Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • বুধবার, ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১০ মাঘ ১৪২৫
  • ||

নতুন নতুন গবেষণা নিয়ে ভাবতে হবে

প্রকাশ:  ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৪১
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
প্রিন্ট icon

ভাবনা মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভাবনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে চিন্তাশীলতা তৈরি হয়। এই চিন্তাশীলতা যদি ইতিবাচক হয়, তবে এটি মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে আজকের দিনে ভাবনার বিষয়টি মানুষের মধ্যে কাজ করছে কি না তা যাচাই করে দেখার সময় এসেছে। মানুষ তার ভাবনাকে লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে। তেমনি ভাবনাকে প্রয়োগ করে মানুষ অর্থনীতি, দর্শন, সমাজনীতি, মানবিক আচরণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণ ঘটাতে সক্ষম হয়। আবার গতানুগতিক ভাবনা থেকে নতুন ভাবনা সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষ তার সময়কে অতিক্রম করতে পারে। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নে অনেক বিষয়কে চিহ্নিত করা হলেও ভাবনার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে যেখানে ভাবনাকে উপেক্ষা করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তা কখনোই বাস্তবায়ন করা যায় না। যেকোনো পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভাবনার বিষয়টি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তবে মানুষের ভাবনার প্রকৃতি অনুযায়ী এর মধ্যে ভিন্নতা থাকতে পারে। আবার ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ভাবনা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। এটি স্বল্পমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে, যেটি নির্ভর করে পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের ওপর। বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণার ক্ষেত্রে ভাবনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। যদি আমরা শিল্পায়নের সঙ্গে ভাবনার বিষয়টিকে যুক্ত করতে চাই তবে এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার বিষয়টি কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটে। আর প্রযুক্তি পরিবর্তন সম্ভব হয় বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার মাধ্যমে। আবার প্রযুক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়নের গতি-প্রকৃতিও পরিবর্তিত হয়। উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে যে শিল্প ধারণা বিদ্যমান তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাকে আমাদের দেশের আঙ্গিকে কিভাবে রূপান্তর করা যায় সেই বিষয়টিও ভাবতে হবে। আমাদের দেশের মধ্যে বিদ্যমান কাঁচামাল বিবেচনা করে আমাদের শিল্পায়নকে আমাদের মতো করে সাজাতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে এই শিল্প যাতে প্রবেশ করানো যায় সে ধরনের গুণগত মানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকার ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন খোলার উদ্যোগ নিতে পারে। যাদের মূল উদ্দেশ্য হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরে যে নতুন উদ্ভাবন ও ধারণাগুলো আসে তা শিল্পে রূপ দেওয়া যায় কি না এই বিষয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করা। কিভাবে সেটির ব্যাপারে শিল্পোদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব সেটির দায়িত্বও এই ইনস্টিটিউটকে নিতে হবে। আবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ইনস্টিটিউট যাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে পারে সে ধরনের যোগাযোগের প্রত্যক্ষ মাধ্যম গড়ে তুলতে হবে। নতুন শিল্প ধারণার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষার পারস্পরিক যোগসূত্র তৈরি করে বহুমাত্রিক গবেষণার ধারণা সৃষ্টি করতে হবে। তবে এ ধরনের গবেষণাগুলো যাতে দেশপ্রেমের মানসিকতা থেকে আসে সে ভাবনার জায়গাগুলো গবেষকদের মধ্যে থাকতে হবে। একজন গবেষক যদি এই ফলিত ও মৌলিক গবেষণার ফলাফল জানতে না পারে তবে সে তার শিল্পায়নের ধারণাকে এগিয়ে নিতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পায়নের গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে সারা দেশে বিশেষ কয়েকটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এরই মধ্যে এগুলোর কয়েকটির প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, চীন এই বিশেষ ধরনের শিল্পাঞ্চল গঠনের বিষয়টি অনেক আগেই চিন্তা করেছে। এই শিল্পাঞ্চল গঠনের মাধ্যমে সাংহাই শহর থেকে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প ধারণা ও তার বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব হয়েছে। চীনে সমাজতন্ত্র প্রচলিত থাকলেও এই বিশেষ অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে উদার শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক ধারণাকে গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে খুব দ্রুত সময়ে শিল্পায়নের সমৃদ্ধির মাধ্যমে চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা গেছে। এই শিল্পাঞ্চলগুলোতে তারা যেমন অবাধ বাণিজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তেমনি দেশের শিল্পায়নকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এখানে চীন রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি ট্রান্সফারের মতো কৌশলকে তাদের শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই টেকনোলজি ট্রান্সফারের মাধ্যমে চীন, আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলো থেকে প্রযুক্তি ধারণাকে তাদের দেশে নিয়ে এসেছে, এরপর সেই প্রযুক্তিজ্ঞানকে তারা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োগ করার কৌশলটি বেছে নিয়েছে। যেমন, এ ক্ষেত্রে চীন কোনো একটি ভালো মডেলের গাড়ি জার্মানি বা আমেরিকা থেকে নিয়ে আসে। পরে তারা গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ গাড়ি থেকে আলাদা করে খুলে নেয়। এর মাধ্যমে তারা গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করে। যখন পুরো বিষয়টি কয়েকবার বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা বুঝে উঠতে সক্ষম হয়, তখন তারা আবার যন্ত্রাংশগুলোকে একত্র করে গাড়িটিকে আগের অবস্থায় নিয়ে আসে। এই কৌশল অবলম্বন করে তারা উন্নত রাষ্ট্রগুলোর প্রযুক্তিকে নিজেদের প্রযুক্তির আদলে রূপান্তর করে। একই সঙ্গে তারা নিজস্ব কাঁচামাল ব্যবহার করে গাড়িটির মূল্য উন্নত রাষ্ট্রগুলোর গাড়ির মূল্যের থেকে অনেক বেশি কম রাখতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশেও তাদের শিল্পাঞ্চলগুলোতে এ ধরনের ধারণা প্রয়োগ করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে নিজস্ব ভাবনার স্বকীয়তা যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ কোনো একটি ধারণাকে পুরোপুরি অনুকরণ না করে অনুসরণ করা যেতে পারে। এখানে অনুসরণ বলতে আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের সংস্কৃতিকে ধারণ করে নতুন ভাবনা বা অন্য কোনো ভাবনার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে নিজেদের শিল্পক্ষেত্রে সমৃদ্ধ করা। এ ছাড়া শিল্পাঞ্চলগুলোর সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যুক্ত করে এই অঞ্চলগুলোতে একটি করে নতুন শিল্প ধারণার বিশেষায়িত গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে। এর মাধ্যমে যেমন বিদ্যমান শিল্পগুলোর গুণগত মান বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে, তেমনি নতুন নতুন শিল্প ধারণা সৃষ্টি করে তা বাস্তবে প্রয়োগ করা যাবে। কোনো একটি নতুন শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে প্রথমে খুব ছোট আকারে শিল্পটির বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এর সঙ্গে এই শিল্প কিভাবে আরো বড় আকারে করা যায় এবং এটিকে কিভাবে রপ্তানিযোগ্য শিল্পে পরিণত করা যায় সেই বিষয়গুলো ভাবতে হবে। অনেক শিল্প ধারণা প্রয়োগের সুযোগ থাকলেও এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে তা তেমনভাবে দেখা যাচ্ছে না। যেমন—বায়োফুয়েল, বিভিন্ন ধরনের কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল, সফটওয়্যার, রোবটিকস, বায়োমেডিক্যাল সামগ্রী, সামুদ্রিক শিল্প, এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রির মতো শিল্পায়নের সম্ভাবনা বাংলাদেশে সৃষ্টি করা যায়। এই সম্ভাবনাগুলো সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ এ ধরনের সামগ্রী বিশ্ববাজারে রপ্তানি করার সুযোগ লাভ করবে। এতে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়নও তরান্বিত হবে। এ ধরনের ভাবনা শুধু শিল্পায়নের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। থ্যালার ও অমর্ত্য সেন মনের উন্নয়নের সঙ্গে মানবিক প্রগতি এবং মানবিক প্রগতির সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রগতির কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে মানবিক প্রগতি বলতে ইতিবাচক মানসিকতাকেই বোঝায়। আর এই ইতিবাচক মানসিকতা যখন ইতিবাচক ভাবনাকে প্রভাবিত করবে তখন রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি অক্ষুণ্ন্ন রাখা সম্ভব হবে। কাজেই সময়ের প্রয়োজনে ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে ইতিবাচক ভাবনাকে মানবিক সংস্কৃতিতে রূপান্তর করার কৌশল আমাদের গ্রহণ করতে হবে। এটি যদি সম্ভব হয় তবেই মানুষকে বদলে ফেলার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রগতি বজায় রাখা সম্ভব হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিষ্ট ও ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত