ষিত।

    ঝালকাঠি সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি ডক্টর কামরুন্নেছা আজাদ বলেন, নদীতীরের মানুষের নানান কষ্ট। বন্যা-জলোচ্ছ্বাসে তাদের ঘর-বাড়ি তলিয়ে যায়। বেড়িবাঁধ না থাকায় সামান্য জোয়ারেই পানি ওঠে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচিৎ বেড়িবাঁধগুলো সঠিকভাবে মেরামত করা। যেখানে বেড়িবাঁধ দরকার সেখানে নতুন করে টিকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন।

    ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম নিলয় পাশা বলেন, জেলায় ২৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদী ভাঙন রয়েছে। এর মধ্যে আমরা সাড়ে ১১ কিলোমিটারকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প তৈরি করে পাঠিয়েছি। এই প্রকল্প পাস হলে কাজ করা যাবে।

    সারাদেশ

    অনুসন্ধান করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close