Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • রবিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫
  • ||

একজন সাকিব খান ও তার ছাত্র

প্রকাশ:  ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:৫৫ | আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:৫৮
আরিফ হাসান
প্রিন্ট icon

আমি তখন কলেজের ফার্স্ট বয়। শুধু পড়াশুনা প্রাইভেট আর রুমভর্তি গল্পের বই নিয়ে দিন পার করি। আবৃত্তি করতাম ছোট বেলা থেকেই। স্কুল পার করে যখন কলেজে আবৃত্তির নেশা আরও বেড়ে গেলো। বছরের প্রত্যেকটা দিবসে আবৃত্তির জন্য ডাক পেতাম। আবৃত্তি আর উপস্থাপনা নিয়ে বেশ ভাল সময়ই কেটেছিল কলেজে। প্রচুর পড়াশুনা করতাম কলেজের মাঠে দাড়ালে মনে হত….. ইস, একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতেই হবে…! কিন্তু কিভাবে…! ভাবি আর পড়ি…. পড়ি আর ভাবি…! কারণ আমার জীবনে তখন পৃথিবীর পূত পবিত্র ভূমি হচ্ছে দেশের যেকোন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

কমার্সে ভর্তি হলাম। ওরিয়েন্টেশন হল স্যাররা ফুল দিয়ে বরণ করে নিলেন। ক্লাস শুরু হল আমি অন্ধের মত ক্লাস করতাম প্রাইভেট পড়তাম আর বাসায় দিনরাত জেগে পড়াশুনা করতাম টার্গেট যেকোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়…! আমার কলেজের কয়েকজন শিক্ষক আন্তরিক আবার কয়েকজন অতি আন্তরিক। যেমন- ম্যানেজমেন্ট শিক্ষক মি. সাকিব খান (ছদ্মনাম) তার একেকটি প্রশ্নের উত্তরে খাতায় ২২টি পয়েন্ট এবং তাঁর বিশ্লেষণ না থাকলে তিনি সেই খাতা দেখেন না বা তাঁর কাছে সেই ছাত্রের গুরুত্ব শূন্যেরও অনেক নিচে। ভদ্রলোক বেশ ভদ্র…! ক্লাসে ঢুকতেন ৪০ মিনিট ক্লাস নিয়ে ভদ্র ভাবে চলে যেতেন। আমি তাঁর মুখে হাসি কখনও দেখিনি। আর হাসবেন কেন? কলেজের শিক্ষক; ওয়েট কমে যাবে তো… তাই না…! হুম! ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বলতেন শুনো, আমি কিন্তু কর্মচারীর ছেলে না, কর্মকর্তার ছেলে। আমার ক্লাস আমি যেভাবে নিই সেভাবেই নিই। আমাকে বুঝতে হবে তোমাদের। আমার পারিবারিক প্লাস একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড বুঝতে হবে তোমাদের আমি কিন্তু কর্মকর্তার সন্তান… কর্মচারীর না… তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম…. জানি না কি কি বুঝতাম।

ভদ্রলোক আমাকে বেশ স্নেহ করতেন, কারণ আমি কলেজের ফার্স্ট বয়। আর উনি আমার বাবার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। আমি নামায পড়তাম দুপুরে খেয়ে বা না খেয়ে মাঠে দাঁড়ানো দেখলেই স্যাররা নামাজ পড়তে ডাকতেন। আর স্যাররা ডাকলেই আমার কিছু বন্ধু শয়তানি করে বলতো- স্যার আমি হিন্দু। ভাবলে এখনও হাসি পায়। নামাযের পর স্যাররা আমাকে ডাকতেন আর জিজ্ঞেস করতেন, ‘বাবা বলতো মসজিদের পাশে কোন কোন গাছ লাগানো যায়? কোথায় লাগানো যায়?’ আমি বেশ সুন্দর করে বর্ণনা দিতাম স্যারদেরকে। স্যাররা আমার কথা শুনতেন আর মাথায় নাড়িয়ে হু…হ্যাঁ.. ঠিক বলছ এসব বলতেন। আমার ভাল লাগত- ভাবতাম আচ্ছা, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবতো তাই না….!

আমার সব কথার… বলার… চলার… ভিতর শুধু এই কথাটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকতো- একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রামের স্কুল থেকে পাশ করে আসা কয়েকজন ছেলের সাথে পরিচয় হল। শুরু হল একসাথে প্রাইভেট পড়াও। ক্লাসে স্যার না থাকলে শুরু হত বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রুলস নিয়ে তর্কবির্তক। আবার কোন মেয়ে কি রঙের জামা পড়লো সাথে আরও কি কি পড়লো সেই চুলকানি টাইপ কথাও হত। আমি চুপচাপ শুনতাম। বারবার মনে হত প্রেম করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাব না। আর সত্যি কথা- কলেজে প্রেম করার সময়ও ছিল না। ক্লাস… ক্লাস … আর ক্লাস… ম্যানেজমেন্ট শিক্ষক, এ্যাকাউন্টিং শিক্ষক মার্কেটিং শিক্ষক সবাই আসে আর চোখ মুখে ক্লাসের কিছুর প্রয়োজনীয় কথা বলে চলে যায়। তাঁরা আমাদের দিকে তাঁকায় না। সময়ও হয়তো নেই তাঁদের। ম্যানেজমেন্ট শিক্ষক মি. সাকিব খান আসেন ক্লাসে লেকচার দেন সবাই শুনেন তার কথা কিন্তু তাঁর কথায় ফাঁকে ফাঁকে কেন জানি নিজেদের অচ্ছুৎ মনে হয়। বিশেষ করে গ্রামের স্কুল থেকে পড়া আসা ছাত্রগুলোরা।

একদিন মি. সাকিব খান (সাকিব খান বলার কারণ তিনি গুড লুক) ক্লাসে বুঝাচ্ছেন একটা ছাত্র বলে উঠলো-স্যার ঐ পয়েন্টটা দয়া করে আরেকবার বলবেন? আমি লিখছি তো! তো মি. সাকিব বলে উঠলেন- তুমি জান আমি কে? আমার পরিচয় কি? আমার বাবা একজন কর্মকর্তা। তিনি কর্মচারী নন। আমি ক্লাস নিলে তুমি আমাকে থামিয়ে প্রশ্ন জিঞ্জেস কর- এত বড় সাহস তুমি কই পাও..? তুমি যে শার্টটা পড়ে আছো তাঁর দাম কত? কই থেকে কিনছো..। আমি শুধু আমার ঐ বন্ধুর দিকে তাঁকিয়ে ছিলাম। ওর মুখটা কেমন জানি না ফ্যাকাশে, না মলিন, না মেঘাচ্ছন্ন লাগছিল। ওর তখন কি মনে হচ্ছিল..। ওর কি উচিত ছিল ক্লাস থেকে বের হয়ে যাওয়া….! ওর কি উচিত ছিল বইপত্রগুলো ছিড়ে ফেলা…! ওর কি তখন উচিৎ ছিল চিৎকার করে কাঁদা…! আচ্ছা ওর কি তখন বাবা মায়ের কথা মনে হচ্ছিল..! কলেজ ছেড়ে গার্মেন্টস এ গিয়ে কাজ করতে ইচ্ছে হয়নি ওর…! না, ও যায় নি… ক্লাসেই মাথা নিচু করে বসেছিল সব ক্লাস মাথা নিচু করে শেষ করেছিল উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেই কলেজ থেকে বের হয়েছিল।

আচ্ছা, এই মি. সাকিব গুলো ক্লাস নেয়ার সময় এমন করেন কেন? তাঁরা কি অস্তিত্বহীনতায় ভোগেন…! নাকি নতুন করে নিজেকে জানান আমি ক্লাস নেই আমি শিক্ষক। আমার অনেক জ্ঞান, তুমি যতই সাতার জানও আমার এই জ্ঞানের সমুদ্রে সাঁতার তুমি কাটবে পারবে না…! আর আমার ঐ বন্ধুটা ভাল আছে ঢাকায় দেখা হলে আড্ডা হয়। এটা ওটা অনেক কথা আলোচনা হয়। কিন্তু আমি ওর মুখের দিকে তাকায় বারবার তাকাই কলেজের কথাগুলা মনে পড়ে। সেদিন ও বললো- ডাব খাবি…? আমি বললাম হ্যাঁ। ডাব খাচ্ছি আর মি. সাকিব খানের কথা মনে হচ্ছে। এখন কেমন আছেন তিনি? ডাব খাচ্ছি আর মনে হচ্ছে তিনি ঐ কলেজে কেন! তার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া উচিত। ভাবতে ভাবতে একটু জোরে হেসে ফেলেছিলাম। বন্ধু বললো কিরে হাসিস কেন…? আমি বললাম- আবেগে…

লেখক: গবেষক, নাট্যকলা ও পরিবেশনাবিদ্যা বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

/পিবিডি/একে

apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত